দেখুন কোন সূরাগুলো পড়লে মিলবে কোরআন খতমের সওয়াব

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করাকে কোরআন খতম বলা হয় । আমাদের দেশে সাধারনত দু‘ভাবে কোরআন খতম করা হয় ।(১)নিজে নিজে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পবিত্র কোরআন খতম (তেলাওয়াত) করা ।(২)অপর লোকের দ্বারা কোরআন পড়ায়ে নেয়া ।

((১)) নিজে নিজে কোরআন খতম করা – কোরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তেলাওয়াত করা উৎকৃষ্ট ইবাদত।হাদিস শরীফে আসছে – আফজালুল ইবাদাতে — অর্থাৎ কোরআন তেলাওয়াত উৎকৃষ্ট ইবাদত । মান কারা‘আ হরফাম– অর্থাৎ কোরআনের এক অক্ষর পড়লে দশ নেকী (তিরমিযী-২/১১৫)।রসুল(সঃ) বলেছেন ,কোরআন পাঠ করলে ক্বলবের মরিচা দুর হয় (বায়হাকী)

বলা হয় পবিত্র রমযান মাসে এক খতম এবং বাকী এগার মাসে আরও এক খতম কোরআন তেলাওয়াত করা পবিত্র কোরআনের হক।রসুলের হাদিস থেকে বুঝা যায় সাধারন মুসলমানদের জন্যে তিনদিনের কমে কোরআন খতম করা ঠিক নয় । ওছমান ইবনে আফ্‌ফান (রাঃ) প্রতি সাতদিনে কোরআন খতম করতেন , মুসলমানদের জন্যে এক্ষেত্রে ওছমান (রাঃ) এর অনুকরন করা উত্তম ।

((২)) অপরের দ্বারা খতম করায়ে নেয়া – অপরের দ্বারা কোরআন পড়ায়ে নেয়া আবার দু‘কারনে করা হয় ।(ক) রোগমুক্তি,বালা-মছিবত দূর ও বরকত হাছিলের জন্যে,(খ) ইছালে ছওয়াব অর্থাৎ মৃত্যু ব্যক্তিদের ছওয়াব পাঠানোর ও মাগফেরাতের জন্যে ।

((ক)) রোগমুক্তি ও বালা-মছিবত দূর করার জন্যে আমাদের সমাজে খতম পড়ানোর ব্যপক প্রচলন রয়েছে ।এই খতম এলাকা ও অবস্থা ভেদে বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে ।কোথাও পুরা কোরআন খতম করানো হয় ,কোথাও কোরআনের বিশেষ বিশেষ সুরা বা আয়াত তেলাওয়াত করা হয় ।কোথাওবা বিশেষ কিছু দু‘আ-জিকের ,তাছবিহ-তাহলীল নির্দিষ্ট একটা সংখ্যা পরিমান পাঠ করা হয় । অনেক সময় এসকল খতমের বিভিন্ন নাম দেয়া হয় যেমন, খতমে কোরআন, খতমে আম্বিয়া ,খতমে জালালী ,খতমে খাজেগান ইত্যাদি ।বর্তমান কালের অধিকাংশ আলেম এই প্রকারের খতম পড়ে বিনিময় (খাওয়া বা টাকা নেয়া) গ্রহন করা বৈধ মনে করে থাকেন ।তাদের যুক্তি হলো ,ইসলামী শরীআতে ইবাদতের বিনিময় গ্রহন করা নিষেধ, যেহেতু এই প্রকার খতম ইবাদত নয় তাই এর বিনিময় গ্রহন করা নিষেধের আওতায় পড়েনা । বাস্তব সত্য হলো এই সকল খতমের প্রচলন নবীযুগে ,সাহাবাদের সময়ে ,এমনকি কোন মুজতাহীদ ইমামদের যুগেও ছিল না ।পরবর্তী কালে কে বা কারা এটা আবিষ্কার করেছে তারও হদিস মেলেনা । তাই এই নতুন আবিষ্কৃত পন্থাটিকে সন্দেহাতিত ভাবে বৈধ মনে করার কোন সুযোগ নাই । তাকওয়া ও পরহেজগারী হলো এই সকল বেদাত থেকেও দূরে থাকা ।

((খ))ইসালে ছওয়াবের জন্যে কোরআন খতমের অনুষ্ঠান করা ,এবং এর ছওয়াব মৃত্যু ব্যক্তিদের মাগফেরাতের জন্যে পাঠানোর যে রীতি আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে এতে কোন ছওয়াবনেই ।এটা ভিত্তিহীন,প্রমানহীন বেদাত যা অবশ্য পরিতাজ্য ।রসুল ও সাহাবাদের জামানায় এই জাতীয় খতমের প্রচলন ছিলনা ।

মৃত্যু ব্যক্তিদের জন্যে কোরআন খতমের কথা কোরআন-হাদিসে নাই ।কোরআন-হাদিসে তাদের জন্যে দু‘আ করার কথা আছে ।সন্তানদেরকে মৃত্যু পিতা-মাতার জন্যে দু‘আ করার ,দান-ছদকা,হজ্জ-ওমরা করে ছওয়াব পাঠানোর নির্দেশ করা হয়েছে ।এই র্নিদেশকে সামনে রেখে অনেক আলেম মনে করেন যেহেতু মৃত্যু ব্যক্তিরা তাদের সন্তানদের দান-ছদকা, নফল নামাজ-রোজা, হজ্জ-ওমরার দ্বারা উপকৃত হবে ,তাদের কোরআন তেলাওয়াতের ছওয়াব দ্বারাও উপকৃত হবে ,যদি সন্তানেরা নিজেরা ব্যক্তি পর্যায়ে কোরআন তেলাওয়াত করে ।যতটুকু পড়বে অতটুকুর ছওয়াব পাবে ।

মনে রাখতে হবে আমাদের দেশের প্রচলিত খতম ছওয়াবের কাজ নয় ,এই খতমে কোন ছওয়াব নেই ,বরং এই প্রকার খতম পড়নেওয়ালা,পড়ানেওয়ালা উভয়ি গুনাহগার হবে ।কারন কোরআন,হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ফিকার কিতাবের দৃষ্টিতে ঐ সকল খতমে কোন প্রকার ছওয়াব নাই ,যে সকল খতম অপর লোকের দ্বারা খাওয়া ও টাকার বিনিময়ে পড়ানো হয় ।

হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার কিতাব ,“রদ্দুল মোহতারে ”বলা হয়েছে,“ লা ইউছাবু লা লিল কারী ,ওয়া লা লিল মু‘তি ,ওয়াল কারী ওয়াল মু‘তি আছেমানে ” অর্থাৎ প্রচলিত খতম পড়াতে কোন প্রকার ছওয়াব হবেনা , পড়নেওয়ালারও হবেনা ,পড়ানেওয়লারও হবেনা ,বরং উভয়ে গুনাহগার হবে ।

প্রচলিত খতম যে খানেই পড়ানো হোক ,যে ভাবেই পড়া হোক এতে কোন ছওয়াব নাই ,পড়নেওয়ালা-পড়ানেওয়ালা সকলেই গুনাহগার হবে ,প্রমানের জন্যে দেখুন — সুরা বাকারা -৪১ আয়াত/১৭৪ আয়াত,সুরা মায়েদা-৪৪ আয়াত ।আবু দাউদ, তিরমিযী,বায়হাকী ও মাসনাদে আহমাদে রয়েছে এ বিষয়ে একাধিক হাদিস । ফতোয়া শামী ,কাজিখান সহ প্রায় সকল ফতোয়ার কিতাবে রয়েছে এসম্পর্কে বিস্তরিত আলোচনা । প্রচলিত খতম নাজায়েজ ও হরাম হওয়া সম্পর্কে হাটহাজারী মাদ্রসার মুফতি ,মুফতি ফয়জুল্লাহ মরহুম “ রাফেউল ইশ‘কালাত” নামের একটি সতন্ত্র কিতাব লিখেছেন এবং একে প্রচলিত খতম হারাম হওয়ার ৫৫ টি প্রমান উল্লেখ করেছেন ।

শেষ কথা- আমাদের দেশে (এলাকায়) মৃত্যুব্যক্তিদের রুহের মাগফেরাত ও তাদের জন্যে ছওয়াব পাঠানোর জন্যে যত প্রকার খতম পড়ানোর প্রচলন আছে তা সবই নাজায়েজ ,অবৈধ ।এগুলি কোন ছওয়াবের কাজ নয় ,নিসন্দেহে এসব গুনার কাজ ।

মুফতি আব্দুল্লাহ খান ফয়েজী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *