মালিক ইবনে দিনার (একটি ফিরে আসার গল্প)

মালিক ইবনে দিনার (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন একজন ধার্মিক এবং (আল্লাহর প্রতি) অনুগত ইমাম। কেউ একথা কল্পনাও করতে পারে না যে, এক সময় তিনি খুব রূঢ় ও অবাধ্য মানুষ ছিলেন। তাঁর তওবা করার গল্পটি আমাদের দেখায় যে, কোনো মানুষ – সে যতো খারাপই হোক না কেন – আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার অযোগ্য নয়।
ইবনে দিনার ছিলেন খুব অত্যাচারী লোক। কেননা তিনি ছিলেন নীতিহীন ও মাতাল। এমনকি তিনি সুদের ব্যবসাও করতেন, যার কারণে লোকজন তাকে ঘৃণা করতো ও এড়িয়ে চলতো। তার একটি ছোট মেয়ে ছিলো যাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। মাত্র তিন বছর বয়সে যখন তার মেয়ের মৃত্যু হয়, তিনি উন্মত্তপ্রায় এবং শোকে কাতর হয়ে পড়েন, আর মদপান করতে থাকেন যতক্ষণ না তার হুঁশ চলে যায়।

এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তিনি কিয়ামত প্রত্যক্ষ করছেন এবং একটি ভয়ঙ্কর সাপ তাকে ছোবল মারছে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ইবনে দিনার যখন পালানোর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না, একজন বৃদ্ধ লোক ছাড়া তিনি আর কাউকেই দেখলেন না এবং তার দিকে ছুটতে লাগলেন। তাকে সাহায্য করার পক্ষে লোকটি ছিলো খুবই দুর্বল, তবে তিনি ইবনে দিনারকে অন্য একটি পথের দিকে নির্দেশ করলেন। আর ইবনে দিনার ঠিক ততক্ষণ দৌড়াতে থাকলেন যতক্ষণ না তিনি নিজেকে জাহান্নামের কিনারায় আবিষ্কার করলেন।
ভীতসন্ত্রস্ত ইবনে দিনার পুনরায় বৃদ্ধ লোকটির কাছে ছুটে গেলেন এবং তাকে উদ্ধার করার জন্য অনুরোধ করলেন। কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধ লোকটি তাকে বললো, “দেখতেই পাচ্ছো আমি দুর্বল। আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারবো না।” তারপর তিনি ইবনে দিনারকে আরেক দিকে ছুটতে বললেন, আর ইবনে দিনার তা-ই করলেন। তিনি যখন ছুটছিলেন তখন দেখলেন সাপটি তার খুব নিকটবর্তী এবং তাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলো। হঠাৎ তিনি দেখলেন তার ছোট মেয়ে তাকে সাপের হাত থেকে বাঁচাতে এসেছে।
এতক্ষণ যা কিছু ঘটে গেলো তার জন্য খুব ভীতসন্ত্রস্ত থাকলেও মেয়েকে দেখে ইবনে দিনার স্বস্তি পেলেন এবং মেয়ের হাত ধরে দুজন একসাথে বসলেন, ঠিক আগে যেভাবে তারা বসতেন। তারপর মেয়েটি তার বাবাকে এই প্রশ্নটি করলোঃ
বাবা!

“যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবর্তীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?”
[সূরা আল-হাদিদঃ ১৬]
ইবনে দিনার বললেন, “মা! আমাকে সাপটি সম্পর্কে বলো।” তখন মেয়ে বললো, “এটি ছিলো আপনার খারাপ কাজ যা আপনি স্তুপাকারে জমা করছিলেন যতক্ষণ না তা আপনাকে প্রায় গিলে ফেললো। বাবা, আপনি কি জানেন না যে, একজন মানুষ দুনিয়াতে যে ‘আমল করবে কিয়ামতের দিন একত্রে সেগুলো তার সাথে মিলিত হবে? আর বৃদ্ধ লোকটি ছিলো আপনার ভালো কাজ, যেগুলো খুব সামান্য এবং দুর্বল, তাই তা আপনার অবস্থা দেখে কাঁদছিলো এবং আপনাকে সাহায্য করার অপারগতা প্রকাশ করছিলো। যদি এতো অল্প বয়সে আপনার মেয়ে মারা না যেতো তবে দুনিয়াতে করা আপনার ভালো কাজ কোনো উপকারেই আসতো না।”
ইবনে দিনার জেগে উঠলেন এবং চিৎকার করে বললেন, “হে আমার রব, এখনই (আমি তওবাহ করলাম); হে আল্লাহ! এখনই। হ্যাঁ, এখনই।” তারপর তিনি উযূ করে ফযরের সালাত আদায়ের জন্য মসজিদের দিকে রওয়ানা হলেন এবং তওবাহ করে আল্লাহর দিকে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করলেন। মসজিদে প্রবেশ করেই তিনি শুনতে পেলেন ইমাম সাহেব ঠিক সেই আয়াতটিই তিলাওয়াত করছেন যেটি তার মেয়ে তাকে স্বপ্নের মধ্যে বলেছিলো।
বস্তুতঃ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের প্রতি পূর্ণ সচেতন যারা তার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে চায়। আর তাঁর অসীম দয়ার কারণে তিনি প্রতিনিয়ত তাদের সুযোগ দিয়ে যান যাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে এবং তাঁর নিকটবর্তী হতে পারে।
তওবাহ করার পর ইবনে দিনার সালাতের প্রতি একনিষ্ঠতা এবং রাতজুড়ে দু’আ ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটির জন্য সুপরিচিত হয়ে উঠেন। তিনি বলতেন, “হে আল্লাহ, একমাত্র আপনিই জানেন কে জান্নাতের বাসিন্দা হবে, আর কে হবে জাহান্নামের বাসিন্দা। আমিই বা কোন দলের অংশ? হে আল্লাহ, আমাকে জান্নাতের বাসিন্দাদের সাথে যোগ দেওয়ার সুযোগ দিন এবং জাহান্নামবাসিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে মুক্তি দিন।”
চরম অত্যাচারী, মদ্যপ এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের প্রতি অবহেলাকারী থেকে ইবনে দিনার বিখ্যাত ধার্মিক ‘আলিমে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। অসম্মানের পাত্র হওয়ার পরও তিনি এমনই পরিবর্তিত হয়েছিলেন যে, আজও মানুষ তাঁকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধার সাথে তাঁর কথা স্মরণ করে এবং মহান আল্লাহর কাছে তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণের জন্য দু’আ করে। এক সময় যেই মানুষটির‘আমল তাকে জাহান্নামের বাসিন্দা করে দিতে পারতো, আমরা আশা করি সেই ইবনে দিনার চিরকাল জান্নাতে বাস করবেন।

এটি ছিলো মহান আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিনের কাছে ইবনে দিনারের আন্তরিক তওবার গল্প।
এখন আমার, আপনার অবস্থা কী? ঠিক এই মুহূর্তে আমরা কী ধরনের মানুষ? আমরা কী ভালোর দিকে পরিবর্তিত হবো? প্রকৃতপক্ষে আমাদের উচিত কোনো সময় নষ্ট না করে লক্ষ্য স্থির করা এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা যাতে আমরা সফল হতে পারি।
ইবনে দিনার বলেন,
“কোনো কোনো হাদীসগ্রন্থে আমি পড়েছি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “অবশ্যই আমি আল্লাহ, রাজন্যবর্গের অধিপতি, সম্রাটদের সম্রাট। রাজাদের অন্তর আমার নিয়ন্ত্রণাধীন। বান্দাগণ যখন আমার আনুগত্য করে, তখন তাদের রাজা বাদশাহদের অন্তরকে রহমত ও করুণার সমন্বয়ে তাদের দিকে ঘুরিয়ে দেই। আর যখন বান্দারা আমার অবাধ্যতা অবলম্বন করে,তখন তাদের রাজা বাদশাহদের অন্তরকে রাগ ও কঠোরতার দিকে ঝুঁকিয়ে দেই, যার ফলে তারা প্রজাদের কঠিন শাস্তি আস্বাদন করায়। সুতরাং রাজা বাদশাহদের অপমান করায় নিজেদের ব্যস্ত রেখো না, বরং আমার নিকট তওবাহ করো, ফলে আমি রাজা বাদশাহদের অন্তরে তোমাদের জন্য করুণা ও সহানুভূতি স্থাপন করে দিবো।”
[সাফওয়াত আত-তাফাসীর, খণ্ড ১, পৃ. ৪১৯]
চলুন আমরা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করি, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর সাথে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করি। ইনশা আল্লাহ একমাত্র তখনই পুরো মুসলিম উম্মাহ (ইসলামের উপর) অবিচল এবং তওবার ফল ভোগ করতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *