নবীজি যখন ‘আব্বু’!

নবীজি সা. ছিলেন অত্যন্ত স্নেহপরায়ন। সন্তানবৎসল। দায়িত্বশীল পিতা। নবীজির সর্বমোট সাত সন্তান ছিল। তিন ছেলে চার মেয়ে।
ছেলেরা হলেন: কাসেম। আবদুল্লাহ। ইবরাহীম।
আর তৈয়ব ও তাহের হলো আবদুল্লাহর উপাধি (লকব)। আলাদা কোনও সন্তানের নাম নয়। সবাই শৈশবেই ইন্তেকাল করেছেন।
কাসেম: মক্কায় ইন্তেকাল করেছেন। তখন বয়েস ছিল দুই বছর কয়েক মাস। তার নাম ধরেই নবীজির কুনিয়ত (উপনাম) আবুল কাসেম।

আবদুল্লাহ: নবুওয়াত লাভের পর জন্মগ্রহণ করেন। মক্কাতেই ইন্তেকাল করেন।
.
ইবরাহীম: মারিয়া কিবতিয়া রা.-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মদীনায় জন্মগ্রহন করেন। জিলহজ মাসে। অষ্টম হিজরীতে। দশম হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। সতের বা আঠার মাস বয়েসে।
= ইবরাহীম ছাড়া সমস্ত সন্তান হযরত খাদীজা রা.-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
.
মেয়েরা হলেন: যয়নব। রুকাইয়া। উম্মে কুলসুম। ফাতিমা রা.।
যয়নব: বড় মেয়ে। খালাতো ভাই আবুল আস বিন রবীয়ের সাথে বিয়ে হয়েছিল।
রুকাইয়া: দ্বিতীয় মেয়ে। উতবা বিন আবি লাহাবের সাথে বিয়ে হয়েছিল। তার সাথে বাসর হয়নি। তার আগেই অন্যায়ভাবে তালাকপ্রাপ্তা হয়েছিলেন। তারপর বিয়ে হয়েছিল উসমান রা.-এর সাথে। স্বামীর সাথে হাবশা ও মদীনায় হিজরত করেছিলেন। বিরল দুই হিজরতের সৌভাগ্য অর্জনকারীনি। বদর যুদ্ধের সময় অসুস্থ ছিলেন। নবীজি তার দেখাশোনার জন্যে উসমান রা.-কে মদীনায় রেখে গিয়েছিলেন। বদর থেকে ফেরার আগেই রামাদান মাসে রুকাইয়া ইন্তেকাল করেন।
ফাতিমা: ছোট মেয়ে। সবচেয়ে প্রিয় সন্তানও বটে। নবীজির একচল্লিশ বছর বয়েসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নবীজির ছয়মাস পরে ফাতিমা রা. ইন্তেকাল করেন। আলী রা.-এর সাথে তার বিয়ে হয়েছিল।
.
(এক) সুন্দর নাম।
নাম রাখার ব্যাপারে নবীজির রুচিবোধ ছিল চমৎকার। অতুলনীয়। নবীজির সমস্ত সন্তানের নামগুলোই আকর্ষণীয়। সদর্থক। সুন্দর। তিনি অন্যদেরকেও সন্তানের সুন্দর নাম রাখতে উদ্বুদ্ধ করতেন। কারো অসুন্দর নাম দেখলে বদলে দিতেন।
সুফিয়ান সওরী রহ. বলেছেন:
-বলা হয়ে থাকে, পিতার ওপর সন্তানের অধিকার হলো: তিনি সুন্দর নাম রাখবেন। বালেগ হলে বিয়ে করাবেন। হজ করাবেন। সুন্দর আদব শিক্ষা দিবেন (কিতাবুল ইয়াল:১৭১)।
.
নবীজি বলেছেন:
-আজ রাতে আমার এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। আমি আবার পূর্বপুরুষের নামে তার নাম রেখেছি ইবরাহীম (মুসলিম: ২৩১৫)।
= বাপ-দাদাদের কারো সুন্দর নাম থাকলে, সেটা রাখা যেতে পারে। সুন্নাত।
.
(দুই) সন্তানদের সাথে
নবীজি মেয়েদেরকে খুবই ভালোবাসতেন। ছেলেদের কেউ তো বেঁচে ছিল না। মেয়েরাই একচেটিয়া পিতার ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। নবীজি কন্যাদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতেন। তাদেরকে দেখা হলেই সহাস্যে অভিবাদন জানাতেন। কন্যাসন্তান বেশি হলেও তাদের নিয়ে সুখী-খুশি হওয়া সুন্নাত। তাদেরকে দেখে আনন্দ প্রকাশ করা সুন্নাত। আল্লাহর দেয়া সন্তান নিয়ে শুকরিয়া আদায় করা সুন্নাত। সন্তানদেরকে সুন্দর ও সুষ্ঠু দীক্ষাদানের প্রতিজ্ঞা করা সুন্নাত।
.
= যাকে কয়েকটি কন্যাসন্তান দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে, সে তাদেরকে সুন্দর করে গড়ে তুলেছে, এই কন্যারা তাকে আগুন থেকে বাঁচাবে (বুখারী: ৫৯৯৫-মুসলিম: ২৬২৯)।
.
পরীক্ষা করার অর্থ হলো: আল্লাহ দেখেন লোকটা কন্যাসন্তান পেয়ে খুশি হলো নাকি বেজার হলো! ফুলের মতো নিষ্পাপকন্যাদের সাথে সদাচার করেছে নাকি দুরাচার করেছে! ভালো আচরণ করলে, পুরস্কার পাবে। তাহলে বোঝা গেলো বান্দার জন্যে কন্যাসন্তান আল্লাহও পছন্দ করেন।
মেয়েরা দুর্বল। তাদের প্রতি বাড়তি মনোযোগ দিতে হয়। আল্লাহ এবং তার রসুলের ইরশাদ থেকে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কন্যার জন্যে ভালো দ্বীনদার দায়িত্বশীল পাত্র বেছে নেয়াও পরীক্ষার অংশ।
.
(তিন) বিয়ে দেয়া।
যয়নবকে বিয়ে দিয়েছিলেন আবুল আস বিন রবীয়ের সাথে। খাদীজা রা.-এর আপন ভাগ্নে। সম্পদে, আমানতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে আবুল আস ছিলেন কুরাইশের অন্যতম সেরা যুবক। ইসলাম এল। যয়নব মুসলমান হলেন। আবুল আস তখনো মুশরিক। নবীজি হিজরত করে চলে এলেন। আদরের কন্যা মক্কায় রয়ে গেলো। নবীজির মনটাও মক্কায় পড়ে রইল। কন্যা কাছে। বদর যুদ্ধে আবুল আস বন্দী হলো।
.
আয়েশা রা. বলেছেন:
= মক্কাবাসীরা মুক্তিপণ পাঠালো। যয়নবও আবুল আসের জন্যে মুক্তিপণ পাঠালো। সেটা ছিল খাদীজা রা.-এর হার। বিয়ের সময় মেয়েকে দিয়েছিলেন।
নবীজি যখন হারটা দেখলেন, চিনতে পারলেন। তার মনটা ভীষণ আর্দ্র হয়ে উঠলো। উপস্থিত সাহাবীদের বললেন:
-তোমরা যদি কিছু মনে না করো, মুক্তিপণ না নিয়ে তাকে ছেড়ে দিই? হারটা ফেরত পাঠিয়ে দিই?
-জ্বি, অবশ্যই ইয়া রাসুলাল্লাহ।
.
নবীজি অনুরোধ করলেন, মেয়েকে পাঠিয়ে দিতে। আবুল আস সম্মত হলো। যায়েদ বিন হারেসা ও আরেকজন আনসারীকে উজিয়ে আনতে পাঠালেন:
-তোমরা বতনে ইয়া‘জুজের কাছে অপেক্ষা করবে। যয়নব এলে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।
.
নবীজি তার জামাতার প্রশংসা করে বলেছিলেন:
-সে আমার সাথে কথা বলতে গিয়ে সত্য বলেছে। আমার সাথে ওয়াদা করে পূরণ করেছে (বুখারী-মুসলিম)।
.
আবুল আস ওয়াদা করেছিল, মক্কায় ফিরেই যয়নবকে পাঠিয়ে দেবে, তাই করেছে। যয়নবের প্রতি তার তীব্র অনুরাগ সত্ত্বেও।
.
দ্বিতীয় মেয়ে রুকাইয়াকে বিয়ে দিয়েছিলেন উসমান রা.-এর সাথে। তার আখলাকের কথা তো সর্বজনবিদিত। খলীফায়ে রাশেদ। রুকাইয়া মারা গেলে আরেক মেয়ে উম্মে কুলসুমকেও উসমানের সাথে বিয়ে দেন। নবীজি অনেক ভালোবাসতেন উসমানকে। তাকে সম্মান করতেন। জান্নাতের সুসংবাদও দিয়েছেন।
.
ফাতিমাকে বিয়ে আলি রা.-এর সাথে। শিশুদের মধ্যে প্রথম ঈমান আনয়নকারী। ইসলামের পূর্বে নবীজির হাতেই মানুষ হয়েছেন আলি। সব সময় নবীজির সাথেই থাকতেন। নবীজি তাকে ভালোবাসতেন। কাছে কাছে রাখতেন। জান্নাতের সুসংবাদও দিয়েছেন।
.
(চার) মেয়েদের মতামত।
নবীজি নিজের মতটাই মেয়েদের ওপর চাপিয়ে দিতেন না। বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের মতামতকে প্রাধান্য দিতেন। শ্রদ্ধা করতেন। মূল্যয়ন করতেন। আলি রা. যখন ফাতিমার ব্যাপার প্রস্তাব দিলেন, নবীজি এলেন ফাতিমার কাছে:
-আলি তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে!
ফাতিমা চুপ করে রইলেন। সম্মতি আছে বুঝতে পেরে নবীজি বিয়ে পড়িয়ে দিলেন (ইবনে সা‘দ)।
.
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, তিনি কন্যার চুপ থাকাকেই সম্মতি বলে ধরে নিয়েছেন:
-কুমারী মেয়েকে তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেয়া যাবে না।
-তার সম্মতি কিভাবে বুঝবো?
-সে প্রস্তাব শোনার পর চুপ থাকলেই হবে (মুত্তাফাক)।
.
কন্যা সন্তান হলো পিতার কাছে আল্লাহ দেয়া আমানত। যাকে তাকে এই আমানত সঁপে দেয়া যাবে না। সেটা হলে আমানতের খেয়ানত। মেয়ের অপছন্দের পাত্রের হাতে তাকে জোর করে তুলে দেয়াও সুন্নাহবিরোধী কাজ।
.
আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, নবীজি মা-হারা কন্যাদের নিয়ে কতো ভাবিত ছিলেন। তাদের বিয়ে নিয়ে এত ব্যস্ততার মধ্যেও ভাবতেন। ভাল পাত্রের খোঁজখবর রাখতেন। অন্যদের কাঁধে ফেলে রাখেননি। বাবাকেই মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে এগিয়ে আসা সুন্নাত। দেখেশুনে সম্বন্ধ করা।
.
(পাঁচ) মোহরানা।
মেয়েদের মোহরানা হবে নাগালের মধ্যে। আকাশছোঁয়া কিছু হবে না। যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ হবে। নবীজি মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন সহজ মোহরে। আলি রা. এসে বললেন:
-ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি ফাতিমাকে আমার ঘরে (বাসরে) তুলে দিন!
-তুমি তাকে কিছু দাও!
-আমার কাছে তো কিছুই নেই!
-কেন তোমার সেই হাতমী বর্মটা কোথায়?
-সেটা আমার কাছেই আছে!
-সেটাই ফাতেমাকে দাও!
.
এটাই ছিল নবীজির আদরের কন্যার মোহর। যিনি জান্নাতের মহিলাদের সর্দার। আমাদের যুগে যা শুরু হয়েছে, সম্পূর্ণ ইসলামের মূলসুরের বিপরীত। মোহর বেশি ধার্য করা যদি সম্মানের বিষয়ই হতো, নবীকন্যার চেয়ে বেশি মোহার আর কার হতো!
.
(ছয়) মেয়েকে রুখসত
ফাতিমাকে স্বামীর বাড়ি পাঠানোর সময়, একটা গালিচা পাঠিয়েছিলেন নবীজি। চামড়ার একটা বালিশও দিয়েছিলেন। যার ভেতরে ছিল খেজুর পাতার আঁশ। যাঁতা, পানির মশক আর দুইটা কলসও দিয়েছিলেন (আহমাদ)।
.
নবীজি নবদম্পতির জন্যে একটা কক্ষ নির্ধারণ করেছিলেন। একটা জানলা ছিল সে কক্ষে, মাঝে মধ্যে নবীজি সেটা দিয়ে উঁকি দিয়ে যোগাযোগ করতেন।
কন্যার পিতার উচিত মেয়ের নতুন সংসারের টুকিটাকি সামানা সাধ্যানুযায়ী সরবরাহ করা। স্বামীর ওপরই সবকিছু চাপিয়ে না দেয়া। বিয়ের সময় পাত্রের আয় রোজগার সাধারণত কমই থাকে। শ্বশুরের এই সমস্যা থাকার কথা নয়। উক্ত হাদীসে সেটাই বোঝা যায়। যদি সামর্থ্য থাকে আরকি!
.
(সাত) ওলীমা
ফাতিমার বিয়েতে ওলীমার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তবে অনাড়ম্বরভাবে। আলি যখন প্রস্তাব দিলেন, নবীজি বললেন:
-বিয়ে হলে তো ওলীমার আয়োজন করতেই হবে।
উপস্থিত সা‘দ বললেন: আমি একটা দুম্বা দিবো। আরেক জন বললো: আমি অন্য কিছু দেবো।
ওলামায়ে কেরাম বলেনধ: ওলীমার আয়োজন করাটা মুস্তাহাব। ওলীমার আয়োজন বাসরের পরে হলেই ভাল। ব্যতিক্রম হলেও সমস্যা নেই।
.
(আট) দু‘আ
বাসর রাতে নবীজি বলে দিয়েছিলেন আলিকে:
-আমার সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষা করো। আমি আসবো।
নবীজি এসে ওজু করলেন। অবশিষ্ট পানি আলির ওপর ছিটিয়ে দিলেন। তারপর দু‘আ করলেন:
اللهم بارِكْ فِيْهِما، وبَارِكْ لَهمَا في بِنائِهِما
ইয়া আল্লাহ! তাদেরকে বরকত দান করুন। তাদের বংশধরের মধ্যে বরকত দান করুন (তাবারানী)।
স্বামী-স্ত্রীর জন্যে দু‘আ করা মুস্তাহাব। নবীজি আবদুর রাহমান বিন আওফ রা.-এর জন্যেও দু‘আ করেছিলেন: আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন (মুত্তাফাক)।
.
(নয়) বিয়ের পর
বিয়ের পরও নবীজি তার কন্যাদেরকে ভুলে যাননি। নিয়মিত খোঁজ-খবর করেছেন। শত ব্যস্ততায়ও ফাঁক করে মেয়েদের জন্যে ঠিকই সময় বের করেছেন। দেখতে গিয়েছেন। দেখা গেছে কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি আদরের কন্যাদের কথা মনে রেখেছেন। ভেবেছেন।
বদরের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময়, অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তেও দয়াল নবী মেয়েকে ভোলেননি। প্রিয় রুকাইয়া অসুস্থ। তাকে দেখাশোনার জন্যে স্বামী উসমানকে থেকে যেতে বললেন। বদর যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতও দিলেন উসমানকে। নবীজি সান্ত¦না দিয়ে বললেন:
-তুমি একজন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীর মতোই সওয়াব পাবে, গনীমত পাবে (বুখারী)।
.
(দশ) মিলমিলাপ
নবীজি কন্যাদের ঘর-সংসারের খোঁজ শুধু উপর উপর থেকে রাখতেন না। সবদিকেই তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। একদিন গিয়ে দেখেন ঘরে আলি নেই:
-আলি কোথায় গেলো?
-আমার সাথে রাগ করে বেরিয়ে গেছেন। বলে যাননি!
নবীজি একজনকে বললেন:
-একটু দেখো তো, মানুষটা কোথায় গেলো?
-তাকে মসজিদে শুয়ে থাকতে দেখেছি!
.
নবীজি দেখলেন ঠিক তাই। আলি শুয়ে আছে। একপাশ থেকে পরিধেয় চাদর সরে গিয়েছে। শরীরে মাটি লেগে আছে। কাছে গিয়ে মাটি মুছে দিতে দিতে বললেন:
-হে আবু তুরাব (মাটির বাবা)! ওঠ ওঠ! (মুত্তাফাক)।
.
(ক) মেয়ের সাথে জামাই রাগ করলে, শ্বশুরকে একটু নমনীয় হওয়া সুন্নাত। জামাইয়ের রাগ ভাঙানোর জন্যে। এতে দোষের কিছু তো নেইই বরং সওয়াব আছে।
(খ) নবীজি কিন্তু ফাতেমা বা আলি কারো কাছেই মনোমালিন্যের কারণ জানতে চাননি। আগ্রহও দেখাননি। সরাসরি জামাইয়ের কাছে চলে গেছেন।
(গ) আমাদের সমাজে অনেক দাম্পত্য কলহের মূলে থাকে মেয়ের মা। অথবা মেয়েপক্ষীয় কেউ। অহেতুক নাক গলায়। মেয়েকে প্রশ্রয় দেয়। খুঁটিনাটি সব খবরের তত্ত্বতালাশে লেগে পড়ে। ফলে সমস্যা আরো বেড়ে যায়। অনেক সময় বিয়েও ভেঙে যায়।
(ঘ) নবীজি নিজেই আলির কাছে গেছেন। তাকে খুশি করার চেষ্টা করেছেন। নিজের মুবারক হাতে ধূলি ঝেড়েছেন। মজার একটা উপনামও দিয়েছেন। পাশাপাশি অত্যন্ত প্রিয় মেয়ের সাখে কেন রাগ করলো, এ ব্যাপারে টু-শব্দটিও করলেন না। চমৎকার আদর্শ। গভীর প্রজ্ঞা।
(ঙ) বড়দের সংসারেও ছোটখাট বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হয়। রাগারাগি হয়। মন কষাকষি হয়। রাগ করে বের হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এটা একান্তই মানবীয় ব্যাপার। দোষের কিছু নেই।
আলি রা. হয়তো বুদ্ধি করেই বের হয়েছিলেন। ঘরে থাকলে রাগ বাড়বে বা ফাতিমাকে গরম কথা বললে মনে ব্যথা পাবেন। এমন হওয়াও বিচিত্র নয়। উভয়ের কল্যানের দিকে লক্ষ্য করেই এমনটা করেছিলেন।
= রাগ বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকলে, কটু কথার কারণে স্ত্রী মনে ব্যথা পাবে, এমন শংকা থাকলে, স্বামীকে ঘর ছেড়ে সাময়িকভাবে বের হওয়া ভাল।
= পরস্পর রাগারাগির সময় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে, উভয় পক্ষের নিজের আচরণ নিয়ে ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
= ফাতিমা বের হননি। ঘরেই ছিলেন। এটাই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। তিনি যদি বাবার বাড়িতে চলে যেতেন, তুলনামূলক পরিস্থিতিটা আরেকটু বেশি আড়ষ্ট হয়ে পড়তো। এখন যেমন হয়, কিছু হলেই বাবার বাড়িতে ফোন করে না হয় ব্যগ গুছিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়। এটা সমাধান নয়। বরং সমস্যা।
= এহন পরিস্থিতিতে বাবা-মায়ের কর্তব্য হলো, মেয়েকে বোঝানো। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সবরের পরামর্শ দেয়া। স্বামীর সাথে সুন্দর আচরণ করার প্রতি উৎসাহিত করা।
.
(এগার) বাপের বাড়ি!
মেয়ে বেড়াতে এলে নবীজি কী যে খুশি হতেন! তাকে দেখার সাথে সাথেই নবীজির চেহারা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠতো। মনে অপ্রত্যাশিত অমূল্য কিছুর দেখা পেয়েছেন। বহুকাঙ্খিত দুর্লভ কোনও কিছুর সন্ধান পেয়েছেন। আয়েশা রা.-ই এমনটা বলেছেন।
ফাতেমা এলে নবীজি উঠে সহাস্যে অভ্যর্থনা জানাতেন। হাত ধরে টেনে এনে নিজের আসনে বসতে দিতেন। আদর করে চুমু খেতেন।
নবীজিও মেয়ের বাড়িতে গেলে, ফাতিমা পরম আন্তরিকতায় উঠে এসে হাত ধরতেন। আব্বুকে চুমু খেয়ে সাগ্রহে বসতে দিতেন (আবু দাউদ-তিরমিযী)।
.
ফাতিমার রা.-এর হাঁটাচলা ছিল সম্পূর্ণ নবীজির মতো। অবিকল। হুবহু। মেয়েকে দূর থেকে দেখা গেলেই নবীজি বলে উঠতেন:
-মামণি! এসো এসো! (মারহাবান বিবনাতী!) (মুত্তাফাক)
বর্তমানের বাবারা মেয়ের জন্যে কতটুকু করে? বিয়ের পর? কিছু বাবা তো নিজের ঠাঁটবাঁট বজায় রাখতে গিয়ে মেয়ের বাড়ির ত্রিসীমানাও ঘেঁষেন না। মনে করেন রাশভারি-ভারিক্কিভাব না হলে বাবা হয়! সারাক্ষণ ভ্রুকুটি কুঞ্চিতকপাল করে না রাখলে বাবা হওয়ার সার্থকতা কোথায়! সন্তানদের সাথে পৌরুষ দেখানোকেই পিতৃত্বের চরম মোক্ষ বলে ধারনা করে বসেন।
.
(বারো) সৎকাজে উদ্বুদ্ধকরণ!
নবীজি কন্যাদেরকে সব সময় উদ্বুদ্ধ করতেন দুনিয়ার চাকচিক্যে মোহিত ও অভ্যস্ত না হতে। দুনিয়ারকে খাটো করে দেখতে। তিনি দান-সাদাকা করতে উৎসাহিত করতেন। একবার ফাতিমার ঘরের দরজায় এসে ফিরে গেলেন। ভেতরে প্রবেশ করলেন না।
ফাতিমা বড়ই পেরেশান হয়ে পড়লেন। এমনটা তো কখনোই হয় না। আজ কী হলো! কোনও অসঙ্গতি? আলি এসে দেখলেন ফাতিমা অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত:
-কী হয়েছে ফাতিমা, কোনও সমস্যা?
-নবীজি আমাদের ঘরের দরজায় এসেও প্রবেশ না করে ফিরে গেছেন।
আলি হন্তদন্ত হয়ে নবীজির কাছে এলেন:
-ইয়া রাসুলাল্লাহ! ফাতিমা বড়ই পেরেশান হয়ে আছে! আপনি ঘরে গেলেন না।
-আলি! শোন আমার সাথে দুনিয়ার চাকচিক্যের কোনও সম্পর্ক নেই। আমি ফাতিমার দরজায় একটা নকশাদার পর্দা দেখতে পেলাম!
.
আলি ফাতিমাকে এসে বিষয়টা জানালেন। ফাতিমা বললেন:
-আপনি গিয়ে নবীজিকে বলুন, আমার কী করনীয় সে ব্যাপারে আদেশ করতে!
নবীজি বললেন:
-তাকে বলো পর্দাটা অমুক পরিবারকে দিয়ে দিতে। তাদের প্রয়োজন আছে (বুখারী)।
.
= নকশাদার পর্দা ব্যবহার নাজায়েয নয়। ছবি না থাকলে হয়েছে। কিন্তু এমন পর্দা নবীজি নিজে যেহেতু ব্যবহার করতেন না, মেয়ের জন্যেও পছন্দ করেননি।
= তিনি চাননি তার কন্যা দুনিয়ার জাঁকজমকের মোহে পড়ুক। তদ্রূপ পিতাদেরও উচিত নিজের সন্তানদেরকে দুনিয়ার প্রতি মোহহীন করে গড়ে তোলা।
= ছেলে বা মেয়ের বাড়িতে যদি নাজায়েজ কাজ হয়, তাহলে পিতামাতার রাগ করে ওমুখো না হওয়া বৈধ। তবে সম্পর্ক ছিন্ন বা বয়কট নয়। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়ই কর্তব্য। না হলে অনেক ছেলে-মেয়ে আছে যারা বাবা-মাকে ছাড়তে পারবে কিন্তু নাজায়েয কাজ ছাড়তে পারবে না। তাদের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কার্যকর হবে না।
.
(তেরো) কৃচ্ছতা ও আমলের উৎসাহ
আটা পিষতে পিছতে হাতের চামড়া ক্ষয়ে গিয়েছিল। খুবই কষ্ট পেতেন। বাবার কাছে গিয়ে একজন খাদেম চাইবেন বলে ঠিক করলেন। ঘরে এসে আব্বুকে পেলেন না। নিজের প্রয়োজনের কথা আয়েশা রা.কে বলে এলেন। নবীজি ঘরে ফিরে খবরটা শুনলেন। সাথে সাথে মেয়ের ঘরে এলেন। আলি রা. বলেছেন:
-আমরা তখন শুয়ে পড়েছিলাম। নবীজিকে দেখে আমরা উঠতে উদ্যত হলাম। আমাদেরকে নিরস্ত করে বললেন:
-জায়গাতেই থাকো! উঠো না।
আমাদের দু’জনের মাঝে এসে বসলেন। এত কাছে তার পায়ের শীতল ছোঁয়া আমার বুকের সাথে লাগছিল প্রায়! তিনি বললেন:
-আমি কি তোমাদেরকে একজন খাদেমের চেয়েও উত্তম কিছুর কথা বলবো?
-জ্বি বলুন!
-যখন রাতে শুতে যাবে চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার বলবে। তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহ বলবে। তেত্রিশ বার আলহামদুলিল্লাহ বলবে (মুত্তাফাক)।
.
= নবীজি নিজের পরিবারের জন্যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য চাননি। তাদেরকে সবরের শিক্ষা দিয়েছেন। আমল শিক্ষা দিয়েছেন।
= মেয়ের প্রতি কতোটা স্নেহশীল, জামাইকে কতোটা আপন করে নিয়েছিলেন, সেটা নবীজির বসার অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। তিনি তাদের শয়নকক্ষে গিয়ে, তারা শোয়া অবস্থাতেই কথা বলেছেন। অহেতুক লৌকিকতা পরিহার করে।
= ভাবতেও অবাক লাগে, তিনি মেয়ে ও জামাইয়ের মাঝে পা ছড়িয়ে বসেছেন! এবং সে অবস্থাতেই শিক্ষা দিয়েছেন।
= ওয়াজ করার আগে আপন ভঙ্গি অবলম্বন করে, ওয়াজের গ্রহনযোগ্যতা অনেকগুণ বাড়িয়ে নিলেন। এভাবে আপন ভঙ্গিতে ওয়াজ করলে, কেউ ফেলতে পারবে?
= কেউ কিছু চাইলেই সেটা চাহিদামাফিক দিয়ে দিতে হবে, এমনট নয়। খেয়াল করে দেখতে হবে, প্রার্থিত বিষয়টা তার আসলেই প্রয়োজন আছে কি না! তার বুঝ সম্পূর্ণ নাও হতে পারে। তাই যদি দেখা যায়, যাঞ্চাাকারী যা চাইছে সেটা নয়, বরং অন্যকিছু তারে বেশি প্রয়োজন, সেটা দিয়ে দেয়াই সুন্নাত। নবীজিও তাই মেয়েকে খাদেম না দিয়ে নির্দিষ্ট একটা তাসবীহ দিয়েছেন।
= শুধু তাসবীহ শিক্ষা দিয়েছেন তাই নয়, খাদেমের বিনিময়ে একটা দু‘আও শিক্ষা দিয়েছেন।
الهم ربَّ السماوات السبعِ، ورَبِّ الأرضِ ، وربَّ العرشِ العظِيمٍ ، ربَّنا وربَّ كلِّ شيئٍ ، فالِقَ الحَبِّ والنوى، ومُنَزِّلَ التوراةِ والإنجيلِ والفُرقان ، أعوذُ بكَ من شرِّ كلِّ شيئٍ أنتَ آخِذٌ بِناصِيَتِه، اللهم أنت الأولُ فليسَ قبلَك شيئٌ، وأنتَ الآخِرُ فليس بعدَك شيئٌ ، وأنت الظاهر فليسَ فوقَك شيئٌ ، وأنت الباطنُ فليسَ دُونَك شيئٌ ، اِقضِ عنَّا الدَََّينَ وأغْنِنا من الفقرِ (مسلم)
(চৌদ্দ) দায়িত্ববোধ!
নবীজি সন্তানদেরকে দায়িত্ববোধসম্পন্ন বানাতে সচেষ্ট থাকতেন। পিতা একবজন নবী,সুতরাং তাদের আর কোনও ভাবনচিন্তা নেই, কাজকর্ম নেই এমন যাতে না হয়। তারা যেন নিজের দায়িত্ব নিজেই বুঝে নেয়, নিজের কাজ নিজেই বুঝে নেয়, এজন্য নবীজি তাকিদদিতেন। তিনি একবার বলেছিলেন:
-হে ফাতিমা! তুমি নিজেকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো! আমি আল্লাহর কাছে তোমার জন্যে কিছুই করতে পারবো না (মুত্তাফাক)।
= অর্থাৎ আত্মীয়ার জোরে তুমি বেঁচে যাওয়ার ভরসায় বসে থেকো না। আল্লাহ তোমাকে শাস্তি দিতে চাইলে, আমার করার কিছুই থাকবে না।
.
(পনের) তাহাজ্জুদ
নবীজি কন্যাকে তাহাজ্জুদে উদ্বুদ্ধ করতেন। উৎসাহ দিতেন মেয়ে যেন নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ে। আলি রা. বলেছেন:
-এক রাতে নবীজি সা. এসে দরজায় টোকা দিলেন। আমাদের দু’জনকে সম্বোধন করে বললেন:
-কী নামায পড়বে না?
আমি বললাম:
-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের জানপ্রাণ আল্লাহর হাতে! তিনি যখন জাগাবেন আমরা তখন জাগবো!
আমার ত্বরিৎ জবাব শোনে নবীজি বিস্মিত হলেন। তিনি উরুতে চাপড় মেরে ফিরে যেতে যেতে বললেন:
-মানুষকে অতি বিতন্ডাপ্রবণ করে সৃষ্টি করা হয়েছে (কাহফ:৫৪)। মুত্তাফাক।
= নবীজি চাইতেন তার সন্তানরাও তাহাজ্জুদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে অভ্যস্ত হোক। শেষ রাতে ইবাদতের বিরাট সওয়াবের ভাগীদার হোক।
= তবে আলি উÍত্তর শুনে আর না ডাকাডাকি না করে ফিরে যাওয়াতে প্রমাণ হয়, তাহাজ্জুদ অত্যন্ত বরকতময় ইবাদত হলেও, আবশ্যক কোনও ইবাদত নয়।
= এখন তো বাবা-মায়েরা ফরজ নামাযের জন্যেও ডেকে তোলে না। বাবা-মায়ের কর্তব্য সন্তানকে নামাযের জন্যে ডেকে দেয়া।
.
(ষোল) অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য
নবীবি সন্তানের আবেগ-অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। তাদের আনন্দে আনন্দিত হতেন। তাদের বেদনায় বেদনার্ত হতেন। মেয়েদের দুঃখে দুঃখী হতেন। আলি রা. একবার আবু জাহলের মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। একথা শুনে ফাতিমা এলেন নবীজির কাছে। বাবাকে সংবাদটা জানালেন। নবীজি তখন বললেন:
-আবি আবুল আসের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। সে আমার সাথে সব ময় সত্য বলেছে। আমার সাথে ওয়াদ পূরণ করেছে। ফাতিমা আমার অংশ। তাকে কষ্ট দেয়া মানে আমাকে কষ্ট দেয়া। আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূলের মেয়ে আর আল্লাহর শত্রুর মেয়ে এক জায়গায় জমা হতে পারে না (মুত্তাফাক)।
.
নবীজি সুস্পষ্টভাবে আলি রা.কে এই বিয়ে থেকে নিরস্ত করেছিলেন। এখানে কয়েকটা বিষয় লক্ষ্যণীয়:
১: বিয়েটা হলে ফাতিমা কষ্ট পাবেন। তাহলে নবীজিও কষ্ট পাবেন। আর নবীকে কষ্ট দেয়া অনেক বড় গুনাহ।
২: বিয়েটা হলে মেয়ে দ্বীনদারির ক্ষেত্রে ফিতনায় পড়ে যাওয়ার আশংকা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
-আমি ফাতিমার দ্বীনের ব্যাপারে ফিতনার আশংকা করি (বুখারী)।
কারণ মেয়েলি আত্মসম্মানবোধটা জন্মগত। স্বামীর প্রতি তাদের অধিকারবোধও জন্মগত। বিয়েটা হলে ফাতিমা রা.-এর আচরণে অসংযত কিছু প্রকাশ পেয়ে যায় কি না! এমনটা আশংকা করেই নবীজির এমন সতর্ক পদক্ষেপ। মেয়ে তার মাকে হারিয়েছে। একে একে ভাইবোনদেরকে হারিয়েছে। দুনিয়াতে আপন বলতে বাবা আর স্বামী। আর সন্তান। এমন এতীম অবস্থায় স্বামীর বিয়েটা তার মনে ভিন্ন কোনও অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে, এমন আশংকা করেছিলেন হয়তো।এই ঘটনা ছিল মক্কা বিজয়ের পরের।
৩:আল্লাহ শত্রুর মেয়ে আর আল্লাহর রাসুলের মেয়ে এক ঘরের ঘরনী হওয়া ঠিক নয়। তাই নবীজি এমন বক্তব্য দিয়েচেন।
৪: ফাতিমার মর্যদা বর্ণনা করাও উদ্দেশ্য ছিল।
.
= তবে এই ঘটনায় বহুবিবাহ অবৈধ বা এমন কিছু বোঝার অবকাশ নেই। একাধিক বিয়ের বৈধতা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে। নবীজি বলেছেন:
-আমি আল্লাহর হালালকে হারাম সাব্যস্ত করি না। আল্লাহর হারামকে হালাল সাব্যস্ত করি না।
.
(সতের) আনন্দ প্রদান
নবীজি কন্যাদেরকে খুশি রাখতে চাইতেন। তাদের সাথে কানে কানে চুপি চুপি কথাও বলতেন। আয়েশ রা. বলেছেন:
-নবীজি যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন একদিন ফাতিমা এলেন। নবীজি তাকে কাছে ডেকে নিলেন। কানে কানে কিছু বললেন। একবার হাসলেন একবার কাঁদলেন। আমি ফাতিমাকে হাসিকান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। সে বললো:
-আমি আল্লাহর রাসূলের গোপন কথা প্রকাশ করবো না।
.
নবীজির ইন্তেকালের পর আয়েশা রা. আবার ফাতিমাকে সেদিনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন:
-কী বলেছিলেন সেদিন?
তিনি বলেছিলেন:
-আমি মারা যাবো। আমার পরে তুমিও কিছুদিন পর মারা যাবে।
আমি আব্বাজানের মুখে একথা শোনে কেঁদে দিয়েছিলাম। আমার কান্না দেখে, তিনি দ্বিতীয়বার কানে কানে বললেন:
-তুমি হবে জান্নাতে নারীদের সর্দার।
একথা শোনে আমি হেসে দিয়েছিলাম।
.
(আঠার) যিকির-দু‘আ
নবীজি তার কন্যাদেরকে বেশি বেশি যিকির ও দু‘আর প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি একবার বলেছিলেন:
-ফাতিমা! তুমি সকাল সন্ধ্যায় পড়বে:
يا حَيُّ يا قَيُّومُ بِرحمتكَ أستَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأنِي كُلَّه، ولاتَكِلْنِي إلي نفسي طرفَةَ عيْنٍ (ابن السني)
এমন আরো আমল শেখতেন মেয়েকে। দু‘আ করতে বলতেন।
.
(উনিশ) উপহার
নবীজি সময় সুযোগ মতো মেয়েদেরকে উপহার-উপঢৌকন দিতেন। আলি রা. বলেছেন:
-আমাকে একবার নবীজি একটা চাদর পরিয়ে দিলেন। আমি সেটা পরে বাইরে বের হলাম। তিনি বললেন:
-আলী! তুমি পরার জন্যে চাদরটা দিইনি। ফাতিমাদের ওড়না বানানের জন্যে সেটা দিয়েছি!
ফাতিমারা হলেন: ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ সা.। ফাতিমা বিনতে আসাদ (আলির মা)। ফাতিমা বিনতে হামযা।
= মেয়ে বলেই উপহার দেয়া যাবে না এমনটা নয়। ছোট-বড় যে কোনও উপহার-উপঢৌকন দেয়া যাবে। এবং দেয়াটাই সুন্নাত।
= বাবা বড় কিছু, বড় পদের অধিকারী, সেটা অন্যদের কাছে। ঘরের বাইরে। সন্তানের কাছে আব্বু আব্বুই। তাদের সাথে সুন্দর স্নেহার্দ্র হয়ে থাকা কাম্য।
.
(বিশ) বিপদে ধৈর্যধারন
নবীজি কন্যাদেরকে শুধু আদরই করেননি, কষ্টসহিষ্ণুতার শিক্ষা দিয়েছেন। মানসিক স্থৈর্যের শিক্ষা দিয়েছেন। বালা-মুসীবতে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। একবার মেয়ে সংবাদ পাঠালেন নবীজির কাছে, তার এক সন্তান মারা গেছেন। তিনি যেন তাড়াতাড়ি করে আসেন। নবীজি মেয়ের কাছে সালাম পাঠিয়ে বলে পাঠালেন:
-আল্লাহ যা উঠিয়ে নিয়েছেন সেটা মূলত তারই। যা তিনি দান করেন সেটাও তার। সবকিছুরই বেঁচে থাকার নির্দিষ্ট একটা মেয়াদ আছে। সুতরাং সবর করো। আল্লাহর কাছে সওয়াবপ্রাপ্তির আশা রাখো।
.
নবীজির কাছে আবার সংবাদ পাঠানো হলো। যেভাবেই হোক একবার এসে দেখে যেতে বলা হলো। নবীজি এলেন। শিশুটাকে তার হাতে তুলে দেয়া হলো। নবীজি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। দু’চোখ বেয়ে অজস্র ধারায় পানি গড়াতে শুরু করলো। সাথে ছিলেন সা’দ বিন উবাদাহ রা.। তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন:
-এটা কী ইয়া রাসূলাল্লাহ?
-এটা আল্লাহর রহমত। তিনি বান্দার কলবে ঢেলে দিয়েছেন। আল্লাহ তার দয়ালু বান্দাদের প্রতিই দয়া করেন।
.
= নবীজি উক্ত দুু‘আতে মেয়েকে সবরের শিক্ষা দিয়েছেন। ধৈর্য ধারনের কথা বলেছেন। আল্লাহর দান আল্লাহই উঠিয়ে নিয়েছেন, এটা নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই।
= সন্তানের মৃত্যুতে বাবা-মায়ের বা আত্মীয়-স্বজনের কান্না স্বাভাবিক বিষয়। তবে বাড়া-বাড়ি বা ভাড়াটে কাঁদুনী আনা নিষিদ্ধ। শোকের ধকলে স্বাভাবিক যে কান্না আসে, সেটাকে নবীজি আল্লাহর রহমত বলে আখ্যায়িত করেছেন।
= ছেলে মেয়ে বাবার কাছে আবদার করতেই পারে। বৈর্ধ আবদারে জোরাজুরিও করতে পারে।
= ছেলে মেয়ে বাবা-মায়ের কাছে সান্ত¦না চাইলে বাবা-মায়ের উচিত কিছু করা। তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো।
.
(একুশ) মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ
নবীজি সন্তানদের মৃত্যুসংবাদে শোকাহত হতেন। ব্যথিত হতেন। নবীজি তার জীবদ্দশাতে ছয়জন সন্তানের মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। শুধু ফাতিমা রা.-ই জীবিত ছিলেন।
.
আনাস বিন মালিক রা. বলেছেন:
-সন্তান মারা গেলে নবীজি শোকাহত হতেন। তার দু’চোখ অশ্রুসজল হতো। তবে অস্থির হতেন না। তখনো আল্লাহর অপছন্দনীয় কোনও কথাই তার মুখ দিয়ে বের হতো না।
.
আনাস রা. থেকে বর্ণিত:
-নবীকন্যা উম্মে কুলসুম ইন্তেকালে পর, নবীজিকে দেখেছি তার কবরের কাছে বসে আছেন। দু’চোখ দিয়ে দরদর অশ্রুধারা বেয়ে নামছে (বুখারী)।
.
নবীজির কনিষ্ঠ সন্তান ইবরাহীমকে দুধ পান করতেন আবু সাইফিল কীনের স্ত্রী। তিনি পেশায় একজন কামার ছিলেন। আনাস রা. বলেন:
-আমরা আবু সাইফের বাড়িতে গেলাম। নবীজি মৃত ইবরাহীমকে কোলে তুলে নিলেন। পরম মমতায় চুমু দিলেন। নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ শুঁকলেন। নবীজির চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল।
আবদুর রহমান বিন আওফ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন:
-আপনিও কাঁদছেন ইয়া রাসূলাল্লাহ?
-হ্যাঁ রে ইবনে আওফ! এটা আল্লাহর রহমত। চক্ষু অশ্রুসজল হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়। কিন্তু তবুও আমরা রবের সন্তুষ্টিবাচক কথাই মুখ দিয়ে প্রকাশ করবো। বাবা ইবরাহীম রে! আমরা তোর বিচ্ছেদে ভীষল শোকাহত! (মুত্তাফাক)।
.
আনাস রা. বলেছেন:
-আমি নবীজির মতো সন্তানবৎসল আর কাউকে দেখিনি। পুত্র ইবরাহীম যখন এক কামারের বাড়িতে দুধ পান করতেন, নবীজি মাঝে মধ্যে দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দেখতে যেতেন। আমিও প্রায়ই তার সাথে সাথে যেতাম। একবার নবীজি কামারের বাড়িতে গেলেন। তখন কামার কাজ করছিল। পুরো ঘর ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে ছিল, আমি দৌড়ে আগে আগে ঘরে প্রবেশ করে কামারকে বললাম:
-কাজটা সামান্য সময়ের জন্যে বন্ধ রাখো। নবীজি এসেছেন।
.
= ইবরাহীম ইন্তেকাল করার পর, নবীজি বলেছিলেন:
-আমার ছেলে ইবরাহীম দুগ্ধপান করাবস্থায় মারা গেছে। পুরো করে যেতে পারেনি। বাকি থাকা দুধপান সে জান্নাতে করবে।
.
= ইবরাহীম ইন্তেকাল করেছিলেন ষোল বা সতের মাস বয়েসে। তখনো দুধপানের মেয়াদ শেষ হতে সময় বাকী ছিল।
.
কন্যাদের মৃত্যুর পরও নবীজি নিজদায়িত্বে গোসল দেয়াতেন। কাফনের বন্দোবস্ত করতেন। নিজেই জানাযার ইমামতি করতেন। নিজ হাতে দাফন করতেন। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে দু‘আ করতেন। ইম্মে আতিয়্যাহ রা. বলেছেন:
-উম্মে কুলসুম ইন্তেকাল করার পর, তিনি বললেন:
-উম্মে কুলসুমকে ভালোভাবে গোসল দাও। বড়ই পাতা মেশানো পানি দিয়ে। গোসল দেয়া শেষ হলে, সামান্য কর্পূর মেখে দিও। তারপর আমাকে খবর দিও।
আমরা নবীজির বাতলে দেয়া পদ্ধতিতে সব কাজ শেষ করে, তাকে খবর দিলাম। তিনি তখন গায়ের চাদর খুলে আমাদেররকে দিয়ে বললেন:
-এটাকে শি‘আর হিশেবে ব্যবহার করো।
শি‘আর হলো মুর্দারের শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা কাফনের কাপড়।
.
= নবীজি চাদরটা আগেই দিয়ে দিতে পারতেন। গোসল শেষ হওয়ার অপেক্ষা করেছেন। কারন আগেই চাদরটা খুলে দিলে, গোসলের সময়টুকু চাদরটা এমনিতে কোথায় রাখা হতো। সেটা শোকাতুর পিতার অভিপ্রেত ছিল না। কন্যাহারা পিতা চেয়েছিলেন, মা মরা মেয়েটা যেন মৃত্যুর পরও, বাবার উষ্ণছোঁয়াযুক্ত চাদর গায়ে দিয়ে পরকালের যাত্রা শুরু করুক। সদ্য খোলা বাবার অশ্রুভেজা চাদর পরে আখেরাতের পরিভ্রমণ শুরু করুক।
আগে খুলে দিলে তো, উষ্ণতা কিছুটা হলেও কমে যেতো। তাই গোসল শেষ হওয়ার অপেক্ষা করেছেন।
= নবীজি ছিলেন একজন আদর্শ পিতা। একজন পিতার যতোটা ভালো, দায়িত্বশীল আর স্নেহময় হওয়া সম্ভব, নবীজি ছিলেন ঠিক তাই।
= সন্তানের প্রতি তার অপত্য স্নেহ দেখে আমরা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারি, তিনি কতোটা কষ্ট পেয়েছেন একে একে তাদের ইন্তেকালে!
= আমরা কল্পনাও করতে পারবো না, নবীজির প্রতি ফোঁটা অশ্রুর পেছনে কতো কষ্ট, কতো শোক, কতো ব্যথা, কতো সবর, কতো ধৈর্য, কতো সংযম, কতো স্নেহ, কতো মমতা লুকিয়ে ছিল!
= জন্মের আগে বাবাকে হারিয়েছেন। ছয় বছরের মাথায় মমতাময়ী জননীকে হারিয়েছেন। কিছুদিন পর হারিয়েছেন বাবার স্নেহ দেয়া দাদাজানকে। আরও পরে হারিয়েছেন বাবার স্থান দখল করে নেয়া চাচাজানকে। একই সাথে হারিয়েছেন প্রাণাধিকা স্ত্রীকে। যিনি ছিলেন একাধারে অনেককিছু। তারপর হারিয়েছেন ছয় সন্তানকে।
= এতকিছুর পরও তিনি কখনো অসংযত হননি। অধৈর্য হননি। আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থেকেছেন। কৃতজ্ঞ থেকেছেন। শোকরগুজার থেকেছেন।
= বাবা হিশেবে নবীজি কেমন, এটা নিয়ে পড়তে গিয়ে, একটা কথাই শুধু মনে হয়েছে, সন্তান হিশেবে ছেলের চেয়ে মেয়ে সন্তানই বোধ হয় আল্লাহ ও তার নবীর কাছে বেশি প্রিয়। অবশ্য ছেলেসন্তান দিয়ে যে কাজ হবে, কন্যাকে দিয়ে সেটা হবে না। আবার একটা কন্যাসন্তান বাবা-মায়ের হৃদয়ের আকুতি-অনুভূমি যতোটা জীবন্তভাবে বুঝতে পারে, ছেলে তার কিয়দংশও পারে না।
————–

ভুল ধরা পড়লে ধরিয়ে দিলে, ভীষণ কৃতজ্ঞ থাকবো। সংশোধিত হলে, আশা করি উম্মতেরও ফায়দা হবে

One Reply to “নবীজি যখন ‘আব্বু’!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *