বোকা,খেটে খাওয়া মানুষগুলো বেঁচে আছে বলে পৃথিবীটা এখনও ভালোই আছে।

ঘটনা প্রবাহ-১
———–
কাজ থাকার দরুন বাইরে মানে ব্যাংকে যাচ্ছিলাম।দেওয়ান হাট থেকে আগ্রাবাদে টেম্পুগুলোতে(টেম্পুও বলা যায় না।সাইজে কিছুটা বড়।সিএঞ্জি টাইপের কালার) চড়ে আসার সময় দেখলাম টাকা তোলার দায়িত্ব পালন করছিল ৯-১০ বছরের খুব মায়াবী চেহারার এক ছেলে।সহজ-সরল,বোকা এই ছেলেটিকে এক ব্যক্তি একসাথে ৩ জনের ভাড়া ৭ টাকা করে দেওয়ার জন্য ৫০ টাকার একটা নোট দিয়েছিল।ছেলেটি তাকে ১০ টাকার ৬টা নোট ফেরত দেয়!

আমরা সবাই ছেলেটির সাথে কিছুক্ষন মজা করছিলাম।সহজ-সরল ছেলেটি অসম্ভব লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিল।আমি যখন ভাড়া দিলাম ১০ টাকা সে তখন কনফিউজড যে সে আমাকে কতটাকা ফেরত দেবে।ভাগ্নে…বেঁচে থাক অনেক বছর।তোমার মত এই বোকা,খেটে খাওয়া মানুষগুলো বেঁচে আছে বলে পৃথিবীটা এখনও ভালোই আছে।

ঘটনা প্রবাহ-২
———–
আগ্রাবাদে নেমে হেঁটে হেঁটে ব্যাংকে যাচ্ছিলাম।আজ বোধহয় ওইদিকে সিটি কর্পোরেশনের সেরকম আজ চলছে।পরিচ্ছন্ন কর্মীদের দেখলাম ড্রেনের ময়লা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত।ঘটনা হল সেসব পরিচ্ছন্ন কর্মীরা ড্রেনের অসম্ভব ময়লা পানির ভেতর নেমে ময়লা উঠাচ্ছিল।একবার শুধু ভাবছিলাম,যদি সে মানুষগুলোর জায়গায় আমি থাকতাম!কিংবা আমরা যারা নিজেদের সভ্য সমাজের মানুষ বলে বিবেচনা করি তারা থাকত!আমি শিউর সেই ময়লা পানি হাতে পায়ে লেগে চুলকাতে চুলকাতে গ্যাংরিন হয়ে যেত।আবারও ভেবে দেখলাম “এই বোকা মানুষগুলো আছে বলেই আমাদের সমাজ এখনও টিকে আছে;যারা সৎ উপার্জনের টাকা দিয়ে বেঁচে আছে”।

ঘটনা প্রবাহ-৩
————
কাজ শেষ করে আন্দরকিল্লার দিকে ছুট দিলাম।কিছু বই কিনতে হবে।বইয়ের দোকানে বই কিনেও ফেললাম।ফেরবার সময় হটাত পরিচিত একজনের সাথে দেখা হয়ে গেল।কুশল জিজ্ঞাসা করার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন বই কত দিয়ে কিনলেন?আমি বললাম __ টাকা দিয়ে কিনলাম।তিনি অবাক হয়ে বললেন আপনাকে তো ওই ব্যাটা ঠকাইসে।কমসেকম ৩০-৪০ টাকা।আমি কিছুই বলিনি।শুধু বোকার মত একটা হাঁসি দিয়ে বললাম, ভাই আমার একটা কাজ আছে।এখন তাহলে চলি।প্রশ্ন হল আমি কেন ৩০-৪০ টাকা সেভ করলাম না।আসলে আমি বেশ ভালো করেই জানি আন্দরকিল্লায় কমদামে বই পাওয়া যায়।তারপরেও আমি দোকানদারের সাথে বলতে গেলে মুলোমুলিই করিনি।এ কারনে আপনারা আমাকে বোকা বলতে পারেন।কিন্তু আমার কিছু নীতি আছে;চিন্তা ভাবনা আছে।যে দেশে খাবার পন্য মজুদ করে ব্যবসায়ীরা জনগনের কোটি কোটি টাকা বছরের পর বছর মেরে দেয়;কিংবা শ্রমিকের ঘাড়ে চড়ে তাদের ঠকিয়ে কিছু মানুষ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়;কিংবা শেয়ার বাজার মেরে দিয়ে শ’কোটি টাকার মালিক হয়;কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেয় না সে দেশে মাত্র ৩০-৪০ টাকার জন্য কোন মানুষের সাথে আমি বিবাদ করতে রাজী নই।কি হবে এই ৩০-৪০ টাকা দিয়ে?না হয় সে দোকানদার তার সন্তানকে শুধু একবেলার নাস্তা করাতে পারবে এ টাকা দিয়ে।তাই আমি যেখানেই যাই না কেন সাধারন মানুষের প্রতি আমার একধরনের ভালোবাসা কাজ করে।মাঝেমাঝে রিকশা করে চড়লে রিকশাওয়ালাকে হয়ত ৫ টাকা বেশি দিয়ে দেই।তাতে যদি এই দরিদ্র মানুষটার কিছু উপকার হয়।হয়ত বোকা বলবেন আমায় অনেকে।আমি বলব, ভাই বোকা হয়ে অনেক ভালোই আছি।বোকাদের চিন্তা-ভাবনা কম।তাছাড়া বোকারা নাকি সবচেয়ে বেশি সুখী হয়।আমি বোকাই থাকতে চাই।

ঘটনা প্রবাহ-৪
———–
আন্দরকিল্লাহ থেকে বাসায় ফেরার সময় হটাত এক দরিদ্র এবং কমপক্ষে ৭০ বছরের এক অশীতিপর বৃদ্ধাকে দেখলাম রাস্তায় বসে বসে ভিক্ষা করছে।অসম্ভব করুন চাহুনি।এই বয়সে একজন বৃদ্ধা নিরুপায় হয়ে তখনই ভিক্ষা করতে নামে যখন তার সন্তানরা তার খোঁজ নেয় না।খুব খারাপ লাগল।আল্লাহ যদি আমাকে কোটিপতি করে দিত কিছু একটা করতাম এসব মানুষদের জন্য।কিন্তু সে সামর্থ্য আল্লাহ আমাকে দেয় নি।পকেটে ২ টাকার একটা নোট ছিল।দিয়ে দিলাম।এই দু টাকা দিয়ে আমি হয়ত কোন বিশ্ব জয় করিনি।কিন্তু ক্ষনিকের জন্য এক অশীতিপর বৃদ্ধার চোখের কোনে চিকচিক করে উঠা খুশির কারন হলাম।এটাই আমাকে মানসিকভাবে অসম্ভব আনন্দ দিচ্ছে।

আমরা সবাই যদি আমাদের দেশের সাধারন মানুষগুলোর কথা একটু ভাবি; কি হয়!দেশটা আমাদের সবার……………

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *