রম্য রচনাঃ ব্যাচেলরের জীবন যাপন।

বেচারা ব্যাচেলরদের নিয়ে তোফা সিনেমা দেখেছেন, হয়েছে আর্টফিল্মও। কিন্তু ব্যাচেলর বিষয়ক রম্য বোধ করি পড়া হয়নি আগে। মুখরা আপাতত এটুকুই, এবার মূল সংগীতে আসুন। সেদিন হল কি, রাস্তার মধ্যিখানে সহসাই দেখা হয়ে গেল এক পুরনো বন্ধুর সাথে। পুরনো মানে জামা-কাপড়ের মতো ফেঁসোওঠা রঙজ¦লা কেউ নয়। রীতিমতো প্রাণের বন্ধু, স্কুলজীবনে ওর সাথে মেলা কা–কীর্তি করেছি। সিনেমা দেখা থেকে পালিয়ে যাত্রাপালা- কি না করেছি এককালে।

বন্ধু বলল বাসায় চল। মেলা দিন আলাপ হয়নি। আজ জমিয়ে বসে আড্ডা মারা যাবে। শুনে মনে মনে খুশি হলাম। ইউনি-জীবন সদ্য শেষ হয়েছে। কাজ-কামের ধান্ধায় কাটছে সময়। এমন বেকার টাইমে বন্ধুর আন্তরিক আবাহন আমাকে আবিষ্ট করে। অমনি আমি তার প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে যাই।

সাঁজের মুখে ঢুকি তার ডেরায়। ব্যাচেলর বন্ধু আমার- তাই খুব একটা সান-শওকত আশা করিনি। কিন্তু ব্যাচেলরের ডেরা যে এমন হয়, জানা ছিল না। কারণ লাস্ট ফাইভ ইয়ারস আমি আবাসিক হলে ছিলাম। এখনও আছি। কিছুটা বাড়তি সময়। ছোটভাইয়েরা ভ্রুকুটিপূর্ণ তেরছা চাহনিতে বুঝিয়ে দেয়- ওরে ব্যাটা আদুভাই, আর কত। এবার মানে মানে কেটে পড়ো। আমরা একটু শান্তিতে দিন গুজরান করি।

আমি কিন্তু ওদের চোখের ভাষা বুঝি না। মানে বুঝতে চাই না। বুঝলেই বিপদ। লোটাকম্বল নিয়ে বাসার আশায় ভাড়া গুনতে হবে। তারচে একটু মটকা মেরে চোখের চামড়া ছেঁটে পড়ে থাকলেই হয়! হল তো আর কারো বাপের নয়, ওটা রাষ্ট্রীয় সম্পদ। আমরা রাষ্ট্রের ‘সুশিক্ষিত’ নাগরিক। আপন ভাবলে আপন, এত দিনের ঘর! মিছে করবো কেন পর!

সে যাক গে। বন্ধু আমাকে কাছে পেয়ে যেন ঈদের চাঁদ হাতে পেল। কতোদিনের জমানো কথা, আদুরে স্মৃতি- সব ঝাঁপি মেলে বসলো। একরুমের খুপরি বাসা। আয়তন একুনে দুশ স্কয়ারফিটের বেশি নয়। এখানে টানা বেশিদিন থাকলে আমার ফিটের ব্যামো হবে, এ-কথা হলপ করে বলতে পারি।

ছোট্ট পায়রার খোপের এককোণে সিঙ্গেল উনুন। গ্যাস-সংযোগ নেই। কখনও চেলাকাঠ, আবার কখনও ট্যাঁকে টাকা বুঝে সিলিন্ডার গ্যাসযোগে রান্না হয়। বাথরুম শেয়ারে, পাশের আরো দুটি রুমের সাথে। তিনরুমে সর্বমোট বাসিন্দার সংখ্যা তিন-তিনে নয়। বিছানা অবশ্য একটাই। একবেডে তিনজন সোমত্ত পুরুষ। নারী-পুরুষ মিক্সচার হলেও না হয় কথা ছিল। চুম্বকের বিপরীত মেরুর মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে পুঁইলতার মতোন পড়ে থাকতো।

বন্ধুর নাম মিহির। বলি ভায়া, এখানে তিনজনের জায়গা হয়? সরল প্রশ্ন, গরল উত্তর।

মিহির বলল, দোস্ত, হওয়ালেই হয়। মনে নেই ব্যাকরণে পড়তাম, যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন। বাস্তবিকই এই খুপরির এক বোর্ডারের নাম সুজন। এদের শোবার পদ্ধতিটা কিন্তু খুব বিজ্ঞানসম্মত। মানে এদিক-ওদিক মাথা দিয়ে শোয়। একজনের মাতা পুবে তো অপরজনের পশ্চিমে। এতে জায়গা সাশ্রয় হয়, যদিও নড়াচড়ার অভ্যেস থাকলে রাতে ঘুমের ঘোরে লাত্থি খাবার সম্ভাবনা থাকে।

মধ্যরাত অবধি মেলা গল্প হল। মিহিরের ঘরের বাকি দুজন আজ নেই। গাঁয়ে গেছে তাই রক্ষে। এইটুকুন ঘরে তিন প্লাস এক মোট চারজন শোবার কথা ভাবতেই পারি না আমি। খিদে পেয়েছে, অথচ রান্নার তেমন কোন আয়োজন চোখে পড়ে না। উসখুস করি আমি। বলতে চাই, মিহির, ডিনারে কী আহার হবে ভাই! রান্নার জোগাড় দেখছি না তো।

মিহির আমাকে সে ফুরসত দেয় না। একের পর এক পুরনো গল্প ফেঁদে বসে। যেন আরব্য রজনীর সেই শাহারজাদী আর দুনিয়ারজাদীর কাহিনীর মতো গল্পে গল্পে রাত্রিপার। আমি কিন্তু খিদে সইতে পারি না। আলালের ঘরের দুলাল কিনা, খিদে পেলেই অমনি পেটে মোচড় মারে। শেষে লাজলজ্জার মাথা খুইয়ে বলে বসি, মিহির দোস্ত, রাতে তোদের মেনু কী! মানে কী খাস?

ওহ হো হো, মেন্যু! যা যখন পাই কিছু একটা মুখে দিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকি। আসলে কি জানিস তো, রাতে বেশি খেয়ে লাভ নেই। খেয়ে তো আর কাজে যাবো না। মিছে ক্যালরি বাজে খরচ। তাই রাতের খাবার হয় সবচে স্বল্প ও সুপাচ্য। দেশটাকে তো গড়তে হবে, নাকি! ¯্রফে খেয়ে খেয়ে পেট ঢোল করে কী হবে বল!

আমি ততক্ষণে বুঝে গেছি ছাপোষা ব্যাচেলরের কান্নার কাহিনী। এরা বোধ হয় পেটে পাথর বেঁধেই বাঁচে। খিদের ভয়ে রাস্তা থেকে ধরে আনে কোন পুরনো বন্ধু। তারপর রাতভর গল্প করে, যাতে ক্ষুধাবোধ বেগড়বাই করতে না পারে।

মিহির অবশ্য বলল, একেবারে না খেয়ে কাটাই না। তাতে পিত্ত পড়ে। সচরাচর মুড়ি আর চানাচুর দিয়ে রাত কাবার। তবে আজ তুই আছিস বলে কিছু বিশেষ আয়েজন আছে। পরনো বন্ধু বলে কথা!

সেই আয়োজনটা কী শুনি? আমি ডাইরেক্ট প্রশ্ন করি। পেটে ডজনখানেক ছুঁচো ডন মারলে কী করি বলুন।

ও ফিচেল হেসে বলল, দোস্ত, স্যান্ডউইচ। খাসা খানা। মিহির এমনভাবে হাসে যেন বিশ^জয় করে বসে আছে।

সে কি! এর তো মেলা দাম। এতরাতে স্যান্ডউইচ পেলি কোত্থেকে? আমি মনে মনে খুশি হই। ও জিনিস মেলা দিন চাখা হয় নি। ছাত্র ঠেঙাতে গেলে আগে মাঝে মাঝে খেতাম। এখন ছাত্রের বাপ-মা চালাক হয়ে গেছে। দামি কিছু খেতে দেয় না। বেশি খেয়ে যদি ঝিমুনি পায়! দিলেও শেষ দিকে দেয়, যখন ছাত্রের পড়াশুনো শেষ।

মিহিরের রকমসকম দেখে আমার তীব্র সন্দেহ হয়। এত রাতে ও স্যান্ডউইচ কোথায় পাবে! নাকি মিছে স্তোক দিচ্ছে। আরো ঘণ্টাটাক পরে মিহির উনুনের কাছে যায়। দুটো পায়রার ডিম (ওর মতে মুরগির ডিম। দেখতে যদিও মার্বেলের মতো গুলটু গুলটু) বাটিতে ফেটে রাখে। তারপর কিঞ্চিত তেলবাচক বস্তু দেয় কড়ায়। ডিমদুটো আগে থেকেই ফাটা। অভিজ্ঞতাসূত্র জানি, বাজারে ফাটাডিমের দাম কম। কারণ গেরস্থরা এসব নেয় না। হোটেলে সস্তায় বিক্রি হয়। কিছু পচাও থাকে। সামান্য গ্যাস জে¦লে ডিমের ওমলেট বানায় মিহির। তারপর তৃপ্ত হেসে বলে, চল, এবার বসে পড়ি। রসনা-বিলাস করি।

মানে! কেন বসবি! কিসে! আমি তাজ্জব। খুপরির ভিতর নো খাট, আসবাব বলতে একখানা ছোট্ট তেঠ্যাঙা টেবিলমতোন। তাতে বসা দূরে থাক, কিছু রাখলেই অমনি ঢলে পড়ে। মিষ্টির প্যাকেটের প্লাস্টিক দড়িতে ঝুলছে নোংরা লুঙ্গি ও জামা। একে দারিদ্র্য বলবো, নাকি ব্যাচেলরশিপ বুঝতে পারি না। মিহির কাগজের ঠোঙায় পেঁচানো একটুকরো বাসি রুটি বের করে ডিমটুকু দু’টুকরো করে বেটে তাতে জড়িয়ে নেয়। তারপর আমার হাতে দিয়ে বলে, নে দোস্ত, স্যান্ডউইচ খা। খেয়ে দেখ, ফাসকাস!

সবার এমন করুণ দশা, তা কিন্তু বলছি না। তবে মানুষ হিসেবে ব্যাচলররা যে বিশেষ সমীহের স্তরে নেই, এটা কিন্তু প্রমাণনিরপেক্ষ ব্যাপার। একে তো ব্যাচেলরদের কোন চালচুলো থাকে না, এদের আবার কেউ বিশেষ পাত্তাটাত্তা দেয় না। না দেবার কারণও আছে। শেকড়ের টান না থাকলে তারা যে কোন অপরাধ করে বসবে, এমন ধারণা সমাজে পুরাকাল থেকে প্রচলিত। এরা যেখানে রাত সেখানেই কাত।

এমনও শোনা যায়, ব্যাচেলরদের একটা করে পিঠব্যাগ (কেতাবি ভাষায় কিটব্যাগ, ব্যাগপ্যাক বা রুকশ্যাক) সব সময় প্রস্তুত থাকে। কেউ একটু পু করে ডাকতে পারলেই ছুটে যায় সেখানে। সপ্তাহান্তে এমন ডাকের আশায় বেশি থাকে এরা। একবার গিয়ে থানা গাড়তে পারলেই দুটো দিনের হিল্লে হয়ে গেল। নো খরচা নো পাতি। বেশ আপসে দিবস পার।

তবে ব্যাচেলররা কিন্তু যথেষ্ট দিলদার হয়। কী, ভুল শুনছেন! হবে হয়তো। ওরা দিলদার নয়, ডিমদার।

ডিমদার ? সে আবার কী? কৌতূহলীরা কানখাড়া করেন।

ব্যাচেলরদের ডিমেরই কারবার। তাই ওরা ডিমদার। ফুলস্ক্যাপ নয়, ওরা ডিমাই সাইজের কাগজ কেনে। দামে সস্তা। খাদ্যখানা যাই বলুন, ডিম সাথে আছে। ডিমের ওমলেট, ডিম সেদ্ধ, ডিম-স্যান্ডউইচ (মিহিরের ঘরে যা খেয়ে এসেছি আমি), ডিম দিয়ে ছোলা, ডিমের কাটলেট, ডিমালু (ডিম দিয়ে আলুর ঝোল। সবচে কমন খাবার ব্যাচেলরের ডেরায়) ইত্যাদি ওদের মেনুতে থাকবেই। এরপরও আপনি বলবেন ওরা দিলদার, ডিমদার নয়!

এদের খাদ্যতালিকায় মুড়ি-চানাচুর একটি বিশেষ আইটেম। সাথে আদা-চা। শোনা যায়, এদের চায়ের পাতি নাকি একটি বিশেষ স্থান থেকে আসে। মানে কফিনের ভিতর লাশের পাশের পাতি। যা দিয়ে লাশের দুর্গন্ধ চাপা দেয়া হয়। নিন্দুকের মুখের কথা তো, তাই খুব একটা আমলে নিলাম না। তবে যা রটে, তা কিছু হলেও বটে।

ইদানীং ওরা পড়েছে এক মহা মুসিবতে। শুনেছেন বোধ হয়, হালে দেশে একপ্রকার গুটিপোকার সংক্রমণ শুরু হয়েছে। ওরা নব্য টেররিস্ট। মানুষ মেরে দেশের কিছু একটা ইয়ে করতে চায়। যাকেতাকে মেরে ফেলে, মরে যায় নিজে। বুঝি না এতে ওরা মজা পায় কি যে! ছড়া হল, হোক না। বেতালা জীবনে টুকটাক তাল এলে ক্ষতি কি!

বিশেষ জরিপে দেখা গেছে টেররিস্ট মানেই ব্যাচেলর। অবশ্য ব্যাচেলর মানেই টেররিস্ট- একথা বলতে মন কিছুতেই সায় দেয় না। কারণ এককালে অমন ‘ছারপোকার’ জীবন আমিও যে পার করেছি। বাসা ভাড়া নিতে যাবেন, মুখের উপর দোর বন্ধ করে দিয়ে বলবে, ব্যাচেলরদের জন্য নয়। যাও, রাস্তা দেখো। এমনভাবে বলবে যেন আপনি নর্দমার কীট বা বিছানার বিঁছা।

বা যদি কেউ ভাড়া দেয়ও, এমন সব শর্ত জুড়ে দেবে যে তারচে গলায় ফাঁস লাগানো ঢের আনন্দের। হয়তো বলবে, ভুলেও ছাদে যাওয়া যাবে না। মেপেজুপে কাশি দিতে হবে, কোনক্রমেই দিনে কুড়িটার বেশি কাশি নয়। যখন তখন হাসা যাবে না বা হাসলেও যেন দাঁত দেখা না যায়! বাড়িঅলার সুশ্রী সোমত্ত মেয়ে আছে তাই সিঁড়িতে বসা যাবে না। বা বসলেও লুঙ্গিপরে নয়। (তবে কি উদোম দেহে!)

সবচে ভয়ঙ্কর কথা- আপনাকে সবাই সন্দেহ করবে। যেন কারো না কারো পাছায় বাঁশ (আনকিন) প্রবিষ্ট করার জন্যই বাসাভাড়া নিয়েছেন আপনি। বাসার পাশের মুদি আপনাকে বাকিতে দু’টাকার নুনও দেবে না। কারণ আপনি কখন ভাগবেন ভগবানও জানে না। সব সময় একটা চোরচোর ভাব নিয়ে থাকতে হবে। হাসলে দোষ, কাশলে মহা দোষ, আর ভুল করে যদি কোন বান্ধবীকে নিয়ে ডেরায় ঢোকার চেষ্টা করেন তো পত্রপাঠ বিদায়। যেন ব্যাচেলরের নয়, বান্ধবী কেবল বিবাহিত পুরুষদেরই থাকতে হবে। এরেই বলে তেলা মাথায় তেল। টু ক্যারি কোল টু নিউক্যাসল। শালা দুনিয়াটাই স্বার্থপরের স্বর্গরাজ্য। অভাগা ব্যাচেলরের কথা কেউ ভাবে না।
মিহিরের কাছেই গল্পটা শোনা। টেররিজমের আমলে এক বন্ধু বুদ্ধি দিল, চল একটা বিয়ে করি।

বিয়ে করবি মানে? আর ইউ ম্যাড! পাগলে ছাড়া বিয়ে করে! ছাগল বিনে কেউ কাঁঠালপাতা খায়! মিহির যেন আকাশ থেকে পড়লো।
আহা রে, ফুল বিয়ে নয়, পার্টটাইম।

সে আবার কী? মিহিরের চোখ যেন কাঁঠালের কোয়া। সে সর্ষেফুল দেখছে।

পার্টটাইম জব যখন আছে পার্টটাইম বিয়েও হবে। মানে ভাড়াটে বউ। সমঝদার বন্ধু বুঝিয়ে বলল। জাস্ট বাসা ভাড়া নেবার জন্যই স্বল্পকালের জন্য বউ ভাড়া নিতে হবে। ইন রোম, ডু অ্যাজ দ্য রোমানস ডু। ভেবে দেখো বন্ধু, ¯্রােতের বিপরীতে সাঁতরে ডুববে, নাকি একটু কৌশলী হবে! চয়েস ইজ ইওরস। পরে অবশ্য বাসাটা ওরা পেয়েছিল। কারণ কাকদর্শন মেয়ের কন্যাদায়গ্রস্ত বাড়িঅলা বাপও তো আছে, নাকি!

চলুন এবার নচিকেতার গানে যাই। পুরুষ দুরকম- জীবিত ও বিবাহিত। তার মানে বিয়ে হলে মেয়ের কুমারিত্ব হরণ হয়, আর পুরুষের যায় প্রাণ। বেঁচেবর্তে থাকলে তবেই না কৌমার্য। তাই বুঝমান মানুষ সহসা বিয়ের ধারেকাছে ঘেঁষে না। গলিগমনে রতিকাজ সেরে নেয়। কিন্তু অবস্থা এখন এমনই বেগতিক- ব্যাচেলর হলেই টেররিজমের দায়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। সেখানে মৃত্যুভয়! এবার আপনিই ঠিক করুন, বিয়ে করে মরবেন, নাকি না-করেই! বউ পেলে শালি ফ্রি। ভুলে যাবেন না, শ^শুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি, দুদিন পরে লাঠির বাড়ি। ব্যাচেলর জীবন নিয়ে বেঁচেই বা কী লাভ। মাথাগোঁজার ঠাঁই তো পাবেন না। হাটুরে কুকুরের মতোন পেঁকো রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে মরবেন।

এ যেন উভয়সঙ্কট। জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ! বানের পানি, পোড়ায় আগ। আগ মানে আগুন। আগুন-জল দুদিকেই যদি মারি তো ব্যাচেলর ভাইয়েরা যাবেন কোথায়! তাই বাড়িঅলাদের বলি, ব্যাচেলদের দূর দূর করে তাড়ানের আগে একটিবার ভাবুন, ওরাও মানুষ। আপনারও মেয়ে আছে-প্রণয়কাতর। মন দিয়ে শুনুন-

কুঁজোরও সাধ হয় চিৎ হয়ে শুতে
ল্যাংড়ার মন কয় হিমালয় ডিঙাতে
দিন না একটা রুম, আয়েশ করে শুক
আপনার মেয়েকে নিয়ে বুকটা বাঁধুক।
বিয়ে করে বাউন্ডুলে হোক সংসারী
ব্যাচেলর বলে, দেখ আমরাও পারি।

জীবনের গল্প যেখানে যেমন……

খুব সন্তপর্নে নোলকটা খুলে ফেলল পাখি। চোখের নদীটার বাঁধ ভেঙ্গে উপচে পড়ছে।বুকের মাঝে একটা অবর্ণনীয় কষ্ট, কষ্টটা বাসা বেঁধেছিল অনেকদিন হয় , আজ সেই বাসায় ঝড় উঠেছে। মানুষটা নাকি আর আসবেনা। এভাবেই চলে যায়

মাত্র পাঁচ মাস আগেই তো বাবায় উনার হাতে তুলে দিল, কি সুন্দর করে বলছিলেন উনি আমি আপনার মেয়েরে দেখে রাখব , এটাকেই কি দেখে রাখা বলে? আচ্ছা উনি কি জানেন আমার ভিতরে এখন উনার একটা অংশ?কেমনে জানবেন, উনাকে ত বলার সময় টাও দেননি।আহারে , মানুষটা কি দুর্ভাগা জেনেও যেতে পারলেননা।আচ্ছা আসলে কে দুর্ভাগা মানুষটা নাকি সে নিজে?

তিনমাস হয় মানুষটা নাই হয়ে গেছে , কেউ কোনও খোঁজ ও দিতে পারলনা। আর কত দিন এরকম একা থাকতে হবে? উনি নাকি সত্যি আর আসবেননা, বিধবাদের নাকি নাক খালি রাখতে হয় , এত তাড়াতাড়ি পাখি কখনই চায়নি মেনে নিতে কিন্তু আজ সবাই বলে গেল সে নাকি উনার অমঙ্গল ডেকে আনছে। এরপর আর তার সাহস হয়নাই নোলক পরে থাকার।

এরপরে আর অনেকগুলো মাস গেলো।নাহ উনি ফিরে এলেননা । আসলে যারা একবার যারা যায়, তারা আর ফিরে আসেনা। কিন্তু উনার কি অইদিন যাওয়ার আসলেই খুব দরকার ছিল? টাকা পয়সার টানাটানি সারা জীবন ই থাকবে তাই বলে কি খুব দরকার ছিল এভাবে চলে যাওয়ার? সর্বনাশা পদ্মা তো সব ই নিয়ে গেল। প্রথমে ভাই , তারপরে বাবা এবং শেষ পর্যন্ত উনাকেও।

ঐদিন রাতে বাজার থেকে ঘরে আসলেন, জেব থেকে লাল চুড়ি গুলা বের করে পাখির হাতে দিয়ে হাস্লেন, আহারে মানুষটা কি  সুন্দর করেইনা হাসতেন , তারপর বউ আসি বলে বের হয়ে গেলেন। একবার পিছু ডেকেছিল পাখি, উনি হেসে বললেন  কাম কিন্তু একজোড়া আনতে পারলে অনেকদিন আর কষ্ট করা লাগেনা ।মানুষটার কাজ কাম বেশি পছন্দ ছিলনা। এইনিয়ে কত ঝগড়া করেছে সে। উনি একবার ফিরে আসুক পাখি আর কোন দিন ঝগড়া করবেনা, কোন দিন না। কিন্তু তিনি কি আর………..

সারাদিনের কাজের পর যে রাত গুলোতেও উনি বের হতেন , অজানা একটা ভয়ে পাখির বুকটা দুরুদুরু কাঁপতো, শঙ্কাটা যদিও অমুলক ছিলনা, রাখালি কাজে যেয়ে বলা ভাল ওপাড় থেকে গরু আনতে যেয়ে আর ফিরে আসেনি এদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। যারা যায় তারা হারায়, যারা থাকে বেঁচে থাকে এক টা মিথ্যা আশা নিয়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস আপনাআপনি বের হয়ে আসে পাখির বুক চিড়ে।

বছর দুএক পর……………..

পাখির ছেলেটা আধ একটু বোলে কথা শিখেছে। যে ছেলে আজ পর্যন্ত  বাপকে দেখেই নাই সে সবার আগে বলল কিনা, বাব্বাবাব্বাবাব্বা!!!!! পাখির খুব বিরক্ত লাগে, পরনে একটা সাদা কাপড় জড়িয়ে ছেলের গালে দুটা কষে চড় লাগানোর ইচ্ছা তাকে দাঁতে দাঁত চেপে থামায় ও।

প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ঘরে ঢুকল ও। ঘরে ঢুকেই চমকে উঠলো।ঘরে কে ?!! ছায়াটা একটু  পর পর নড়েচড়ে উঠছে। আস্তে করে দা তা হাতে নিল ও, কয়েকদিন ধরেই হারামজাদা খুব জ্বালাচ্ছে ।আজ এক্তা দফারফা হওয়া দরকার। ছায়াটা মোড় ঘুরলো ,দা হাতে দাঁড়িয়ে আছে পাখি, কাছে আসলেই এক কোপে আজ…..

ছায়াটা কাছে আসছে, কিন্তু এ কি…  এতো….এতো উনি…উনি এতদিন পর, কোথথেকে???

এতদিন উনি কোথায় ছিলেন? না আজ কোন প্রশ্ন পাখি করবেনা, আজ পাখি শুধু উনাকে দেখবে , উনার হাসি কত দিন পাখি দেখেনা… কতদিন… ঐ যে উনি হাসছেন,পাখি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখে।

জীবনের গল্পঃ নীলা

নীলা নামে ১৭ বা ১৮ বছরের একটা সুন্দরী মেয়ে আমাদের অফিসে জয়েন করেছে আজ থেকে প্রায় সাত বা আট মাস আগে। ওর কাজ হচ্ছে অফিস পরিষ্কার করা, ব্যাংকে যাওয়া ও বাইরের কাজগুলো করা। খুব সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে আসে। মিয়ানমারের মেয়ে। প্রথম যেদিন দেখলাম ওর সঙ্গে একটু কথা বললাম। বাড়িতে কে কে আছে, কত দিন হলো ব্যাংককে এসেছে, কোথায় থাকে ইত্যাদি। খুব ভালো লাগল।
প্রতিদিন সকালে যখন দেখা হয় জিজ্ঞাসা করি, কিছু খেয়েছ সকালে? কোনো দিন উত্তর দেয় খেয়েছি, কোনো দিন না, পরে খাব।
একদিন কথায় কথায় বলল দেশে ওর বাবা-মা আছে তাদের জন্য টাকা পাঠায়। ফোনে খোঁজখবর নেয়।
আমি সাধারণত ওকে বাইরের কাজে পাঠালে কিছু টাকা দিই যাতে এক গ্লাস ওভালটিন বা আইসক্রিম কিনে খেতে পারে। ও নেয়। কোনো কোনো দিন নিতে চায় না। তারপরও জোর করে দিই।
কয়েক দিন আগের ঘটনা। আমাদের অফিসের দুটি কম্পিউটার আছে কম্পিউটার শপে, সঙ্গে প্রিন্টার। আমাকে গিয়ে সব ঠিক আছে কি না চেক করে আনতে হবে। নীলাকে সঙ্গে নিলাম। যেতে যেতে কথা বলছি ওর সঙ্গে। বললাম তোমার বাবা-মায়ের জন্য খারাপ লাগে না। এই বিদেশে একা একা থাক?
হঠাৎ​ করে ও বলল, আমার তো আসল মা নেই, বাবা আছে। বাবা আবার বিয়ে করেছে। সেই ঘরে আমার তিন ভাইবোন আছে। আমি আমার দাদির কাছে বড় হয়েছি। আমি যে বাড়ি টাকা পাঠাই তা আমার দাদির জন্য। আমার দাদি আমার বাবার সঙ্গেই থাকে। আমি ফোন করি আমার দাদির কাছে।
জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার মা কোথায়? তোমার আসল মা নেই আর আমি এত দিনেও জানি না, তুমি তো আমাকে আগে বলনি!
আমার যখন ৯ মাস বয়স তখন আমার মা আমাকে রেখে থাইল্যান্ড আসে কাজের জন্য। এখানে আসার দুই বছর পর এক পাকিস্তানিকে বিয়ে করে। তারপর তার সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যায়। সেখানে নাকি তার দুই ছেলে আছে। আমি বড় হয়ে এই সব গল্প শুনেছি। কারণ আমার নানি বাড়ি দাদি বাড়ি থেকে বেশি দূরে না। পাশাপাশি গ্রাম।
আমি বললাম তুমি বড় হয়ে কোনো দিন তোমার মাকে খোঁজ করনি। ও বলল, কয়েক দিন আগেই একজন ওকে ছবি দেখিয়েছে, ওর মা ফেসবুকে আছে, কিন্তু ও দেখতে চায় না। আমি বললাম, কেন, মাকে দেখতে ইচ্ছা করে না?

নীলা দেখলাম মুখ করুণ করে বলছে, দেখতে ইচ্ছা করে। কিন্তু যে মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, কোনো দিন আমার খোঁজ নেয়নি, আমার দাদি আমাকে বড় করেছে, আমি যদি আমার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমার দাদি খুব কস্ট পাবেন। তাই আমি আমার মা ফেসবুকে আছে জেনেও আমি তার খবর নিই না। আমার নানিও ব্যাংককে আছে। অন্যদের কাছ থেকে আমার খবর নেয়। কিন্তু আমার কাছে আসার সাহস পায় না।
আমি বললাম তুমি কেন তোমার মাকে নিয়ে নেগেটিভ চিন্তা করছ? একটু ভাব আজ থেকে ১৭ বছর আগে যখন তোমার মা এই দেশে এসেছিল, তখন এত সহজ ছিল না কাজ পাওয়া বা সেটেল হওয়া। হয়তো তোমার মায়ের জীবনে যা কিছু ঘটেছে তার ওপরে তার কোনো হাত ছিল না। এই পরবাসে হয়তো তার কোনো উপায় ছিল না। তাই হয়তো ওই পাকিস্তানি লোকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল আর তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল। তাই বলে কি মনে হয় সে তোমাকে ভুলে গেছে? হয়তো তোমাকে ভোলেনি। মনে করে প্রতিদিন, কিন্তু কাউকে বলতে পারে না। হয়তো চুপি চুপি তোমার খবর নেয়, তুমি হয়তো জান না। মায়ের ওপর রাগ করে থেকো না। তোমার সঙ্গে তোমার মায়ের দেখা একদিন না একদিন হবে। আমি সেই দোয়া করি।
নীলা অভিমান ভরা কণ্ঠে বলল আমি চাই না আমার সঙ্গে আমার মায়ের দেখা হোক। আমাকে কেন ছেড়ে গিয়েছিল আর কোনো দিন কেন আমার খোঁজ নেয়নি।
মনে মনে ভাবতে লাগলাম মানুষের জীবন কত বিচিত্র। কত শত ঘটনা আছে এ রকম মানুষের জীবনে। আমি জানি কোনো একদিন হয়তো ওর মায়ের সঙ্গে ওর দেখা হবে, কথা হবে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরবে। তারপর হয়তো এই রাগ আর থাকবে না। কিন্তু কবে সেই দিন? সেই দিন কি আসলেই আসবে নীলার জীবনে? আমি মনে মনে চাই নীলার জীবনে সেই দিন আসুক। ও ওর মায়ের বুকে মাথা রেখে পরান ভরে কাঁদুক, সব অভিমান ভুলে যাক।। এই পৃথিবীটা শুধুই হয়ে উঠুক মা আর মেয়ের।

জীবনের গল্পঃ একটা কৌতুক দিয়ে শুরু করি।

একটা কৌতুক দিয়ে শুরু করি। ৯৫ বছর বয়সের এক বৃদ্ধ ছিলেন, তার স্ত্রীও বেচে ছিলেন, বৃদ্ধ সবসময় তার স্ত্রীকে জান, সোনাপাখি, ময়নাপাখি, ডার্লিং এসব নাম ধরে ডাকতো। এজন্য তারা সেই এলাকায় বেশ পরিচিতও ছিলেন, পেয়েছিলেন বেস্ট কাপল পুরস্কারও।
একদিন কিছু সাংবাদিক এলো সেই বৃদ্ধের বাসায়, সাক্ষাতকার নিবেন তারা। তারা বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত বছর পরেও আপনাদের মধ্যে এত্ত ভালবাসা দেখে আমরা যারপরনাই বিস্মিত। আপনি এখনো আপনার স্ত্রীকে জান, ডার্লিং, বেবি বলে ডাকেন। এর কারন কী?’
বৃদ্ধ জবাব দিলেন, “ইয়ে মানে! সত্যি বলতে আমি গত কয়েকবছর যাবৎ আমার স্ত্রীর নাম মনে করতে পারছিনা তার এসব নাম ধরে ডেকে চালিয়ে নিচ্ছি কোনমতে।”


.
যদি বলেন এই কৌতুকের কারন কী?
বলছি বস! তার আগে কিছু কথা বলে নেই। ইংরেজরা ২০০ বছর আমাদের দেশটা শাসন করেছে, প্রায় লন্ডভন্ড করে দিয়েছে সবকিছু। তাদের ২০০ বছরের শাসনের সাইড ইফেক্ট আমরা আগামী ২০০০ হাজার বছরেও কাটাতে পারবো কিনা জানিনা।
তবে আমাদের কিছু ইতিহাস আছে, গর্ব করার মত ইতিহাস। ইংরেজের মত একটা শক্তিশালী অপশক্তিকে আমরা আমাদের উপমহাদেশ থেকে বিতারিত করেছি, এটা গর্ব করার ইতিহাস। ১৯৭১ এ পাকিস্তানের বর্বর নির্যাতন থেকে নিজেদের মুক্তি করেছি এটা গর্ব করার মত ইতিহাস। ১৯৫২ তে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি এটা গর্ব করার মত ইতিহাস।
এই সময়গুলোকে আমরা নিজেদের বাচানোর স্বার্থে, নিজের অতিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে জ্বলে উঠেছিলাম, প্রচন্ড শক্তিশালী অপশক্তিগুলোকে আমরা পরাজিত করেছিলাম। তখন জ্বলে উঠার স্পৃহা ছিল, মনোবল ছিল, ভাল কিছু উদ্ধারের স্বার্থে জীবন দেওয়ার মত মেন্টালিটি ছিল, আত্মসম্মানবোধ ছিল, আভিজাত্য ছিল।

এখন কী আছে আমাদের? আপনাদের কি মনে হয়না আমরা দিনদিন নিজেদের একটা জোকার জাতি হিসেবে বারবার উপস্থাপন করছি? খারাপ কাজগুলোকে আমরা বেশি বেশি চর্চা করছি, বিশ্বের দরবারে আমাদের ভালকাজগুলোর কোন চিহ্নই থাকছেনা, অথচ খারাপ কিংবা সম্মানহানীকর কাজগুলো সিএনএন, রয়টার্স কিংবা ফক্স নিউজে প্রচার করা হচ্ছে। এসব দেখে আবার আমরা বুক ফুলিয়ে হাটছি।
৯৫ বছরের বৃদ্ধ যেমন তার স্ত্রীর নাম ভুলে গিয়েছে তেমনি আমরা ভুলে গেছি আমাদের আভিজাত্য, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সম্মান।
আজ আমাদের দেশের হিরো আলমকে বিশ্বে কয়েকটি দেশের মানুষ চিনে, তারা মজা নেয়, আমাদের ছোট করে। ইন্ডিয়াতে হিরো আলমকে নিয়ে ইউটিউবাররা ফানি ভিডিও বানায়, ট্রল করে। আমরা চুপচাপ দেখি, হিরো আলমকে সত্যিকার হিরো আখ্যা দেই।
বড় ছেলে টেলিফিল্মটা দেশের অন্যতম ভাল আর হৃদয় ছুয়ে যাওয়া টেলিফিল্মগুলোর মধ্যে রেয়ারেস্ট একটা। কিছুদিন আগে দেখেছিলাম বিকাল বেলার পাখি নামে আরেকটা টেলিফিল্ম। সেটাও অসাধারন ছিল। আমরা জাতী হিসেবে কখনোই ভাল কাজের মুল্যায়ন দিতে জানিনা, আমরা ট্রল করা শুরু করলাম। ইনফ্যাক্ট আমরা সবকিছুতেই ট্রল মিলিয়ে ফেলি।
.
ভাল কাজের ভাল ফলাফল আমরা তখনই পাব যখন আমরা সেটার সঠিক মুল্যায়ন দিবো। আমরা জাফর ইকবাল স্যারের মত একজন মানুষকে শুধু মাত্র নাস্তিক আখ্যা দিয়ে চরম অপমান করি, উনাকে নিয়ে ট্রল বানাই।
আমরা পদ্মা সেতু নিয়ে রাজনীতি করি, আমরা শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করি, আমরা রাজনের মত ছোট একটা বাচ্চাকে খাবার চুরি করে খাওয়ার দায়ে পিটিয়ে মেরে ফেলি, আমরা সাড়ে চার হাজার কোটি টাকাকে কিছুই না বলে উড়িয়ে দেই, আমরা ডেস্টিনির মত প্রতিষ্ঠান কয়েকহাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নিয়ে চলে গেলেও চুপ থাকি, আবার আমরা বাসে কন্ট্রাক্টর ভাড়া দুইটাকা বেশি রেখেছে বলে রাস্তায় নামিয়ে পিটুনি দিই। আমরা হুজুগে বাঙ্গালী হয়ে থাকতে বেশি পছন্দ করি। আবার আমরাই দিন শেষে সরকারের কাছে আমেরিকার মত বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি। ছিঃ ।
লজ্জা নেই আমাদের।

তুমি আর আমি কখনোই আমরা হতে পারি নি।

তুমি সব সময় তুমি রয়ে গিয়েছ, তুমি তুমিই থাকতে পছন্দ করেছ, আর আমাকে আমিই থাকতে বাধ্য করেছ।না,তাতে খুব একটা অসুবিধা আমার হয় নি।কারন,আমি সব সময় তোমাকে আমি মনে করেছি। বোঝ নি!?
বলছি-

প্রথম যেদিন হাত ধরেছিলে,প্রথম যেদিন বলেছিলে ভালোবাসি,প্রথম যখন বলেছিলে কালোতে তোমাকে বেশ লাগে, প্রথম যেদিন শিউলির মালা এনে বলেছিলে ফুলের মত স্নিগ্ধ আমি,প্রথম যেদিন খোঁপা খুলে বলেছিলে খোলা চুল তোমার পছন্দ,যেদিন আমার ব্যথায় ব্যথা পেয়ে বলেছিলে কষ্ট হচ্ছে,যেদিন প্রথম স্পর্শে আমাকে উষ্ণ করেছিলে!!হ্যাঁ! সেদিন থেকেই তুমি আমাতে মিশে মিলেমিশে একাকার হয়ে আর একটা আমিতে তৈরী হয়েছ। তুমি আমাকে তোমাতে নাই মিশিয়ে নিতে পারো,কিন্তু আমি পেরেছি।আমি পেরেছি বলেই, কষ্টগুলো একান্তই আমার।কষ্টের আর এক নাম হয়েছে! কি? জানো!? কষ্টের আর এক নাম হল ‘আমি’…আর আমার সকল কষ্টের অবশান এর নাম ‘তুমি’..!!

বুকে আয় ভাই, কোরবানির ঈদ আত্মত্যাগের ঈদ

চাচ্চুদের সাথে গরুর হাট দেখতে যাওয়া, কোন হাটে কয়টা বড় গরু দেখা গেছে ভালভাবে মনে রাখা খুবই দরকার ছিল । ঈদের ছুটির পর যখন স্কুলে যাবো তখন গল্পের ঝুড়িতে আমার শাসন চলবে। বন্ধুরা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে গরুর গল্প শুনবে। ভাবই আলাদা। যদিও গরুর হাটে যেতে বেশ ভয় পেতাম তবুও বন্ধুদের কাছে নিজেকে বড় বানানোর ইচ্ছা আমাকে একেবারে অস্থির করে রাখত।

স্কুলে গরুর রচনা কিন্তু আমিই সবচেয়ে ভালো লিখতাম। পরীক্ষায় বেশি মার্কস পেলে সবাইকে ভাব নিয়ে বলতাম দেখেছিস বেশি জানি তো, তাই! আমাদের সকলেরই ছোটবেলা অনেক মজার মজার গল্প আছে। আসলে শৈশবে আমাদের আত্মত্যাগের চিন্তা থেকে মজার চিন্তাটাই বেশি থাকতো।

কোরবানির ঈদে নামাজ শেষে বাসায় এসে গরু কোরবানি বা কাটাকাটি নিয়ে সবার মাঝে অনেক উত্তেজনা ছিল। আমি শুধু বসে থাকতাম আর দেখতাম যেন পরে গিয়ে স্কুলে বন্ধুদের গল্প বলতে পারতাম। বন্ধুরা বলতো তুই তো বেশ একটিভ রে দোস্ত। আমি তো তখন মনে মনে গরুকে থ্যাংক ইউ বলতাম।

আব্বার সাথে ঈদগায়ে যাওয়ার জন্য মনটা অস্থির হয়ে থাকতো। নামাজের পর একে অপরের সাথে কোলাকোলি করার মুহূর্তটাতে নিজেকে মনে হতো ইশ কেন যে ছোট হলাম না! আমি আব্বার সাথে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখতাম আর ভাবতাম যদি আমার সাথে কেউ যদি কোলাকোলি করতো!   অনেক সময় বলেই ফেলতাম আঙ্কেল ঈদ মোবারাক, এইবার আমার সাথে কোলাকোলি না করে তো উপায় নাই !

আর একটা সময় ছিল উদ্ভট কাহিনী করতাম । ঈদগায়ে সবাই যখন সেজদায় আমি তখন দাঁড়িয়ে দেখতাম হাজার হাজার মানুষ একসাথে সেজদায় ! যদিও এই কাজ করা মোটেও উচিত না, তবুও  বুঝতে হবে ছোট ছিলাম তো ।

যাক গুরু কোরবানির সময় । কিন্তু অনেক রক্ত একসাথে দেখলে ভয় লাগতো। আর আমার মাথায় বোকার মত একটা ব্যাপার-ই ঘুরপাক করতো যে যেই গুরুটাকে নিয়ে সকালেও মজা করেছি সেইটাকে এখন সবাই মিলে জবাই করে ফেলেছে আবার এটাকে খাবো? যদিও পরে ভাবতাম দেখা-দেখির দরকার নাই সময় মত আরাম করে গোস্ত খেতে পারলেই হল।

কোরবানি মানেই আত্মত্যাগ সেটা আব্বা-আম্মার কাছ থেকে শুনে শুনেই মুখস্ত করা ছিল, কিন্তু তখন তার প্রকৃত ফজিলত তখন জানা ছিল না । এখন আর রক্ত ভয় পাই না অনেক বড় হয়ে গেছি ! জবাই করার সময় গুরুর দমে ধরাও শিখে গেছি । আল্লাহ্‌র জন্য কোরবানি করতে আবার ভয় কিসের ।

শেষ করার আগে একটা রিকোয়েস্ট সবার কাছে । এই ছোট্ট ঢাকা শহরটাকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার । এইবার ঈদে ঢাকার প্রত্যেকটা ওয়ার্ডের জন্য তিনটি করে জায়গা নির্ধারন করা হয়েছে এবং আবর্জনা বহনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে ব্যাগের ব্যাবস্থা করা আছে । বৃষ্টিতে যেন আপনার কোরবানির কোনো ঝামেলা না হয় তাই প্রতিটি নির্ধারিত জায়গার উপরে সামিয়ানা টানানো থাকবে। আমরা সবাই যদি এবার একটু সতর্ক হয়ে নিয়ম মেনে তাহলে চলি তাহলে অন্যান্য বছরের মত অপরিচ্ছন্ন ঢাকা এবার আর দেখা যাবে না।

সবার ঈদ ভাল কাটুক।
হাম্বা মোবারক ! ঈদ মোবারক

ঈদের আগে, আবার তুই প্রেম করে ছ্যাঁকা খেয়েছিস!

অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যাই না। পড়াশোনার যে চাপ তাতে বেড়াতে যাওয়ার সময় কোথায়। পড়াশোনার চাপে বেড়াতে যেতে পারি না, কথাটা বলার সাথে সাথে সজিব বেঁকে বসল। ওর মুখে তাচ্ছিল্যের সুর। ‘কী আমার বিদ্যাসাগর! পড়াশোনার চাপে ঘুরতে যেতে পারেন না। বল ঘুরতে গেলে পকেটের টাকা খসবে তাই ঘুরতে যাস না। তুই যে কতটা কৃপণ গত ঈদে আমি টের পেয়েছি।’ পাশ থেকে শিশির বলে উঠল, ‘ও যে কৃপণ তা কমবেশি জানি, কোনো দিন এক কাপ চা পর্যন্ত খাওয়ায়নি। গত ঈদে কী ঘটেছিল সেটা বল।’ অন্যরাও ওকে সমর্থন দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, বল বল।’ শিশির তখন এমন কিছু কথা বলল, যা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ‘ঈদের দিন বিকেলে দুজন ঘুরতে বেরিয়েছি। শিলাইদহ কুঠিবাড়ি আসার পর ওর ভীষণ পিপাসা লাগল। আমি বললাম, যা ওই দোকান থেকে খেয়ে আয়। আমার তৃষ্ণা পায়নি সুতরাং আমি খেতেও চাই না। ও করল কি দোকান থেকে হাফ লিটারের একটা সেভেনাপ নিয়ে ঢকঢক করে সবটুকু খেয়ে ফেলল। খাওয়ার মাঝে আমার দিকে একটু তাকালও না পর্যন্ত। শেষে টাকা না দিয়ে হাঁটা শুরু করল। দোকানদার টাকা চাইতেই আমাকে দেখিয়ে বলল, টাকাটা ও দেবে। দোকানদার আমার খুব পরিচিত। আমাকে দেখে সে আর জোরাজুরি করল না। ফিরে এসে একগাল হাসি দিয়ে বলে কিনা ধন্যবাদ আমাকে খাওয়ানোর জন্য। আমি কিন্তু ওকে খাওয়াতে চাইনি। নিজে খাওয়ার পর টাকাটা আমাকে দিতে বলতে ওর একটু লজ্জাও করল না। ছিঃ!’ অন্যরাও সবাই বলল, ‘ছিঃ।’

 

একটু আধটু কৃপণ আমি একথা নিজেও স্বীকার করি, কিন্তু সত্যি বলছি ওই দিন আমি এমন কিছুই করিনি। সবাই

 

 যেহেতু ওর পক্ষে তাই ও নিয়ে আমি আর কথা বাড়ালাম না। এবার মহুয়া বলে উঠল, ‘শুধু টাকা খরচ হবে সেজন্যই নয়, ওর তো কোনো বান্ধবী নেই তাই ঘুরতে যেতেও ইচ্ছে করে না।’ ওর কথার সুর ধরে রাজিব বলে উঠল, ‘বান্ধবী থাকবে কী করে? পকেটের টাকাকড়ি না খসালে মেয়েরা ওর পিছে সময় দেবে কেন? ও জানে না আমি চাঁদনীর পিছনে কত টাকা খরচ করি? সেই ক্লাস থ্রিতে পড়া থেকে চাঁদনীকে আমি খাওয়াচ্ছি।’ সবাই এক সুরে বলে উঠল, ‘ঠিক ঠিক।’ আমাকে ওরা কোণঠাসা করে ছাড়ছে। যে করেই হোক তাড়াতাড়ি এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। কিন্তু আমি ওদের হাত থেকে নিস্তার পেলাম না। ওখানে সৌরভও ছিল, যে বেশি কথা বলে। অন্যের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সে বলতে শুরু করল। এবার আমি নির্ঘাত দশ হাত মাটির নিচে চাপা পড়ব। ও বলতে শুরু করল, ‘পকেট থেকে একটা সিকি আধুলিও খসাবে না আবার বান্ধবীর আশা করবে—এ তো ভালো কথা নয়। তোরা সব শোন—একবার কী ঘটল।’ সবাই ওর কথায় উত্সাহ পেয়ে চিত্কার করে বলল, ‘বল বল কী ঘটেছিল? ও কি কাউকে ‘আই লাভ ইউ’ বলে সেই মেয়ের হাতে চড় খেয়েছিল?’ ওরা কি বলছে এসব? আর তো সহ্য করা যায় না। কিছু একটা আমাকে করতেই হবে। এরা বানিয়ে বানিয়ে কী সব যা-তা বলছে। সৌরভ আবার বলা শুরু করল, ‘মেয়ে হলেও একটা কথা ছিল!’ আবার সবাই চিত্কার করে উঠল, ‘বলিস কীরে তবে কি কোনো ছেলেকে প্রেম নিবেদন করেছিল নাকি? হি হি হি! হিজড়াকে?’ বলেই সে কি হাসি সবার। আর আমার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল। সৌরভ থেমে থেমে বলল, ‘কৃপণ বলে ক্যাম্পাসে কোনো মেয়েই ওকে পাত্তা দেয় না। প্রেম করার অনেক চেষ্টা করেও ও ব্যর্থ। একদিনকার ঘটনা, ও এক গোছা ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলাভবনের উত্তর গেটে। মনে মনে ভেবে রেখেছে, যে মেয়েটা প্রথম আসবে তাকেই ও ‘আই লাভ ইউ’ বলবে। এক গণকঠাকুর নাকি ওকে এ কথা বলেছে। যা ভাবা সেই কাজ, গাড়ি থেকে একটা মেয়ে বের হলো আর সাথে সাথে মিষ্টি মিষ্টি হাসি দিয়ে তার হাতে ফুলের তোড়া ধরিয়ে দিয়ে বলল, ওগো ললনা আই লাভ ইউ। মেয়েটা কিছু বলল না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকল। এর মাঝে গাড়ি থেকে সতেরো-আঠার বছরের আরেকটা মেয়ে বেরিয়ে এসে বলল, আম্মু এই লোকটা তোমাকে ফুল দিল কেন? ও যাকে ফুল দিয়েছিল তিনি এই মেয়েটির মা। তিনি বললেন, ছেলেটা আমাকে আই লাভ ইউ বলেছে। উনার ওই মেয়েটা মার্শাল আর্টে ব্ল্যাকবেল্ট। সে সাথে সাথে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে ওকে একটা ফ্লাইংকিক মারল। ও ছিটকে গিয়ে নিচের সিঁড়িতে পড়ে কপাল ফাটিয়ে ফেলল। এখনো ওর কপালে সেই দাগ আছে।’

 

ওর কথা শেষ হতেই সবাই ভিড় করে বলল, ‘দেখি তো কোথায় সেই দাগটা?’ আমি চিত্কার করে বললাম, ‘সৌরভ সব মিথ্যা বলছে। আমি কখনোই এরকম কিছু করিনি।’ বলতে না বলতেই পাশ থেকে ফাহিম কথা বলে উঠল। ফাহিম আমার ভালো বন্ধু। ভাবলাম বাঁচা গেল। ফাহিম নিশ্চয় আমার পক্ষে কথা বলবে! কিন্তু কীসের কী উল্টো ও আরো বেশি আঘাত করল। ও বলল, ‘আচ্ছা সবাই না হয় মিথ্যা বলছে। বিশ্বাস করলাম—তুই খালাম্মার বয়সী ওই মহিলাকে আই লাভ ইউ বলে তার মেয়ের পায়ের ফ্লাইং কিক খাসনি। তাহলে তোর কপালে কাটা দাগ কেন?’ আমি প্রাণপণে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ওরা শুনল না।

 

আমি রাগে ফুলতে ফুলতে বাসায় ফিরলাম। আমার এ অবস্থা দেখে আমার একমাত্র ছোট বোন মাইশা বলল, ‘কীরে ভাইয়া, তোকে এত রাগান্বিত দেখাচ্ছে কেন?’ আমি বললাম, ‘কিছু না।’ মাইশা বলল, ‘ও বুঝেছি আবার তুই প্রেম করে ছ্যাঁকা খেয়েছিস!’

আহ মেহমান, উহ মেহমান

ঈদ মানে যেমন আনন্দ, তেমনি ঈদ মানে মেহমান। আপনি ‘মান’ দেন বা না দেন, মেহমান আসবেই। আপনি বিরক্ত হলেন না হাউমাউ করে কাঁদলেন, মেহমানদের ওইসব দেখার টাইম নেই। তারা আসবে, গলা পর্যন্ত ভরে খানাপিনা করবে, তারপর দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে চলে যাবে। আবার কেউ কেউ এমন আছেন, যারা সহসাই চলে যাওয়ার নাম মুখে নেবেন না। খানাপিনার পর বিছানায় গড়াগড়ি দেবেন, ঘুম দেবেন, ঘুম থেকে উঠে আবার খাবেন, রাতটা থাকবেন, পরদিন চলে যাওয়ার নাম মুখে নিতেও পারেন, অথবা আরো দুয়েকদিন থাকতেও পারেন। সে এক বিরক্তিকর কাণ্ড। প্রতি ঈদেই এই কাণ্ড কাছ থেকে দেখতে হয়, সহ্য করতে হয় আমাকে আপনাকে।

 

গত বছরের ঘটনা। ঈদের পরদিন আমার এক বন্ধু ফোন করে বলল, ‘তুই তো ফান ম্যাগাজিনে লিখিস টিখিস। মেহমান তাড়ানোর ভালো ভালো বুদ্ধি আছে তোর মাথায়। আমাকে একটা বুদ্ধি দে না। আমাকে এখনই আমার বাসার মেহমানগুলো তাড়াতে হবে। তাদের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে গেছি। আমার ছোট ছেলেটা একটু পরপর কেঁদে উঠছে ভয়ে।’ আমি বললাম, ‘বাড়িতে মেহমান এলে তো বাচ্চারা আরো খুশি হয়। তোর বাচ্চা ভয় পাচ্ছে কেন? মেহমানরা তোর বাচ্চার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে নাকি?’ বন্ধু বলল, ‘খারাপ ব্যবহার বলতে যা বোঝায়, সেটা হয়তো করছে না, তবে এটাই ঠিক যে তাদের কারণে বাচ্চাটা ভয় পাচ্ছে। এত খাবার খেলে ভয় পাবে না?’ আমি বললাম, ‘তোর কথার আগামাথা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। মেহমানরা বেশি খাবার খেলে বাচ্চা ভয় পাবে কেন?’ বন্ধু বলল, ‘মেহমানরা সামনে যত খাবার পেয়েছে, সব খেয়েছে। খাওয়ার পর থেকে কী করছে জানিস? গড়ড়ড়ড়ড় গড়ড়ড়ড় শব্দ করে ঢেঁকুর তুলছে। ঢেঁকুর তোলার এই বিকট শব্দ যতবারই বাচ্চাটার কানে আসছে, সে ভয়ে চিত্কার করে উঠছে। একটু আগে তো ভয়ে হাফপ্যান্টই ভিজিয়ে ফেলল।’

 

গত বছরের ঈদের সময়কার আরেকটা ঘটনা। আমার এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাস্তায় দেখা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছেন?’ বড় ভাই আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ডানে বামে তাকালেন চোরের মতো। তার ভাবভঙ্গি দেখেই বুঝলাম, তিনি আশপাশে লোকজন আছে কি না দেখছেন। হয়তো গোপন কোনো কথা বলবেন। বড় ভাই যখন দেখলেন আশপাশ ফাঁকা, তিনি গলার স্বর মিহি করে বললেন, ‘তুই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিস। তোর কি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের কোনো ছোট ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় আছে?’ আমি বললাম, ‘পরিচয় তো আছে অনেকের সঙ্গেই। কিন্তু কেন বলেন তো?’ বড় ভাই বললেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রুমগুলোতে বিপুল পরিমাণে ছারপোকা আছে, এটা সবাই জানে। আমিও জানি। যদি তোর পরিচিত কেউ থেকে থাকে, তাহলে তার রুম থেকে কিছু ছারপোকা আনতাম আরকি।’ আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, ‘ছারপোকা আনতেন মানে? ছারপোকা আনার জিনিস নাকি?’ বড় ভাই বললেন, ‘অবশ্যই আনার জিনিস। আমি ছারপোকাগুলো এনে আমার বাসার গেস্টরুমে ছেড়ে দেবো। একদম মেহমান সেই যে বাসায় এসে আস্তানা গেড়েছে, আর যাওয়ার নাম নেই। ছারপোকার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে যদি বিদায় নেয় আর কি।’

 

একবার ঈদের পরদিন আমার এক চাচার বাসা থেকে একটা দুঃসংবাদ এলো। চাচার নাকি হাড় ভেঙে গেছে। আমি ছুটে গেলাম চাচার বাসায়। গিয়ে দেখি চাচা শুয়ে আছেন বিছানায়। তার হাতে ব্যান্ডেজ। আমি তার বিছানার কোণায় বসে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীভাবে অ্যাক্সিডেন্ট হলো?’ চাচা কিছু বললেন না। চাচি বলতে চাইলে চোখের ইশারায় তাকেও তিনি থামিয়ে দিলেন। আমি বললাম, ‘আমাকে আপনারা বাইরের মানুষ মনে করছেন কেন? আমি তো আপনাদের আপন মানুষই। আমার কাছে ঘটনা খুলে বলতে পারেন নির্দ্বিধায়।’ এবার চাচি বললেন, ‘প্রতিবছরই ঈদে এক পাল মেহমান আসে। এইবারও আসবে, এমন একটা আলামত পাওয়া যাচ্ছিল। তাই তোমার চাচা একটা উপায় বের করল। বাসার দরজায় বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে রাখবে। যাতে

 

 

মেহমান এসে তালা দেখে বোঝে বাসায় কেউ নেই। ব্যস, এই কাজটা করতে গিয়েই তোমার চাচা দুর্ঘটনার শিকার হলো।’ আমি বললাম, ‘দরজায় তালা ঝোলানো তো খুব কঠিন কাজ না। তাহলে দুর্ঘটনার শিকার হবে কেন?’ চাচি বললেন, ‘দরজার বাইরের দিকে তালা ঝুলিয়ে রুমে আসা-যাওয়া করছিল বারান্দার দিক দিয়ে দড়ি ঝুলিয়ে। দড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে হঠাত্ দড়ি ছিঁড়ে চিত্পটাং।’

 

আমার এক প্রতিবেশীকে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হলো। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। প্রতিবেশী বললেন, ‘খুব টেনশনে আছি ভাই। বছর দুয়েক আগে আমার বাসায় একটা বুয়া ছিল না? ওই বুয়াটাকে খুব দরকার। কিন্তু তার নম্বর খুঁজে পাচ্ছি না। কোথায় যে পাই! ঈদ আসছে, রান্নাবান্না করতে হবে, তাকে ছাড়া আমাদের চলবে না।’ আমি বললাম, ‘বুঝতে পেরেছি, বুয়াটা নিশ্চয়ই খুব ভালো রান্না করত!’ প্রতিবেশী বললেন, ‘আপনি কিছুই বুঝতে পারেননি। বুয়াটাকে খোঁজার একটাই কারণ, সে খুবই জঘন্য রান্না করত। আমি নিশ্চিত, এই বুয়ার হাতের রান্না খেতে হবে, এটা জানার পর আমার বাসায় কেউ বেড়াতে আসবে না। আমি রক্ষা পাব মেহমানের উত্পাত থেকে। আহ শান্তি! আগাম শান্তি!

বিয়ের পরে প্রথম ঈদ

বিয়ের পর প্রথম ঈদটা শ্বশুরবাড়িতেই করবে, তবে বিশেষ শর্তে। বউকে ডেকে তার শর্তের কথা বলে দিল বেসিক আলী। স্বামীর শর্ত শুনে বউ বাপের কাছে কল দিল, ‘হ্যালো আব্বা, তোমাগো জামাই ঈদ করার জন্য রাজি হইছে। তয় উনার নাকি দুম্বার গোস্ত খাওয়ার ইচ্ছে হইছে। তুমি যেভাবেই পার বাজার থাইক্যা একটা বড় সাইজের দুম্বা…’ টুট টুট টুট করে কেটে গেল মোবাইল কল। বেসিক আলীর বউ আরো দুইবার কল দিল। কিন্তু মোবাইল বন্ধ দেখাচ্ছে। পাশে বসা বেসিক আলী বলল, ‘কী হইছে? পুরো কথাটা তো বলতে পারনি। আবার কল দাও।’ বউ বলল, ‘দিলাম তো তিনবার। ওইপাশ থাইক্যা একজন মহিলা দুঃখিত হইয়া বলে ‘আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে’ এবং পরে কল দিতে বলতাছে।’ বেসিক আলী বলল, ‘আরে ধুর! দাও তো আবার। অন্তত দুম্বার কথাটা ক্লিয়ার কর।’ বউ বলল, ‘আমি তো সেটাই চাইছিলাম, কিন্তু বারবার কল দিয়ে ভদ্রমহিলাকে বিরক্ত করা কি ঠিক হবে? উনি যদি আবার রাগ করে মোবাইল ব্লক করে দেয়!’

 

বউয়ের সহজ-সরল কথা শুনে একগাল হেসে আপাতত দুম্বার কথা ভুলে গেল বেসিক আলী। এবারের ঈদে বউয়ের ঈদ সেলামি থেকে মোবাইলের ক্যালকুলেটর দিয়ে হিসাব করে গুনে গুনে ৪৯% হারে ভ্যাট সংগ্রহ করে বেসিক আলী বেশ চামে আছে। বলতে গেলে তার ঈদের খুশি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সেই খুশিতে বেসিক আলী বাথরুমে দরজা আটকিয়ে বগল বাজায়। আর বাঁশফাটা গলা দিয়ে গাইতে শুরু করল, ‘আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল…।’ কখনো কখনো অতি খুশিতে মানুষ দুঃখের এক্সপ্রেশন দিয়ে ফেলে। বেসিক আলীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। বেসিক আলী মনে মনে বলে, আগে যা শুনেছিলাম সেটাই তো ঠিক। বিয়া কত্ত মজা! সে কথা আগে জানলে কি আর এত্ত দেরি করি?

 

ওয়াসরুম থেকে আসার পর বউ জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা কও ত হুনি, তোমার কোন সাধটা মিটে নাই? আশাও পূর্ণ হয় নাই?’

 

‘ইয়ে মানে!’

 

‘মানে কী? তুমি আরো সুন্দরী বউ বিয়া করবা তো সেটা আগেভাগেই বলে ফেলতা। ভাবছ আমি কানে তুলা দিয়ে রাখি? কখন কী কর সবই বুঝি।’ একথা বলতে বলতে হু-হু করে কেঁদে দিল বেসিক আলীর বউ।

 

‘তুমি যে কি বলো না! আমি কি অমন ছেলে? আমি বলছিলাম তোমার সাথে বিয়েটা কেন আরো আগে হইল না!’

 

বউ কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, ‘তখন কি আমার বাবা তোমার কাছে বিয়ে দিত?’

 

‘দিত না কেন?’

 

‘বারে, আমি যে তখন ছোট আছিলাম। বাল্যবিবাহের কেলেংকারি ঘইট্যা যাইত নাহ!’

 

‘ও ও আচ্ছা এখন কান্না থামাও। চল ঈদের শপিং কইরা আসি।’

 

‘জি না, আমি শপিং করতে যাইতাম না।’

 

‘কেন?’

 

‘ঈদের বাজারে নাকি জাল টাকার ছড়াছড়ি হয়।’

 

‘হুমম… কিন্তু তাতে কী? ’

 

‘পুলিশে ধইরা থানায় নিয়ে গেলে? বাপের বাড়ি ঈদ করার সাধ খতম হইয়া যাইব।’
‘আরে ধুর! লেনাদেনার সময় নিজে একটু সতর্ক থাকলেই হইব। আর যদি ভুলের কারণে দুজনে জাল টাকার চক্করে পইড়াই যাই তাহলে অবশ্য একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটবে।’

 

বেসিক আলীর বউ বেশ উত্সাহ নিয়া জানতে চাইল, ‘কী ঘটনা, কী ঘটনা?’
মুচকি হেসে বেসিক আলী বলল, ‘বিয়ের পরে প্রথম ঈদটা লাল দালানের শ্বশুরবাড়িতে করা হবে!’