জেনে নিন, নবীজির (সা) নূর হযরত আদম (আ)-এর পিঠে রেখে দেন-এটি কি সহিহ হাদিস?

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নূরের সৃষ্টি বলে দাবীদার ভ্রষ্ট রেজভীরা তাদের পক্ষ হতে কতিপয় জাল ও মওজূ হাদিসপ্রদর্শন করিয়ে থাকে । যার মাধ্যমে তাদের দাবি মূলত কোনো ভাবেই স্বিদ্ধি লাভ করেনা। আমি তাদের সেসব জাল বর্ণনাগুলো ক্রমানুসারে উল্লেখ পূর্বক সেগুলোর জবাব দেয়ার চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ।

রেজভিরা তাদের পক্ষ হতে নিচের জাল ও মওজূ হাদিসটি প্রদর্শন করিয়ে থাকে। যেমন –

“আসসীরাতুল হালাবিয়্যাহ” কিতাবে আছে

ﻭ ﻓﻲ ﺭﻭﺍﻳﺔ ﻟﻤﺎ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﺁﺩﻡ ﺟﻌﻞ ﺫﺍﻟﻚ ﺍﻟﻨﻮﺭ ﻓﻲ ﻇﻬﺮﻩ. ﺍﻟﺴﻴﺮﺓ ﺍﻟﺤﻠﺒﻴﺔ

অর্থাৎ যখন আল্লাহ তায়ালা আদম আঃ -কে সৃষ্টি করেছেন তখন হুজুর সাঃ এর নূর তাঁর পিঠে রেখে দেয়া হয়েছে।

আপনি যদি ভাল করে বর্ণনটির অর্থের প্রতি লক্ষ্য করেন তাহলে বিদয়াতীদের দাবীর সাথে উক্ত বর্ণনাটি কতটা অসামঞ্জস্য তা পরিস্কার উপলব্ধি করতে পারবেন।

কারণ, বর্ণনাটির বক্তব্য হল, নবীজির সাঃ নূর মুবারক হযরত আদমের আঃ পিঠে রেখে দেয়া হয়েছে।’

এ বর্ণনাটি যদিও বিশুদ্ধ সূত্রে হাদিসের কোনো কিতাবে উল্লেখ নাই, তথাপি একে সহীহ ধরে নেয়া হলেও বিপত্তি বাধার কথা নয়।

কারণ, সেখানে নূর শব্দের সুস্পষ্ট কোনো অর্থ উল্লেখ নেই।

কাজেই মুহাক্কিক উলামাদের ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে বলা যায় যে, এ নূরে মুহাম্মদী থেকে উদ্দেশ্য হল ‘রূহে মুহাম্মদী’। তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকেনা। যার ফলে নবীজিকে সাঃ নূরের তৈরি বলার যে উদ্ভট প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে তারও পুণঃবৃত্তি ঘটবে না।

আদম আঃ এর পিঠে রক্ষিত নূরে মুহাম্মদী থেকে ‘রূহে মুহাম্মদী’ উদ্দেশ্য নেয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ব্যাখ্যা বিবেকগ্রাহ্য ও ন্যায় সঙ্গত নয়। কারণ, মাতৃগর্ভ হল মানবজাতির দেহের উৎস। তার পূর্বে কেবলমাত্র তাদের রূহগুলোই “রূহের জগতে” বিদ্যমান ছিল আর দেহগুলো সৃষ্টি হয়েছে পরে।
নবীজি সাঃ উনিও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন।

√ রূপকার্থে রূহকেও নুর বলা যায়। তার দলিল-

আল্লামা কাসতালানী রহঃ তিনি স্বীয় কিতাব “মাওয়াহিবে লাদূনিয়া”র ৮ম পৃষ্ঠায় নূরে মুহাম্মদীর বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন

ﺍﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻲ ﻟﻤﺎ ﺧﻠﻖ ﻧﻮﺭ ﻧﺒﻲ ﻣﺤﻤﺪ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺍﻣﺮﻩ ﺍﻥ ﻳﻨﻈﺮ ﺍﻟﻲ ﺍﻧﻮﺍﺭ ﺍﻻﻧﺒﻴﺎﺀ. ﻣﻮﺍﻫﺐ ﻟﺪﻭﻧﻴﺔ
٨

অর্থাৎ “আল্লাহ তায়ালা যখন নূরে মুহাম্মদী সৃষ্টি করলেন তখন তাকে আনওয়ারে আম্বিয়া (অন্যান্য সকল নবীর নূর মোবারক) -এর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে বললেন।”

এখানে نور محمدي (নূরে মুহাম্মদী) থেকে অবশ্যই রূহে মুহাম্মদী উদ্দেশ্য। যদি এ কথা মানতে কাহারো দ্বিধা লাগে তাহলে তার নিকট আমার প্রশ্ন যে, “আনওয়ারে আম্বিয়া” থেকে আপনি কী উদ্দেশ্য নিবেন?

অথচ, তিনি বিশ্বনবী ক্ষেত্রে যেরূপ “নূর” শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেরূপ সকল নবীদের ক্ষেত্রেও বহুবচন শব্দ
“আনওয়ার” ব্যবহার করেছেন।

√ রূহ মোবারককে রূপকার্থে নূর বলা যায়। তার অনেকগুলো দলিলের ভেতর নিম্নোক্ত দলিলটি অন্যতম।

১।
মোল্লা আলী কারী রহঃ (মৃত১০১৪ হিঃ) ঐ জাল হাদিসটির “নূর” -কে ‘রূহ’ অর্থে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

তাঁর ভাষায়:

ﻗﻮﻟﻪ ﺍﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﻧﻮﺭﻱ ﻭ ﻓﻲ ﺭﻭﺍﻳﺔ ﺭﻭﺣﻲ ﻫﻤﺎ ﻭﺍﺣﺪ ﻓﺎﻥ ﺍﻻﺭﻭﺍﺡ ﻧﻮﺭﺍﻧﻴﺔ ﺍﻱ ﺍﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻦ ﺍﻻﺭﻭﺍﺡ ﺭﻭﺣﻲ. ﻣﺮﻗﺎﺓ ﺷﺮﺡ ﻣﺸﻜﻮﺓ: ١ / ٢٩١

অর্থাৎ বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহপাক সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন। এভাবে অন্য আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে যে, আল্লাহপাক সর্বপ্রথম আমার রূহ সৃষ্টি করেছেন। অতএব উভয় বর্ণনার মর্মার্থ একই। যেহেতু রূহই নূর। অর্থাৎ আল্লাহপাক সর্বপ্রথম আমার নূর তথা রূহ সৃষ্টি করেছেন।
{দেখুন, মেরকাত ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং ২৯১}।

২।
জগৎ বিখ্যাত শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে কাইয়্যুম আলজাওযিয়াহ রহঃ (মৃত৭৫১হিজরী) তাঁর সুবিখ্যাত কিতাব “রূহ” গ্রন্থের ২০৬ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন

ﻭﻗﺎﻝ ﺑﻌﻀﻬﻢ ﺍﻻﺭﻭﺍﺡ ﻧﻮﺭ ﻣﻦ ﺍﻧﻮﺍﺭ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻲ. ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺮﻭﺡ ٢٠٦

অর্থাৎ ‘মুহাদ্দিসগণের অনেকে রূহ সমূহকে আল্লাহ তায়ালার নূর বলে আখ্যায়িত করেছেন।’

কাজেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে পারি যে,
নূরে মুহাম্মদী অর্থ রূহে মুহাম্মদী তথা মুহাম্মদ
সাঃ এর রূহ মোবারক।

নূরের উপরোক্ত বর্ণনাটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে সকল প্রকারের বিদয়াত ও শিরিকি আকিদা বিশ্বাস রদ করা সম্ভব।

সব চেয়ে মজার ব্যাপার হল, হাদিস বিশারদগণ একেও ভিত্তিহীন এবং মানুষের
মনগড়া বর্ণনা বলে আখ্যায়িত করিয়াছেন।

ইবনে তাইমিয়া রহঃ, ইমান যাহাবী ও ইবনে কাসির রহঃ সহ অনেকে এরূপ মত ব্যক্ত করেছেন।

(বিস্তারিত তানযিহুশ শারিয়াতুল মারফূ’আ ২৭৩।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *