জানেন কি ? পবিত্র কাবা শরীফের তালা চাবির রহস্য |

ইসলামী ভাষ্য মতে, বর্তমান কাবা ঘরটি যেখানে স্থাপিত, সে স্থানটিই পৃথিবীর প্রথম জমিন। বিশাল সাগরের মাঝে ধীরে ধীরে ভরাট হতে হতে এই ভূমির সৃষ্টি হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল এক মহাদেশ। এভাবেই পরবর্তীতে সৃষ্টি হয় সাত মহাদেশ। ভৌগোলিকভাবে গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থানে অবস্থিত এই পবিত্র কাবা ঘর আল্লাহ-তায়ালার জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। আল্লাহ তায়ালা কাবা শরীফকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের মিলনস্থান হিসেবে ঘোষণা দেয়ায় এটি এখন সারা পৃথিবীর মুসলমানদের ধর্মীয় রাজধানীতে পরিণত হয়েছে।

এ ঘরটি আসলে কে বা কারা দেখাশোনা করেন? -এমন প্রশ্নের উত্তর হয়ত অনেকেরই অজানা।
পবিত্র এ কাবা ঘরকে দেখাশোনা করার সুযোগ পাওয়া একজন মুসলমানের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। আর কাবা শরীফের চাবি হাতে পাওয়া তো রীতিমত পরম পাওয়া। এই সম্মানের দায়িত্ব যে কোন মুসলিমই স্বেচ্ছায় পালন করতে চাইবেন।

তবে অবাক করা তথ্য হল, এ ঘরের চাবি কার কাছে থাকবে এ নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন বিতর্ক হয়নি। কারণ ১০ম হিজরি সনের পবিত্র রমজান মাসে মক্কা বিজয়ের পর হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) যখন মদিনায় চলে যান তখন এই ঘরের চাবি সাহাবি ওসমান ইবনে আবু তালহার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আবু তালহার গোত্রের কাছে চাবি তুলে দিয়ে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কিয়ামত পর্যন্ত এই চাবি গ্রহণ করো। জালেম ছাড়া কেউ তোমাদের কাছ থেকে এই চাবি ছিনিয়ে নেবে না।’
তাই সাহাবি ওসমান ইবনে আবু তালহার ‘বনী শাইবাহ’ গোত্রই কাবা ঘরের আনুষ্ঠানিক সেবক। ‘বনী শাইবাহ’ গোত্রটি বর্তমানে ‘বনী তালহা গোত্র’ হিসেবেও পরিচিত হয়ে আসছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই গোত্রটির বংশধরদের কাছেই এ ঘরের চাবিটি রক্ষিত থাকবে। তবে এ পর্যন্ত অসংখ্যবার এ ঘরের চাবি পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু চাবির বাহকের পরিবর্তন হবে না। সেই থেকে বনী শাইবাহ গোত্রের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি কাবা ঘরের চাবি বহন করেন।
পবিত্র কাবা ঘরকে আরবিতে বলা হয় বায়তুল্লাহ। যার অর্থ আল্লাহর ঘর। তাই কাবা ঘরের সেবা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এ জন্য বনী শাইবাহ গোত্র ছাড়াও যুগে যুগে বিভিন্ন শাসকরা এই ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য কাজ করেছেন। তাদের কাছ থেকে চাবি নিয়েই বিভিন্ন সময় সৌদি আরবের বাদশাহ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ পবিত্র কাবা ঘরে প্রবেশ করে থাকেন।

সৌদি আরবের বাদশাহ খালেদ কাবা ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে ১৩৯৬ হিজরিতে কাবা ঘরের পুরানো দরজাটি অপসারণ করে স্বর্ণ দিয়ে দরজা তৈরি করে দেন। ২৮৬ কেজি স্বর্ণ ব্যবহার করে নির্মিত দরজাটিতে তিনি আল্লাহপাকের নাম এবং পবিত্র কোরআন শরিফের আয়াত স্বর্ণখচিত অক্ষরে লিখে দিয়েছেন। দুই পাল্লা বিশিষ্ট নতুন এই দরজার মাঝখানে তালা বসানোর ব্যবস্থাও রেখেছেন।

ফলে কাবা শরীফের প্রথম দিকের দরজা এবং তালা বর্তমানে ব্যবহার করা হয় না। সৌন্দর্য বর্ধনের অংশ হিসেবে এই পর্যন্ত বহুবার এই ঘরের গিলাফ ও তালা-চাবি পরিবর্তন করতে হয়েছে। এ সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৫৮ বার কাবা ঘরের তালা পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কাবা ঘরের কোনও চাবি হারায়নি। তবে একব্যক্তি একবার কাবা ঘরের চাবি চুরি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
বর্তমানে ব্যবহৃত তালা-চাবি বাদে বাকি ৫৭টি তালা ও চাবি অত্যন্ত যত্নের সাথে বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত অাছে। এর মধ্যে ৫৪টি চাবি রয়েছে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে ঐতিহাসিক তোপকাপি জাদুঘরে, ২টি চাবি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বিশ্বখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়ামে এবং আরেকটি মিশরের কায়রোর ইসলামিক আর্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

সৌদি আরব থেকে প্রকাশিত মধ্য প্রাচ্যের প্রভাবশালী ইংরেজী দৈনিক আরিব নিউজের ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর, সোমবার সর্বশেষ কাবা ঘরের চাবি পরিবর্তন করা হয়।’ সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সির বরাত দিয়ে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘২০০৯ সালে সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ সিটি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজিকে (KACST) কাবা ঘরের পুরাতন তালাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

রাজকীয় ফরমান বলে, কাস্টের একটি বিশেষজ্ঞ দল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ২০১৩ সালের শেষের দিকে ৩০ বছরের পুরনো মরচে ধরা তালা পরিবর্তন করে। তারা ১৮ ক্যারট সোনা দিয়ে তৈরি একটি নতুন তালা লাগিয়ে দেন। বর্তমান এই তালাটির চাবির দৈর্ঘ্য ৩৫ সেন্টিমিটার। পবিত্র কাবার গিলাফ তৈরির কারখানায় তৈরি একটি বিশেষ ব্যাগে করে এ চাবিটি সংরক্ষন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *