যেভাবে ইহুদী মহিলা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ করে ছাগলের মাংসের ভিতরে বিষ মিশিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে চেয়েছিল

ঐ মহিলাটি মোহাম্মদকে মারতে নতুন প্ল্যান শুরু করলো……আরো জানতে নিচের সম্পূর্ণ পড়ুন

৬২৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন আরবের মদিনা নগরী থেকে ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মা) দুরে অবস্থিত খায়বার নামক মরুভূমিতে বসবাসরত ইহুদিগণের সাথে মুসলিমগণের সঙ্ঘটিত একটি যুদ্ধ। মুসলিমদের ইতিহাস অনুসারে, মুসলিমগণ সেখানে দুর্গে আশ্রয় নেয়া ইহুদিদেরকে আক্রমণ করেছিল।
৭ম হিজরিতে মদীনা আক্রমণ করার ব্যাপারে খায়বারের ইহুদীদের নতুন ষড়যন্ত্রের কারনে খায়বার যুদ্ধ হয়। খায়বার ছিল মদীনা থেকে ৮০ মাইল দূরের একটি বড় শহর। এখানে ইহুদীদের অনেক গুলি দূর্গ ও ক্ষেত খামার ছিল। মূলত খায়বার ছিল ইহুদীদের একটি নতুন উপনিবেশ। খায়বারের ইহুদীরা বনু কোরাইজা গোত্রের ইহুদীদের কে বিশ্বাসঘাতকায় উদ্দীপিত করেছিল। এছাড়া মুহাম্মাদ (সা) কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র এই খায়বার থেকে হত। খায়বারের ইহুদীরা গাতাফান গোত্র ও বেদুঈনদের সাথে মিলিত হয়ে মদীনা আক্রমণ করার ব্যাপারে ষড়যন্ত্র করছিল। খায়বার যুদ্ধে পরাজিত ইহুদীদের কে মুহাম্মাদ কোন নির্বাসন দেন নি। প্রতি বছর তাদের উৎপাদিত ফল ফসলের অর্ধেক ইহুদীরা মুসলমানদের কে দিবে এই শর্তে খায়বারের ইহুদীরা খায়বারে থাকার অনুমতি পায়। কিন্তু এই খায়বার যুদ্ধের পর পর এক ইহুদী মহিলা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ করে ছাগলের মাংসের ভিতরে বিষ মিশিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে চেয়েছিল। এই ঘটনার পরেও মুহাম্মাদ খায়বারের সকল ইহুদীদের কে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

আক্রমণের কারণ প্রসঙ্গে, স্কটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াট খায়বার যুদ্ধে বনু নাদির গোত্রের উপস্থিতি উদ্ধৃত করেন, যারা মদিনার ইসলামী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী আরব গোত্রগুলোর মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা জাগিয়ে তুলছিল। ইতালীয় প্রাচ্যবিদ লরা ভেক্সিয়া ভ্যাগ্লিয়েরি ওয়াটের তত্ত্বের সাথে ঐকমত্য্য পোষণ করে দাবী করেন যে, যুদ্ধের পেছনে আরও কারণ থাকতে পারে, যেগুলো হল, ইহুদিদের উক্ত দুরভিসন্ধির প্রতিক্রিয়া মুহাম্মাদের সাহাবীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধ অভিযানসমূহের রসদ হিসেবে যুদ্ধলব্ধ মালামালসমূহ লুণ্ঠনের উপযোগিতা।

পরিশেষে খায়বারের ইহুদিগণকে অবরোধ করা হয় এবং উক্ত উপত্যকায় তাঁদেরকে থাকার অনুমতি দেয়া হয় এই শর্তে যে, তারা মুসলিমগণকে তাঁদের উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক বাৎসরিকভাবে প্রদান করবে। খলিফা ওমররের সময়ে ওমর কর্তৃক বহিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওখানেই তাদের বসবাস অব্যাহত ছিল। এই বিজয়ের ফলাফলস্বরূপ বিজিত ইহুদিদের উপর ইসলামের বিধান অনুযায়ী জিজিয়া কর আরোপ করা হয় এবং তাদের অধিভুক্ত জমিসমূহ মুসলিমদের প্রশাসনিক দখলের অন্তর্ভুক্ত হয়। বিনিময়ে, ইহুদিগণ তাদের ধর্মপালনের অনুমতি পায়, বৃহৎ পরিসরে নিজ সম্প্রদায়ের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভ করে, মুসলিমদের কাছ থেকে বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে প্রতিরক্ষা লাভের প্রতিশ্রুতি লাভ করে এবং তাদেরকে সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ এবং যাকাত প্রদানের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়, যেগুলো মুসলিম নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক।

৭ম শতাব্দীতে, খায়বার ছিল ইহুদিদের বাসস্থান। উক্ত ইহুদি অধিবাসীগণ খাইবারে তাঁদের একটি দুর্গে কামান, তলোয়ার, বর্শা, ঢাল এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করে রেখেছিল। অতীতের কিছু পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ দুর্গে অস্ত্রশস্ত্র জমা রাখার কারণ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, উক্ত অস্ত্রশস্ত্রগুলো সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোর মধ্যে বিবাদ জন্ম দেয়ার উদ্দেশ্যে জমা রাখা হয়েছিল। ভ্যাগ্লিয়েরি মনে করেন যে, “উক্ত অস্ত্রগুলো ভবিষ্যতে বিক্রির জন্য গুদাম হিসেবে সেখানে জমা রাখা হয়েছিল” এটা ভাবা পূর্বের অনুমিত কারণ থেকে অধিক যৌক্তিক। একইভাবে, ইহুদিগণ উক্ত দুর্গে ২০ বস্তা কাপড়, ৫০০টি আলখাল্লা এবং সাথে আরও অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র বিক্রির জন্য সেখানে জমা রেখেছিল। ভেগ্লিয়েরির মতে এ সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেভাবে তাঁদের মধ্যে প্রতিহিংসার জন্ম দিয়েছিল, ঠিক একইভাবে ইতিহাস জুড়ে অনেক দেশের নিপীড়নের পেছনে এরকম অর্থনৈতিক কারণেরর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।

সমগ্র খায়বার মরুভূমি তখন তিনটি এলাকায় বিভক্ত ছিল: আল-নাতাত, আল-শিক্ক, এবং আল-কাতিবা, যেগুলো সম্ভবত মরুময়তা, আগ্নেয়গিরির খাদ এবং জলাধারের মত বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি এলাকাতেই একাধিক দুর্গ এবং আস্তানাসহ বাড়িঘর, গুদামঘর এবং ঘোড়াশাল ছিল। প্রতিটি দুর্গই একেকটি পৃথক পরিবারের অধীনে ছিল এবং আবাদি ফসল ও খেজুরবাগান দিয়ে ঘেরা ছিল। নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার জন্য তারা পাহাড়ের চুড়ায় অথবা উঁচু পাথুরে এলাকায় তাঁদের দুর্গগুলো স্থাপন করত।

৬২৫ সালে মুসলিমদের দ্বারা মদিনা থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর, বনু নাদির গোত্র খাইবার ময়দানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু নাদির গোত্রের প্রধান হুয়াই ইবনে আখতাব তার পুত্রকে সাথে নিয়ে মক্কাবাসী এবং মদিনা বিরোধী বেদুঈনদের সাথে যোগ দেয়। উপরন্তু নাদির গোত্র অন্যান্য আরব গোত্রকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অর্থও প্রদান করে। এছাড়াও তারা বনু গাতাফান গোত্র থেকে ফসলের অর্ধাংশ ঘুষ নিয়ে তাঁদের ২০০০ পুরুষ এবং ৩০০ ঘোড়া সওয়ারীকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয় এবং একইভাবে বনি আসাদ গোত্রকেও ধোঁকা দিয়ে রাজি করে। বনু সুলাইম গোত্রকেও তারা যুদ্ধে পাঠানোর জন্য উদ্যোগ নেয়, কিন্তু সুলাইম গোত্রের কিছু নেতা ইসলাম ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কারণে তারা তাঁদেরকে মাত্র সাতশত জন সেনা প্রদান করে। বনু আমির গোত্র মুহাম্মাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকার কারণে সম্যকভাবে যুদ্ধে যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, হুয়াই ইবনে আখতাব বনু কুরাইজা গোত্রকে চুক্তিভঙ্গ করে মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্ররোচিত করে। যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর পরাজয় এবং বনু কুরাইজার আত্মসমর্পণের পর, হুয়াইকে (যে কিনা সেই সময়ে কুরাইজাদের দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিল) এবং কুরাইজার পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়। হুয়াইয়ের মৃত্যুর পর, আবু আল-রাফি ইবনে আল-হুকাইক খাইবারের বনু নাদির গোত্রের দায়িত্ব নেয়। অল্প সময় পরই হুকাইক মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান প্রস্তুত করার অন্য প্রতিবেশী গোত্রগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু করে। এ ঘটনা জানার পর, মুসলিমগণ ইহুদিদের ভাষাভাষী এক আরবের সহায়তা নিয়ে হুয়াইকে গোপনে হত্যা করে।

এরপর হুকাইকের স্থলাভিষিক্ত হন উসাইর ইবনে যারিম। একটি সূত্রে বলা হয়েছে যে, উসাইর গাতাফান গোত্রের সাথে সলাপরামর্শ শুরু করেছিল এবং গুজব ছড়ায় যে সেও “মুহাম্মাদের রাজধানী” মদিনা আক্রমণের অভিপ্রায়ে ছিল। এই খবর পেয়ে নবী মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইস, বনু সালিমা গোত্রের একজন সদস্য এবং ইহুদি বিরোধী একটি গোত্রসহ আরও অনেককে সাথে নিয়ে উসাইরের কাছে প্রেরণ করেন। তারা উসাইরকে বলেন যে, সে মুহাম্মাদের কাছে গেলে মুহাম্মাদ তার সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং তাকে সম্মান দেবেন। সে রাজি না হওয়া পর্যন্ত তারা তাকে অনুরোধ করতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত সে কিছু ইহুদিকে সাথে নিয়ে তাঁদের সাথে রওয়ানা হয়। খাইবার থেকে ছয় মাইল দুরে কারারা নামক স্থানে আসার আগ পর্যন্ত উসাইর স্বাভাবিক ছিলেন, আচমকা তিনি তাঁদের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। উসাইর আবদুল্লাহর তলোয়ার কেড়ে নিতে উদ্যত হলে আবদুল্লাহ তার দিকে ছুটে এসে তার পা কেটে দেন। আবদুল্লাহকে উসাইর তার হাতে থাকা কাঠের লাথি দিয়ে আঘাত করলে তিনি মাথায় চোট পান। এরপর সেখানে উপস্থিত মুসলিমগণ তার ৩০ জন ইহুদি সঙ্গীর মাঝে সকলকে হত্যা করে একজনকে বাদে যে কিনা দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এছাড়াও আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস খাইবার যুদ্ধের আগের দিন মুহাম্মাদের অনুমতিতে স্বেচ্ছায় বনু নাদির গোত্রের সাল্লাম ইবনে আবু আল-হুকাইককে গোপনে হত্যা করেন।
অনেক ইসলামী পণ্ডিত উপরে উল্লেখিত চক্রান্তসমূহকে খায়বার যুদ্ধের কারণ বলে মনে করেন। মন্টগোমারি ওয়াটের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের এই কুচক্রী প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে মুহাম্মাদের কাছে আক্রমণ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। ভ্যাগ্লিয়েরি আরও যোগ করেন যে, আক্রমণের আরেকটি কারণ হতে পারে যে , খাইবারের এই ইহুদিরাই উহুদের যুদ্ধে চুক্তিতে আবদ্ধ মিত্রবাহিনীর বিরোধিতার জন্য দায়ী ছিল। শিবলী নোমানীও ভ্যাগ্লিয়েরির সাথে ঐকমত্য্য পোষণ করেন, এবং তিনি বনু নাদির গোত্রের হুয়াই ইবনে আখতাবকে এর জন্য দায়ী করেন, যে কিনা বনু কুরাইযা গোত্রকে খন্দকের যুদ্ধে মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্ররোচিত করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *