মানুষ যতদিন বাঁচবে তত দিন শ্বাস নিবে ,আর শীত আসলে আমাদের ছোটোখাটো শ্বাস কষ্ট দেখা দেয়

মানুষ যতদিন বাঁচবে তত দিন শ্বাস নিবে , আর যে দিন শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে সেদিনই মানুষ পরলোক ভ্রমণ করবে
আর শীত আসলে আমাদের ছোটোখাটো শ্বাস কষ্ট দেখা দেয় ।
আর এ থেকে রক্ষা পেতে হলে আপনাকে যা করতে হবে , নিচের সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

স্বাস্থ্য বার্তাঃ হাঁপানি থেকে রক্ষার পাওয়ার উপায়। যাদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তাদের বলা হয় এজমার রোগী। বাংলায় বলে হাঁপানি, এজমা হলে মানুষের শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা হয়। সে সময় নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শ্বাসের সঙ্গে একটা টান চলে আসে। এই টানকে বলে হাঁপানি। যখন মানুষের লাংগস কিংবা ফুসফুস যথেষ্ট পরিমাণ বাতাস টানতে পারে না, তখন শরীরে বাতাসের অভাব দেখা দেয়। আর এটাকে আমরা এজমায় আক্রান্ত হওয়া বুঝে থাকি। শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে বেশি। আর শীতকালে ঠাণ্ডাজনিত এলার্জির কারণে এজমা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে এজমা কিংবা হাঁপানি রোগ বাড়ছে।

গ্রীক ভাষায় এজমা শব্দের অর্থ হলো হাঁপ ধরা অথবা হ্যাঁ করে শ্বাস টানা। গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস যে কোন ধরনের শ্বাস কষ্টকে হাঁপানি নাম দিয়ে ছিলেন। এজমা বা শ্বাসকষ্ট এমন একটা রোগ যার নির্দিষ্ট কোন কারণ নেই। আবার যার এজমা আছে সে কখনো এই রোগ থেকে একেবারে ভালো হবে না কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। এজমাকে বলা হয় এমন একটা রোগ যার নিয়ন্ত্রণ একমাত্র চিকিৎসা। এজমার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। উন্নত দেশ বলুন আর উন্নয়নশীল দেশই বলুন সব স্থানেই এজমা বেড়েই চলেছে। ৩০০ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে সারাবিশ্বে এই রোগে ভুগছেন। ২০২৫ সালের মধ্যে আরো ১০০ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কম বয়সের ছেলেদের মাঝে এই রোগ বেশি দেখা যায়। আর প্রাপ্ত বয়সের রোগীদের মাঝে মহিলারা বেশি আক্রান্ত হয়। এজমা রোগ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্রে স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। প্রায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, অনেক সময় মৃত্যুও হতে পারে।
হাঁপানি রোগীর শ্বাসনালী অতিরিক্ত সংবেদনশীল। এর ফলে কোন উত্তেজক যেমন ঘরে ধুলা, সিগারেটের ধোঁয়া, ঠান্ডা লাগা, ফুলের রেণু কিংবা পশুপাখির সংস্পর্শে আসা ইত্যাদিতে হঠাৎ করে শ্বাসনালী সংকুচিত করে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করতে পারে। রোগীর শ্বাসনালীর পথ স্বাভাবিক অবস্থার থেকে সরু হয়ে যায়, ফলে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশের পথে বাধার সৃষ্টি হয়। ফলে বুকের মধ্যে শব্দ হয়, শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়, কাঁশি হয়, বুকে ভার হয়ে চেপে আসে। এই আক্রমণ মৃদু আকারে দেখা দিলে সামান্য ওষুধ কিংবা ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়ে যেতে পারে, আবার এটা মারাত্মক আকার ধারণ করে রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সঠিক চিকিৎসা হলে এই ধরনের মৃত্যুর ৯০% রোধ করা সম্ভব। এছাড়া রোগীর শ্বাসনালীতে দীর্ঘ মেয়াদী প্রদাহ হয়ে থাকে। একই পরিবেশে একজনের এজমা অ্যাটাক হচ্ছে কিন্তু অন্য জনের হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ ঐ আবহাওয়ায় এমন কিছু জিনিস আছে, যার এজমা অ্যাটাক হলো সে ঐ জিনিষের প্রতি সংবেদনশীল। ঐসব জিনিষকে বলা হয় এজমা ট্রিগার কিংবা অ্যালার্জি। এজমা ট্রিগার কিংবা অ্যালার্জি গুলো মোটামুটি নিম্নরূপঃ
১. ধুলো বালি,
২. ফুলের রেণু,
৩. পোকা মাকড়,
৪. ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম,
৫. কিছু ওষুধ (যেমন এসপিরিন)
৬. আবেগ (দুঃখের, ভয়ের কিংবা আনন্দের কারণে হতে পারে),
৭. ধূমপান,
৮. পোষা প্রাণী।
৯. ঠাণ্ডা এবং ভাইরাস,
১০. পশু-পাখীর লোম ইত্যাদি।

শ্বাসনালীতে respiratori syncytial ভাইরাস আক্রমণ করলে এজমা হতে পারে। এছাড়া যৌন কার্যক্রম কারো ক্ষেত্রে এজমা অ্যাটাক করতে পারে। এসব অ্যালার্জি একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারো একটা, দুটো কারো পাঁচ সাতটা থাকতে পারে। সুতরাং এজমা অ্যাটাক থেকে বাঁচার জন্য অবশ্যই ধরণ অনুযায়ী এগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। যেসব কারণে হাঁপানি সৃষ্টি হয়ে থাকে, তার উপর ভিত্তি করে এজমা কে দুভাগে ভাগ করা যায়।
এলার্জি কিংবা বাহিরের কারণ জনিত এজমা এর ফলে কোন উত্তেজক যেমন ঘরের ধুলো, ধুলো বালি, ফুলের গন্ধ, নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্য, ছত্রাক, সিগেরেটের ধোঁয়া, ঘরের ঝুল ঝাড়া, ঠাণ্ডা লাগা, ফুলের রেণু কিংবা পশুপাখির সংস্পর্শে আসা ইত্যাদিতে হঠাৎ করে শ্বাসনালী সংকুচিত করে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করতে পারে। জন্ম থেকে এদের হাঁপানি হওয়ার প্রবণতা থাকে। অনেক সময় এসব রোগীর এলার্জির অন্যান্য উপসর্গ থাকতে পারে। যেমন এলার্জিক rhinitis, ইত্যাদি। জীবনের প্রথম দিকে এধরনের হাঁপানি হয়ে থাকে।
Spasmodic কিংবা ভিতরগত কারণ জনিত এজমাঃ
এধরনের রোগীদের এলার্জির কোন ইতিহাস থাকে না। জীবনের শেষ দিকে অর্থাৎ অধিক বয়সে এরূপ হাঁপানি হয়ে থাকে।
শ্বাসকষ্ট, বুকে আওয়াজ, বুকে চাপ বোধ হওয়া, কাশি উঠতে থাকে। কোনো কোনো সময় কাশি একমাত্র লক্ষণ হতে পারে। প্রায় সময়ই রাত্রে, ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রমের সময় হয়। তবে যেকোন সময়ই এজমা অ্যাটাক হতে পারে।
চিকিৎসাঃ হাঁপানি তীব্র আক্রমণ হলে রোগীকে সোজা করে বসান, শান্ত করুন এবং আশ্বস্ত করুন। Salbutamol জাতীয় মেডিসিন ৫বার খাবেন, ৫চাপ ওষুধ নেন, প্রতি চাপ নেওয়ার পর ৫সেকেন্ড দম বন্ধ রাখুন, ৫মিনিট পরে আবার একই ভাবে মেডিসিন ব্যবহার করুন। কোন পরিবর্তন না হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন। এলার্জি জনিত হাঁপানির ক্ষেত্রে যেসব জিনিষে রোগীর শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি পায় সেগুলো পরিহার করা উচিৎ।
এজমা প্রতিরোধের উপায়
১. এলার্জি কারক বস্তু এড়িয়ে চলুন। যেমনঃ ধুলো, বালি, ঘরের ঝুল, ধোঁয়া ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন।
২. ঘর বাড়িকে ধুলো বালি থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করা। এজন্য দৈনিক অন্তত একবার ঘরের মেঝে, আসবাপত্র, ভিজা কাপড় দিয়ে মুছতে হবে। অথবা ভ্যাকিউম ক্লিনার ব্যবহার করা।
৩. ঘরে কার্পেট রাখবেন না।
৪. বালিশ, তোষক, ম্যাট্রেসে তুলা ব্যবহার না করে স্পঞ্জ ব্যবহার করা।
৫. শীতকালে যথা সম্ভব গরম পানিতে গোসল করা।
৬. ধূমপান করবেন না।
৭. যেসব খাবারে এলার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তা পরিহার করে চলুন।
৮. ঠাণ্ডা খাবার, আইসক্রিম ইত্যাদি খাবেন না।
৯. মানসিক চাপ, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তাকে ইতিবাচক মনোভাবে মানিয়ে চলুন। কিংবা মানসিক চাপের কারণকে এড়িয়ে চলুন।
১০. পেশাগত কারণে এজমা হলে চেষ্টা করতে হবে স্থান কিংবা পেশা পরিবর্তন।
১১. পরিশ্রম কিংবা খেলাধুলার কারণে শ্বাসকষ্ট বাড়লে চেষ্টা করতে হবে পরিশ্রমের কাজ কম করতে।
১২. সব সময় ইতিবাচক চিন্তা করবেন। ইতিবাচক মন আপনাকে ভালো থাকতে সাহায্য করবে।
১৩. রেণু পরিহারে সকাল কিংবা সন্ধ্যা বাগান এলাকায় কিংবা শস্য ক্ষেতের কাছে যাবেন না।
১৪. রেণু এলাকা থেকে বাসায় ফিরে মাথার চুল ও কাপড় ধুয়ে ফেলুন।
১৫. কুকুর বিড়াল বাগান থেকে রেণু বহন করতে পারে। এজন্য নিয়মিত কুকুর বিড়ালকে গোসল করানো প্রয়োজন।
এজমা নিয়ন্ত্রণে আনতে যা করা উচিৎ
১. ধূমপান করবেন না। ধূমপায়ী ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলুন।
২. শয়নকক্ষে খুব বেশি মালামাল রাখবেন না।
৩. ঘরের সম্ভাব্য সব কিছু ঢেকে রাখবেন, যাতে ধুলো বালি কম উড়ে।
৪. টিভি, মশারি স্ট্যান্ড, সিলিং, পাখার উপর জমে থাকা ধুলো বালি সপ্তাহে একবার অন্য কাউকে দিয়ে পরিষ্কার করে নিবেন।
৫. শোকেস কিংবা বই selfie রাখা পুরনো খাতা, ফাইল, বইপত্র অন্য কাউকে দিয়ে ঝেড়ে নিবেন।
৬. বাস, মোটর গাড়ি কিংবা যানবাহনের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকবেন।
৭. উগ্র সুগন্ধি ব্যবহার করবেন না। তীব্র দুর্গন্ধ, ঝাঁজালো গন্ধ থেকে দূরে থাকুন।
৮. বাসায় হাঁস, মুরগি, বিড়াল, কুকুর, পোষাপ্রাণী যেন না থাকে এবং এগুলোর সঙ্গে মেলামেশা করবেন না।
৯. বাড়িতে ফুলের গাছ লাগাবেন না।
১০. ঘাসের উপর বসে থাকা পরিহার করুন। নিজে ঘাস কিংবা গাছ কাটবেন না।
১১. শীতে গরম পানি দিয়ে গোসল করবেন এবং শীতের কাপর ব্যাবহার করবেন।
১২. শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন। জোরে শ্বাস টানুন, প্রায় ১৫ সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন। দুই ঠোঁট শীষ দেওয়ার ভঙিতে আনুন এবং ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে শ্বাস ফেলুন প্রতিদিন সকাল ও বিকালে ১০ মিনিট করে মুক্ত পরিবেশে।
১৩. সর্বদা ভয় ও চিন্তামুক্ত থাকার চেষ্টা করুন এবং কখনো হতাশাগ্রস্ত হয়ে ভেঙে পরবেন না।
১৪. ছোট বাচ্চারা পুতুল নিয়ে খেলা করবে না।
১৫. ঘর ঝাড়ু দেবেন না। ঘর ঝাড়ু দিতে হলে মাস্ক, তোয়ালে কিংবা গামছা দিয়ে নাক বেঁধে নেবেন।
১৬. কাশি শক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো এন্টিবায়োটিক ওষুধ খাবেন।
১৭. ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি কম খাবেন। হালকা গরম পানি পান করবেন।
১৮. বিছানার চাদর কিংবা বালিশের কভার পাঁচ দিন পর ধুয়ে ব্যবহার করবেন।
১৯. মশারি সপ্তাহে একবার ধুঁয়ে ব্যবহার করবেন।
২০. যদি কোনো খাবারে সমস্যা হয়, Example: গরুর মাংস, ইলিশ মাছ, চিংড়ি মাছ, হাঁসের ডিম, বেগুন, কচু, পাকা কলা, আনারস, নারিকেল ইত্যাদি কম খাবেন।
২১. সর্বদা ধুলো বালি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন।
২২. এলার্জি কিংবা এজমা কোনো কঠিন রোগ নয়, একটু মনযোগী হলে এটি নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকা সম্ভব।
২৩. ডাক্তারের দেওয়া সব নিয়ম, পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্র যথাসম্ভব মেনে চলুন।
২৪. শীতকালে এজমা রোগীদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

ভাল লাগলে অবশ্যই মন্তব্য করে আমাদের জানাতে ভুলবেনা, আপনাদের মন্তব্য আমাদের আরো অনেক অতসাহিত করবে। সবাই ভাল থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *