অজুর সময় কথা বললে অজুর ক্ষতি হবে কি তাহলে জেনে নিন?

null
নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পরিবার, সমাজসহ জীবনঘনিষ্ঠ ইসলামবিষয়ক প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান ‘আপনার জিজ্ঞাসা’। জয়নুল আবেদীন আজাদের উপস্থাপনায় বেসরকারি একটি টেলিভিশনের জনপ্রিয় এ অনুষ্ঠানে দ‍র্শকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিশিষ্ট আলেম ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ।

আপনার জিজ্ঞাসার ২০৩৭তম পর্বে অজুর সময় কথা বললে অজুর ক্ষতি হবে কি না, সে সম্পর্কে বাগেরহাটের রামপাল থেকে চিঠিতে জানতে চেয়েছেন সৈয়দ জাহিদুর রহমান। অনুলিখনে ছিলেন জহুরা সুলতানা।

প্রশ্ন : অজু করার সময় পাশের লোকের সঙ্গে কথা বললে অজুর ক্ষতি হবে কি?

উত্তর : অজুর সময় কথা বলা জায়েজ, অজুর কোনো ক্ষতি হবে না। তবে স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর বান্দা যখন একসঙ্গে দুটি কাজ করতে যাবে, তখন কোথাও ভুল হতেই পারে। এ জন্য কেউ কেউ মনে করেন যে, অজু করার সময় কথা না বলাই ভালো।

অজুর সময় কোনো কথা বললে অজু নষ্ট হয়ে যাবে, এই মর্মে হাদিসে কোনো বক্তব্য প্রমাণিত হয়নি। অজুর সময় আপনি কথা বলতে পারেন, কথা বলা জায়েজ রয়েছে

শরীর থেকে রুহ কিভাবে বের হবে-

নবী করিম (সা:) বলেছেন,
“যখন একজন মু’মিন বান্দা মৃত্যু বরণ করার
সময় হয়, তখন ফেরেশতারা জান্নাত থেকে
সুগন্ধি নিয়ে দুনিয়াতে নেমে আসে এবং সেই
মু’মিন বান্দার সামনে বসে।
তারপর মৃত্যুর ফেরেশতা (আজরাঈল) অবতরণ
করে এবং সেই মু’মিন ব্যক্তিকে বলে,”খুশি হও,
আনন্দিত হও ! তোমার সাথে আল্লাহ্ তা’আলার
করা ওয়াদার ব্যাপারে আনন্দিত হও!” তারপর তিনি (আজরাঈল) রূহকে বেরিয়ে আসতে বলেন।
তিনি বলেন “হে প্রশান্ত আত্মা!শান্তির সাথে বেরিয়ে এসো ! তোমাকে আল্লাহ্ সুবহানাহুওয়া তা’আলা যে নি’আমত দিবেন,সে দিকে বেরিয়ে এসো”,

নবী করিম (সা:) বলেন , সেই মু’মিন বান্দার রূহ
তখন এত সহজে বেরিয়ে আসে, ঠিক
যেমনিভাবে পানির জগ উপুড় করলে তা থেকে
পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। দেহ থেকে এই
রূহ যেন অতি সহজে, পিছলে বের হয়ে আসে।
(ইবনে মাজা-৫৩৪)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভালো কাজ
করার তৌফিক দান করুক #আমিন

মানুষ যখন ক্ষুদ্ধ ও রাগান্বিত হয়, তখন সে শয়তানের হাতের খেলার ’বল’ হয়ে যায়।

“শয়তানের গোমরাহ করার
প্রচেষ্টা”
বনী ইসরাঈলের এক বুযুর্গকে শয়তান
গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট করার জন্যে
বারবার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু
পারেননি। একদিন তিনি বিশেষ
কোন প্রয়োজনে কোথাও
যাচ্ছিলেন। শয়তানও তখন তার
সঙ্গী হয়ে পড়ল। পথে রিপুকাম ও
ক্ষোভের অনেক হাতিয়ারই ব্যবহার
করল সে। মাঝে মধ্যে তাকে ভয়
দেখাবারও চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ
হলো বারবারই।
বুযুর্গ একবার পাহাড়ের পাদদেশে
বসেছিলেন। শয়তান তখন পাহাড়ের
উপরে উঠে একটি পাথর ছেড়ে দিল।
বুযর্গ যখন লক্ষ করলেন বিশাল একটি
পাথর তার দিকে গড়িয়ে পড়ছে। তখন
তিনি আল্লাহর যিকিরে মশগুল হয়ে
পড়লেন। পাথর তাকে পাশ কেটে
অন্য দিকে গড়িয়ে পড়ল। শয়তান বাঘ
ও সিংহের আকৃতি ধরে তাকে ভয়
দেখাতে চাইল। তাতেও কাজ
হলোনা। একবার বুযুর্গ নামায
পড়ছিলেন। শয়তান তখন সাপের
আকৃতি ধরে বুযুর্গের মাথা থেকে পা
পর্যন্ত জড়িয়ে ধরল। অতঃপর তার
ফনাটি সিজদার স্থানে বিছিয়ে
দিল। বুযুর্গ এতেও ভীত হলেন না।
এবার শয়তান পূর্ণ নিরাশ হয়ে
সম্পূর্ণ নিজের আকৃতিতে সেই
বুযুর্গের সামনে এলো এবং বলল :
আপনাকে গোমরাহ করার সকল
কৌশলই আমি অবলম্বন করেছি।
কিন্তু তার কোনটিই কাজে আসেনি।
তাই আমি এখন আপনার সাথে বন্ধুত্ব
করতে চাচ্ছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি
এখন থেকে আপনাকে আর ভ্রষ্ট করার
চেষ্টা করবনা। সুতরাং আপনিও
বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিন। বুযুর্গ
বললেন : এটাতো তোর সর্বশেষ
কৌশল। দুর্ভাগা, তোর ভীতি
প্রদর্শনেও আমি ভীত হইনি। তোর
বন্ধুত্বেরও আমার কোন প্রয়োজন
নেই।
শয়তান তখন বলল : আমি কি
আপনাকে একথা বলে দিব, মানুষকে
আমি কিভাবে গোমরাহ করি?
বুযুর্গ বললেন : বল।
শয়তান বলল : তিনটি বিষয়ের
দ্বারা-
১. কার্পণ্য, ২. ক্রোধ ও ৩. নেশা।
শয়তান বলল : মানুষের মধ্যে যখন
কার্পণ্য সৃষ্টি হয়, তখন সঞ্চয়ের
নেশায় পড়ে যায়। খরচ করেনা।
অন্যের হক নষ্ট করে। আর মানুষ যখন
রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তখন সে
আমাদের হাতের খেলনায় পরিণত
হয়। যেমন ছোট বাচ্চাদের হাতে
খেলার বল থাকে ঠিক তেমন। আমরা
তার ইবাদত বন্দেগীর মোটেও
পরোয়া করিনা। সে যদি স্বীয় দু’আর
দ্বারা মৃতকে জীবিতও করে তবুও
আমরা নিরাশ হইনা। আমরা একটি
কথায় তার সকল বন্দেগী মাটিতে
মিশিয়ে দেই। আর মানুষ যখন নেশা
করে মাতাল হয়ে পড়ে, তখন আমরা
ছাগলের মত তার কান ধরে যে কোন
পাপের দিকে নিয়ে যাই এবং খুব
সহজেই নিয়ে যাই।
ফকীহ আবুল লাইস (রঃ). বলেন : এ
ঘটনায় জানা গেল মানুষ যখন ক্ষুদ্ধ ও
রাগান্বিত হয়, তখন সে শয়তানের
হাতের খেলার ’বল’ হয়ে যায়। ছোট
শিশুরা যেমন ’বল’ এদিক-ওদিক ছুড়ে
মারে, শয়তানও তাকে অনুরুপ ইচ্ছামত
এদিক সেদিক নিতে থাকে। তাই
রাগের সময় আমাদের ধৈর্য্য ধারণ
করা চাই, যাতে শয়তানের হাতের
ক্রীড়ানক হতে না হয়।
শিক্ষা : উল্লেখিত
ঘটনা থেকে আমরা একটি শিক্ষা
নিতে পারি যে, আল্লাহওয়ালাদের
সংস্পর্শে এসমস্ত শয়তানের ধোঁকা
থেকে বাঁচতে পারব।
————————–০০০———————–

জেনে নিন গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নোত্তরঃ শুধু ‘আল্লাহু’ ’আল্লাহু’ বলে জিকির করা কি শরীয়ত সম্মত?

আজকাল আমাদের সমাজের অনেক কথিত ‘হাক্কানি পীর’ এবং ‘আল্লামা’ দের কিতাবে দেখা যায় যে, তাঁরা তাঁদের ভক্ত-আশেকানদের কে অসম্পূর্ণ বাক্য “আল্লাহ্‌-আল্লাহ্‌” শব্দ দ্বারা জিকির করতে বলেন! এ-ব্যাপারে সৌদি আরবের বর্তমানে অদ্বিতীয় আলেমে দ্বীন “শাইখ সালিহ আল ফাওযান” যাকে পুরো আরব বিশ্বের তালেবে এলেম তথা ইসলাম চর্চাকারী’রা চেনেন না এমন কোন আরব নেই! তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এইভাবে, ‘আল্লাহ-আল্লাহ” অসম্পূর্ণ বাক্য দ্বারা জিকিরের হুকুম কি! এর জবাবে উনি যা বলেন, তা নিন্মে পেশ করছিঃ

__________(১)___________

প্রশ্নঃ আল্লাহর বিশেষ কোন নাম ধরে কি তাঁর যিকির করা জায়েয আছে। যেমন মানুষ বলে, ‘আল্লাহ আল্লাহ’ অথবা ‘ইয়া গাফূরু, ইয়া গাফূরু’ ইত্যাদি বলে যিকির করা। আমি জানি ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলা বিদআত। কিন্তু ‘হা’ অক্ষরে পেশ দিয়ে ‘আল্লাহু আল্লাহু’ বলার হুকুম কি?

উত্তরঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে। ‘আল্লাহ’ শব্দ দ্বারা যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতে চাইলে এই ইবাদতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হেদায়াত কি ছিল তা আমাদের জানা দরকার। যেমনটি অন্যান্য ইবাদতের নিয়মও জানা দরকার। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাতে যিকির ও দুয়ার ক্ষেত্রে শুধু ‘আল্লাহ’ শব্দ ব্যবহারের কোন প্রমাণ নেই। চাই আল্লাহ শব্দের ‘হা’ অক্ষরে পেশ দিয়ে হোক বা জযম দিয়ে হোক- কোন প্রমাণ নেই। অনুরূপভাবে শুধু আল্লাহর সুন্দর নামগুলো ধরে তাঁকে ডাকারও কোন দলীল নেই। যেমন মানুষ বলে থাকে, ইয়া লাতীফু ইয়া লাতীফু, অথবা ইয়া গারফূরু ইয়া গাফূরু.. ইত্যাদি।

তাছাড়া এ ধরণের যিকিরগুলোকে অর্থবোধক বাক্য বা কথা বলা হয় না। আর এতে উপকারী কোন অর্থও প্রকাশ পায় না। এটা একক শব্দ যাতে কোন উপকার পাওয়া যায় না। কেননা এই নামগুলো উল্লেখ করে ডেকে যদি কোন আবেদন বা প্রার্থনা পেশ না করা হয়, তবে এই ডাকটাই অনর্থক হয়ে যায়।

শাইখ সালেহ ফাওযান বলেন, এটা বিদআত। নামাযের পর বা বিশেষ কোন সময়ে আল্লাহর নাম সমূহ যিকির করা এবং তার অভ্যাস গড়ে তোলা বিদআত। যেমন ইয়া লাতীফু,ইয়া লাতীফু, বা এরকম কোন নাম বিশেষ সংখ্যা ও বিশেষ পদ্ধতিতে যিকির করা। এগুলো ইসলামে সবই নতুন সৃষ্টি তথা বিদআত। উত্তম হেদায়াত হচ্ছে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর হেদায়াত। আর নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে এই দ্বীনের মাঝে নতুন কিছু সৃষ্টি করা। প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে ভ্রষ্টতা।
(আল মুনতাকা মিন ফাতাওয়া ফাওযান ২/৮)

তাই যখন বলবে ‘ইয়া আল্লাহ ইরহামনী’ অর্থাৎ হে আল্লাহ আমাকে দয়া কর। ‘ইয়া গাফূরু ইগফির লী’ অর্থাৎ হে ক্ষমাশীল আমাকে ক্ষমা কর, ‘ইয়া রাজ্জাকু উরযুকনী’ হে রিযিকদাতা আমাকে রিযিকদান কর, তখন তা হবে অর্থবোধক বাক্য এবং সেটা বৈধ যিকির।

অনুবাদক: শেইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী মাদানী

___________(২)_______________

শুধু “আল্লাহ” শব্দের যিকর:

যিকর শব্দের বাংলা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, স্মরণ। আল্লাহর স্মরণে যে সব শব্দ বা বাক্য মুখে উচ্চারণ করে বলতে হয়, সাধারণতঃ শরীয়ার পরিভাষায় তাহাই যিক্ র। অবশ্য আন্তরিক স্মরণকেও যিকির বলা যায়। আল্লাহ বলেনঃ (এবং তোমার প্রতিপালককে অধিক স্মরণ করবে এবং সকালে ও সন্ধায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে।) [আল ইমরান/৪১]

সর্ব্বোত্তম যিক্ রঃ জ্ঞানীগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, সব চেয়ে উত্তম যিকির হচ্ছে, কুরআনুল কারীম। ইমাম নবভী বলেনঃ ‘জেনে রাখো, কুরআনের তিলাওয়াত সর্ব শ্রেষ্ঠ যিকর আর তা হচ্ছে, চিন্তা-ভাবনার সাথে তিলাওয়াত করা। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  হতে প্রমাণিত যিকর সমূহ(দুআই মাসূরাহ)। আর তা অনেক তন্মধ্যে উত্তম হচ্ছে, [সুব্হানাল্লাহ, ওয়াল্ হামদু লিল্লাহ্ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আক্ বার।]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেনঃ আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় বাক্য চারটি, [সুব্হানাল্লাহ, ওয়াল্ হামদু লিল্লাহ্ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আক্ বার। এর মধ্যে যার দ্বারায় শুরু কর না কেন কোন অসুবিধা নেই।[মুসলিম]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  আরো বলেনঃ ‘সব্বোর্ত্তম যিকর হচ্ছে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। [ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং ইবনু হিব্বান ও হাকেম সহীহ বলেছেন।]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ ‘আমি ও আমার পূর্বের নবীগণ সব্বোর্ত্তম যা বলেছি, [তা হল,] ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা-শারীকা লাহু’। [মালেক তাঁর মুআত্তায় বর্ণনা করেন এবং তাববারানীও বর্ণনা করেন। সনদ হাসান]
উপরোক্ত হাদীসগুলির আলোকে একথা প্রমাণিত যে, শুধু আল্লাহ শব্দের মাধ্যমে যিকির করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে প্রমাণিত নয় আর না তাঁর কোন সাহাবা হতে এটা প্রমাণিত।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেনঃ ‘শুধু (আল্লাহর) নাম তা গোপনে হোক কিংবা প্রকাশ্যে তা একটি পূর্ণ কথা নয় আর না একটি পূর্ণ বাক্য। আর না এর সম্পর্ক কুফর বা ঈমানের সাথে আছে, না আদেশ কিংবা নিষেধের সাথে সম্পর্কিত। আর না সালাফ (পূর্বসুরী) থেকে প্রমাণিত আর না নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বৈধ করেছেন। [মাজমুউল ফাতাওয়া/১০/৫৫৬] একারণে উক্ত যিক্ র কে অনেক উলামা বিদআত বলেছেন। দেখুন, সাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ হাফেযাহুল্লাহের ওয়েব সাইট। www.islam-qa.com

সংকলনে: শেইখ আব্দুর রাকীব মাদানী

____________(৩)   _____________

প্রশ্ন: শুধু ’আল্লাহু’ ’আল্লাহু’ বলে জিকির করা কি শরীয়ত সম্মত?

উত্তর: আল হামদুলিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়া সালামু আলা রাসূলিল্লাহ। আম্মা বাদ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে দুয়া ও জিকিরের ব্যাপারে যতগুলো হাদীস পাওয়া যায় সবগুলোই পূর্ণাঙ্গ বাক্য। যেমন, সুবাহান আল্লাহ, আল হামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি। কতবার পড়তে হবে সংখ্যা সহ হাদীসগুলোতে উল্লেখ আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

أفضل ما قلت أنا والنبيون قبلي: لا إله إلا الله وحده لا شريك له له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير.

“আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের বলা শ্রেষ্ঠ জিকির হল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।”

তিনি আরও বলেন:

أفضل الذكر لا إله إلا الله

“শ্রেষ্ট জিকির হল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।”

তিনি আরও বলেন:

أفضل الدعاء الحمد الله

“শ্রেষ্ঠ দুয়া হল, আল হমদুলিল্লাহ।” এভাবে বহু হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে জিকিরের শব্দাবলী শিক্ষা প্রদান করেছেন।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালার একটি মাত্র নাম নিয়ে একক শব্দে, (যেমন, আল্লাহু আল্লাহু… বা আর রাহমানু আর রাহমানু… ইত্যাদি) জিকির করার ব্যাপারে একটি হাদীস পাওয়া যায় না। সাহাবী তাবেঈদের নিকট থেকেও এমন নজির খুঁজে পাওয়া যায় না।

একক শব্দে জিকির করা যদি শরীয়ত সম্মত হত তবে অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য উল্লেখ করতেন। সাহাবীগণও তা পালন করতে পিছুপা হতেন না।
ভ্রান্ত আকীদার পীর-ফকীর ও সূফীগণ এভাবে জিকির করে থাকেন। তাদের কেউ কেউ তো আল্লাহ শব্দ বাদ দিয়ে কেবল হু হু বলে জিকির করে থাকে। এভাবে তারা দীনের মধ্যে বিদআত আবিষ্কার করেছে। আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী।

একটি হাদীস ও তার জবাব:

আল্লাহ আল্লাহ শব্দে জিকির করার ব্যাপারে নিম্নোক্ত হাদীসটি দ্বারা দলীল পেশ করা হয়:

« لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى لاَ يُقَالَ فِى الأَرْضِ اللَّهُ اللَّهُ »

“কিয়ামত ততদিন পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যত দিন না ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ বলা বন্ধ হয়। (সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ: শেষ যমানায় ঈমান চলে যাওয়া।)
এর উত্তরে বলব: উক্ত হাদীসটি অন্য শব্দে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

لا تقوم الساعة حتى لا يقال لا إله إلا الله

“কিয়ামত ততদিন পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যত দিন না লা ‘ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা বন্ধ হয়।”
(দ্র: মাজমাঊয যাওয়ায়েদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়েদ, অধ্যায়: কিতাবুল ফিতান, অনুচ্ছেদ: “কিয়ামত ততদিন পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যত দিন না লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা বন্ধ হয়।)

এ হাদীসেগুলো অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট যে, কিয়ামত এমন এক সময় সংঘটিত হবে যখন পৃথিবীর বুকে এমন একজন মানুষও বিদ্যমান থাকবে না যে ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বা ‘আল্লাহ’ শব্দটি মুখে উচ্চারণ করে। সব মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে শিরক, কুফুরী, নোংরামি, ও নানা পাপাচারে ডুবে যাবে তখন এ সকল নিকৃষ্ট মানুষদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে।

উক্ত হাদীস থেকে ১০০, ২০০, ৫০০, ১০০০ বা এক লক্ষবার… আল্লাহু আল্লাহু জিকির করার বৈধতা আদৌ প্রমাণিত হয় না।
সুতরাং মুসলমানদের কর্তব্য, ইবাদত-বন্দেগী এখলাসের সাথে এমনভাবে করা যেভাবে দ্বীনের নবী শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। তার দেখানো পন্থাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানোন।

কতিপয় কথোপকথন/ প্রশ্নোত্তর:

উক্ত বিষয়ে আমার লেখাটা ফেসবুকে ছাড়ার পর কিছু ভায়ের সাথে কথোপকথন হয়েছে। এগুলোর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিচে তুলে দেয়া হল:

জনৈক প্রশ্নকারী:আল্লাহ তাআলা তাঁর কালামে ইরশাদ করেছেন:

وَلِلّهِ الأَسْمَاء الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا

“নিশ্চয়ই আল্লাহর জন্য সুন্দর নামসমূহ রয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ঐ সমস্ত নামে ডাক।” (সুরা আ’রাফ) সুতরাং, যেখানে আল্লাহ স্বয়ং তাঁর কালামে তাঁকে এ সমস্ত নামে ডাকতে আদেশ দিচ্ছেন, সেখানে এ সমস্ত নামে ডাকা কিংবা বারবার জপা বা উচ্চারণ করা (অর্থাৎ যিকির করা) কে আপনি বিদআত কিভাবে বলেন?

আমার উত্তর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আদেশ করছেন, আমরা যেন তার নামের ওসীলায় তাঁর নিকট দুয়া করি। কোন কিছু চাইতে হলে তার নাম ধরে যেন চাই। তাঁকে যেন তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম ধরে তাকে ডাকি। যেমন, রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ডাকার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন এভাবে:

(১) কোন ব্যক্তির জীবনে যখন বিপদ-আপদ, দু:শ্চিন্তা বা পেরেশানী নেমে আসে তখন সে যেন বলে:

لا إله إلا الله العظيم الحليم ، لا إله إلا الله رب العرش العظيم ، لا إله إلا الله رب السماوات والأرض ورب العرش الكريم رواه الشيخان والترمذي والنسائي

(২) তিনি ফাতিমা রা.কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তুমি সকাল সন্ধায় এ দুয়াটি পাঠ করবে: : يا حي يا قيوم برحمتك أستغيث, হে চিরঞ্চিব, হে সব কিছুর সংরক্ষক, তোমার রহমতের ওসিলায় তোমার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। (তিরমিযী, সহীহ)।

(৩) অনুরূপভাবে সূরা হাশরেরর ২২, ২৩ ও ২৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়াল অনেকগুলো নাম বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত তিনটি আয়াত পাঠ করে আল্লাহর নিকট দুয়া করতে বলেছেন, (দারেমী, মাকাল ইবনে ইয়াসার রা. হতে বর্ণিত)

প্রশ্নকারী: আল্লাহ তাঁকে তাঁর সুন্দর নামে ডাকতে আদেশ দিয়েছেন। তাই আমি আল্লাহকে আল্লাহ, আর রাহমান, আর রাহিম নামে ডাকলাম এবং অনেক্ষণ ধরে ডাকলাম। এতে সমস্যাটা কোথায়? আপনার আলোচনা হতে পারে, নির্দিষ্ট সংখ্যাকে জরুরী মনে করা ঠিক না বেঠিক, আল্লাহ, আল্লাহ না বলে কেবল হু হু যিকির করা ঠিক না বেঠিক। কিন্তু একাধিকবার আল্লাহ আল্লাহ ডাকলেই সেটা বেদআত হবে কেন?

উত্তর: আল্লাহর নাম ধরে ডাকার ব্যাপারে তো আপত্তি করা হয় নি। ইয়া আল্লাহ, ইয়া রাহমান, ইয়া হাইউ, ইয়া কাইয়ুমু, অথবা আল্লাহুম্মা.. এভাবে ডাকলে তো তখন সেটা আর অপূর্ণ বাক্য থাকল না। তবে কথা হল, এভাবে ডাকার পর নিজের চাহিদা তুলে ধরতে হবে। যেমন, ইয়া গাফুর, ইগফির লী অর্থাৎ হে ক্ষমাশীল, আমাকে ক্ষমা করুন। ইয়া রাযযাক, উরযুক নী..হে রিজিক দাতা, আপনি আমাকে রিজিক দিন। ডাকার পর যদি কোন কিছু না চাওয়া হয় তবে এই ডাকার কোন অর্থই থাকল না। আপত্তি হল, শুধু আল্লাহু আল্লাহু আল্লাহু বলে অপুর্ণ বাক্য দ্বারা জিকির করার ব্যাপারে।

প্রশ্নকারী:  রাসুল সাল্লা্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: إن لله تسعة وتسعين اسماً من حفظها دخل الجنة رواه البخاري লক্ষ্য করুন এখানে حفظها বলা হয়েছে। তো হিফয করার জন্য কি এক শব্দ বারবার পড়তে হয় না। বারবার পড়া বেদআত হলে এগুলোকে হিফয করতে কেন বললেন?

আমার উত্তর:  আমাদের আলোচনা একক শব্দে জিকির করা প্রসঙ্গে। আল্লাহর নাম মুখস্ত করার উদ্দেশ্যে বার বার পড়া আর জিকির করা এক কথা নয়।

আরেক জন প্রশ্নকারী: বিলাল রা. কে যখন তার মনীব পাথর চাপা দিয়ে নির্যাতন করছিলো তখন তিনি কেবল ‘আহাদ’ ‘আহাদ’ বলেছিলেন? এ থেকে কি একক শব্দে আল্লাহর জিকির প্রমাণিত হয় না?

আমার উত্তর: খেয়াল করুন, বেলার রা. কে যখন উত্তপ্ত বালির উপর ফেলে বুকের উপর বিরাট পাথর চাপা দিয়ে এক আল্লাহর দাসত্ব পরিহার করার জন্য নির্যাতন করা হচ্ছিল তিনি তখন আল্লাহ আল্লাহ বলে জিকির করেন নি। তিনি আহাদ আহাদ বলেছেন। অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চাচ্ছেন আহাদ মানে একক..আল্লাহ এককভাবে ইবাদতের যোগ্য। অন্য কেউ নয়। কারণ, তিনি জানতেন আরবের মুশরেকরা আল্লাহ অস্বীকার করত না। কিন্তু এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করাকে অস্বীকার করত। তাই তিনি এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তাদেরকে এই একত্তবাদের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। তিনি সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কোন দিন আহাদ আহাদ বা আল্লাহ আল্লাহ বলে জিকির করেছেন মর্মে কি কোন প্রমাণ পাওয়া যায়?

– শেইখ আব্দুল্লাহিল হাদী

ইসলামী দৃষ্টিতে গান বাজনা হালাল না হারাম? আসুন সঠিক হাদিস জেনে নিই।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا(لقمان 6)

আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে। (সূরা লুকমান ৩১: ৬ আয়াত)।

বেশীর ভাগ তাফসীরকারকগণ ‍লাহওয়াল হাদীস বলতে গানকে বুঝিয়েছেন। উবনে মাসউদ রা. বলেন: উহা গান। ইমাম হাসান বছরী র. বলেন: উহা গান ও বাদ্য শানে নাজিল হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা শয়তানকে সম্বোধন করে বলেন:

وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ(الاسراء 64)

তোমার কন্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো প্ররোচিত কর। (সূরা ইসরা ১৭: ৬৪ আয়াত)।

গান বাজনার ক্ষতিকর দিকসমূহ

ইসলাম কোন জিনিসের মধ্যে ক্ষতিকারক কোন কিছু না থাকলে তাকে হারাম করেনি। গান ও বাজনার মধ্যে নানা ধরনের ক্ষতিকর জিনিস রয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া র. এ সম্বন্ধে বলেন:

বাজনা হচ্ছে নফসের মদ স্বরুপ। মদ যেমন মানুষের ক্ষতি করে, বাদ্যও মানুষের সেই রকম ক্ষতি করে। যখন গান বাজনা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখনই তারা শিরকে পতিত হয়। আর তখন তারা ফাহেশা কাজ ও জুলুম করতে উদ্যত হয়। তারা শিরক করতে থাকে এবং যাদের কতল করা নিষেধ তাদেরকেও কতল করতে থাকে। যেনা করতে থাকে। যারা গান বাজনা করে তাদের বেশীর ভাগের মধ্যেই এই তিনটি দোশ দেখা যায়। তাদের বেশীর ভাগই

মুখ দিয়ে শিস দেয় ও হাততালি দেয়।

শিরকের নিদর্শন: তাদের বেশীর ভাগই তাদের শায়খ (পীর) অথবা গায়কদের আল্লাহরই মতই ভালবাসে অথবা আরো অধিক।

ফাহেশার মধ্যে আছে: গান হল যেনার রাস্তা স্বরূপ। এর কারণেই বেশীর ভাগ ফাহেশা কাজ অনুষ্ঠিত হয় গানের মজলিসে। ষেখানে পুরুষ, বালক, বালিকা ও মহিলা চরম স্বধীন ও লজ্জাহীন হয়ে পড়ে। এভাবে গান শ্রবন করতে করতে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনে। তখন তাদের জন্য ফাহেশা কাজ করা সহজ হয়ে দাড়ায়, যা মদ্যপানের সমতুল্য কিংবা আরও অধিক।

কতল বা হত্যা: অনেক সময় গান শ্রবণ করতে করতে উত্তেজিত হয়ে একে অপরকে কতল করে ফেলে। তখন বলে: তার মধ্যে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল যে জন্য হত্যা করা ছাড়া উপায় ছিল না। উহা হতে বিরত থাকা তার ক্ষমতার বাইরে ছিল। আসলে এই সময়ে মজলিসে শয়তান উপস্থিত হয়। আর যাদের উপর শয়তান বেশী শক্তিশালী, তারা অন্যদের কতল করে ফেলে।

গান বাজনা শ্রবণে অন্তরের কোন লাভ হয় না, তাতে কোন উপকারও নেইঅ বরঞ্চ ওতে আছে গোমরাহী এবং ক্ষতি, যা লাভের থেকেও বেশী ক্ষতিকর। উহা রুহের জন্য ঐ রকম ক্ষতিকর যেমন মদ শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ফলে যারা সঙ্গীত শ্রবণ করে, তাদের নেশা মদ্যপায়ীর নেশা থেকেও অনেক বেশী হয়। তারা ওতে যে মজা পায়, তা মদ্যপায়ীর থেকেও অনেক বেশী।

শয়তানও তাদের নিয়ে খেলা করে। তখন এই অবস্থায় তারা আগুনে প্রবেশ করে, কেউ গরম লোহা শরীরের মধ্যে কিংবা জিহবায় প্রবেশ করায় অথবা এ জাতীয় কাজ করে। তারা সালাত আদায়ের সময় অথবা কোরআন তেলাওয়াতের সময় এই রকম অবস্থা প্রাপ্ত হয় না। কারণ এগুলি শরীয়ত সম্মত ইবাদত, ঈমানী কাজ, রাসূলের সা. কাজ, যা শয়তানকে দুরে সরিয়ে দেয়। আর অন্যগুলো ইবাদতের নামে বিদআত। এতে আছে শিরক ও শয়তানী কাজ, দার্শনিকের কাজ, যাতে শয়তানরা সহজেই আকৃষ্ট হয়।

শরীরে লোহা প্রবেশ করানোর হাকীকত

শরীরের মধ্যে লোহার শলাকা, না রাসূল সা., আর না সাহাবীরা প্রবেশ করাতেন। যদি এ কাজ উত্তমই হত তবে অবশ্যই তারা এতে অগ্রগামী হতেন। বরঞ্চ উহা সূফী পীর ও বিদআতীদের কাজ। আমি তাদেরকে মসজিদে একত্রিত হতে দেখেছি, তাদের সাথে তবলা জাতীয় যন্ত্র দফ ছিল। তারা গান করছিল: আমাদের মদের গ্লাস এনে দাও এবং তা আমাদের পান করাও। আল্লাহর ঘরে বসে মদ জাতীয় দ্রব্যের উচ্চারণ করতে তাদের লজ্জাও হয় না। তারপর উচ্চ আওয়াজে দফ বাজাচ্ছিল এবং উচ্চ আওয়াজে গাইরুল্লাহর নিকট বিপদে উদ্ধার চাচ্ছিল। আর বলছিল: হে দাদা! এভাবে শয়তান তাদের ধোকায় নিপতিত করছিল। তারপর আর একজন তার জামা খুলে একটি লোহার শিক হাতে নিয়ে তার পাঁজরের মধ্যে প্রবেশ করাল। তারপর আর একজন উঠে দাড়িয়েঁ কাচেঁর একটি গ্লাস ভেঙ্গে তা দাঁত দিয়ে চুর্ণ বিচুর্ণ করছিল। তখন আমি মনে মনে বললাম, এরা যা বলছে তা যদি সত্যিই সহীহ হয় তবে যেন তারা ঐ ইয়াহুদীদের সাথে সাথে যুদ্ধ করে যারা আমাদের ভূমি জবর দখল করে রেখেছে, আর আমাদের সন্তানদের হত্যা করেছে। এসব কাজ যে সব শয়তানরা সেখানে উপস্থিত হয় তারা তাদের সাহায্য করে। কারণ, ঐ লোকেরা আল্লাহর স্বরণ হতে দূরে রয়েছে। আর যখন তারা তাদের পূর্ব পুরুষদের নিকট বিপদে উদ্ধার চায়, তখন তারা শিরকের মধ্যে লিপ্ত হয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ ﴿36﴾ وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ ﴿37﴾ الزخرف

আর যে পরম করুণাময়ের জিকির থেকে বিমুখ থাকে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি, ফলে সে এক শয়তানের সঙ্গী হয়ে যায়।

আর নিশ্চয়ই তারাই (শয়তান) মানুষদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেয়। অথচ মানুষ মনে করে তারা হিদায়েত প্রাপ্ত। (সূরা জুখরুফ ৩৬ ৩৭ আয়াত)

আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য শয়তানকে নির্দিষ্ট করে দেন, যাতে তারা আরও গোমরাহ হতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

قُلْ مَنْ كَانَ فِي الضَّلَالَةِ فَلْيَمْدُدْ لَهُ الرَّحْمَنُ مَدًّا(مريم75)

বল, যে বিভ্রান্তিতে রয়েছে তাকে পরম করূণাময় প্রচুর অবকাশ দেবেন, (সূরা মারইয়াম ৭৫ আয়াত)

শয়তান যে তাদের সাহায্য করে, এতে আবাক হওয়ার কিছুই নেই। কারণ, সুলাইমান আ: এক জিনের নিকট সাহায্য চেয়েছিলেন, রাণী বিলকিসের সিংহাসন উঠিয়ে আনার জন্য। এ সম্বন্ধে কোরআনে আছে:

قَالَ عِفْريتٌ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آَتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ ﴿النمل : 39﴾

এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বেই আমি তা এনে দিব। আমি নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে । (সূরা নামল ৩৯ আয়াত)।

যারা হিন্দুস্তানে গিয়েছেন, যেমন ভ্রমনবিদ ইবনে বতুতা কিংবা অন্যান্যরা, তারা অগ্নি উপাসকদের লোহার শিক শরীরে প্রবেশ করানো হতেও বেশী ভযংকর ঘটনা দেখেছে, যদিও তারা ছিল কাফের। তাই এই ঘটনা কোন কারামত বা অলৌকিক ঘটনা নয়। বরঞ্চ ইহা ঐ সমস্ত শয়তানদের ঘটনা যারা এভাবে একত্রিত হয় গান বাজনার আশরে। দেখা যায়, বেশীর ভাগ লোক, যারা শরীরে শিক প্রবেশ করায়, তারা নানা ধরনের পাপে লিপ্ত। এমনকি প্রকাশ্যভাবে তারা আল্লাহর সাথে শিরকে লিপ্ত থাকে। কারণ তারা তাদের মৃত পুর্বপুরুষদের নিকট সাহায্য ভিক্ষা করে। তাহলে কিভাবে কারামতের অধিকারী অলী আল্লাহ হতে পারে?

আল্লাহ তায়ালা আউলিয়াদের সম্বন্ধে বলেন:

أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴿يونس : 62﴾

শুনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই, আর তারা পেরেশানও হবে না। (সূরা ইউনুস ৬২ আয়াত)।

অলী হচ্ছেন ঐ মুমিন বান্দা, যিনি সর্বদা এক আল্লাহর নিকট সাহায্য ভিক্ষা করেন। আর মুত্তাকি হচ্ছেন ঐ ব্যক্তি  যিনি আল্লাহর সাথে পাপ ও শিরক করা হতে বিরত থাকেন। এই সমস্ত অলীদের জীবনে হঠাৎ করে কোন কারামত ঘটে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মানুষের দাবী বা লোক দেখএনার জন্য এটা ঘটে না।

বর্তমান জামানায় গান বাজনা

বর্তমান জামানায় বেশীর ভাগ গান হয় বিয়ের মজলিসে অথবা অন্য কোন উৎসবে, রেডিও ও টেলিভিশনে। এগুলোর বেশীর ভাগই ভালবাসা, শাহওয়াত, চুমু দেখা সাক্ষাৎ ইত্যাদির উপরে ভিত্তি করে রচিত। তাতে থাকে মুখের, কপালের এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রতঙ্গের বর্ণনা, যা যুবকদের মনে শাহওয়াত জাগিয়ে তোলে, আর তাদের ফাহেশা কাজ ও যেনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর তাদের চরিত্র নষ্ট করে।

যখন গায়ক গায়িকারা গান বাজনার নামে একত্রিত হয়, তখন ঐ সমস্ত ধন দৌলত ব্যয় হয়, যা সংস্কৃতির নামে জাতীয় তহবিল হতে চুরি করা হয়। তারপর ঐ ধন দৌলত নিয়ে ইউরোপ আমেরিকা যেয়ে বাড়ী গাড়ী ইত্যাদি খরিদ করে। তারা তাদের অশ্লীল গান বাজনা দিয়ে জাতীয় চরিত্র নষ্ট করে দেয়। তাদের অশ্লীল ও নগ্ন ছবি দিয়ে যুবকদের চরিত্র নষ্ট করে। ফলে, আল্লাহকে ছেড়ে তারা তাদেরকে ভালবাসতে থাকে। এমনকি ১৯৬৭ সালে ইয়াহুদীদের সাথে যুদ্ধের সময় রেডিও হতে বলা হচ্ছিল, তোমরা যুদ্ধে অগ্রসর হতে থাক; কারণ তোমাদের সাথে অমুক অমুক গায়িকা আছে। ফলে, তারা পাপিষ্ট ইয়াহুদীদের সাথে চরমভাবে বিপর্যস্ত ও পরাজিত হয়। বরঞ্চ তাদের বলা উচিৎ ছিল: তোমরা সম্মুখে অগ্রসর হতে থাক তোমাদের সাথে আল্লাহ আছেন, তাঁর সাহায্য নিয়ে। এমনকি এক গায়িকা এই ঘোষণা দিয়েছিল যে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পূর্বে তার প্রতি মাসে কায়রোয় যে মাসিক উৎসব হতো, এ বৎসর তা সে তেলআবিবে করবে, যদি তারা জয়যুক্ত হয়। অন্যদিকে ইয়াহুদিরা যুদ্ধের পর বায়তুল মুকাদ্দাসের গোনাহ মোচনের দেয়ালের সামনে দাড়িয়েঁ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছিল, আল্লাহ তাদের সাহায্য করার জন্য। এমনকি দ্বীনি গ্ন বাজনার মধ্যে নানা ধরনের গর্হিত কথা থাকে। যেমন বলা হল, প্রতি নবীরই একটা নির্দিষ্ট অবস্থান আছে, আর হে মুহাম্মাদ! এই সেই আরশ! একে গ্রহণ কর। এই বাক্যের শেষ কথা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে মিথ্যা বানান হয়েছে, যার মূল ঠিক নয়। কারণ রাসূল সা. কক্ষনই আরশ গ্রহণ করবেন না, আর তাঁর রবও এ কথা বলবেন না।

শ্রুতিমধুর কন্ঠস্বরের দ্বারা মেয়েদের ফিৎনা

সাহাবী বারাহ ইবনে সালেকের রা. কন্ঠস্বর ছিল মধুর। কোন কোন সফরে রাসূলের সা. সাথেচলার সময় ধর্মীয় গান গাইতেন। একদা যখন তিনি গান গাচ্ছিলেন, আর মহিলারা নিকটে এসে পড়ল, তখন রাসূল সা. তাকে বললেন:মেয়েদের থেকে সাবধান! ফলে তিনি নিশ্চুপ হয়ে পড়লেন। তার স্বর মেয়েরা শ্রবণ করুক তা রাসূল সা. পছন্দ করেন নি। (হাকেম)।

যদি রাসূল সা. এই ভয় পেয়ে থাকেন যে বাগানে গিয়ে সুর করে কবিতা পড়লে মেয়েদের মধ্যে ফিৎনা হবে, তাহলে বর্তমান জামানায় মহিলারা রেডিও টেলিভিশনে যে ধরণের গান বাজনা করে, তাদের গান বাজনা শুনলে কি বলতেন? এই ধরনের গায়িকারা বেশীর ভাগই নানা ধরনের ফাসেক ও নগ্ন কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে, আর শরীরের নানাবিধ বর্ণনা দিয়ে যে কবিতা পাঠ করে তাতে বিবিধ ধরনের অব্স্থার ও নফসিয়াতের উদ্রেক করে। ফলে অন্তরে এমন রোগের সৃষ্টি হয় যাতোদের উৎসাহিত করে তাদের লজ্জা শরম বির্সজন দিতে ও বেহায়াপনায় লিপ্ত হতে। যদি এই গানের সাথে মাতার করা সুরের মিশ্রন হয়, তবে তো তাদের বুত্থির বিভ্রম ঘটায়। যারা ই গানের নেশায় পড়ে, তাদের তা ঐ রকমই ক্ষতি করে যা মদ পান করার পর হয়ে থাকে।

গান অন্তরে নিফাকী সৃষ্টি করে

ইবনে মাসউদ রা. বলেন: গান অন্তরে মুনাফেকী সৃষ্টি করে, যেমন ভাবে পানি ঘাস সৃষ্টি করে। যিকর অন্তরে ঈমান সৃষ্টি করে, যেমন পানি ফসল উৎপন্ন করে।

ইবনুল কাইয়িম র. বলেন: যে ব্যক্তি সব সময় গান বাজনায় ব্যস্ত থাকে, তার অন্তরে মুনাফেকীও সৃষ্টি হবে, যদিও তার মধ্যে এর অনুভুতি আসবে না। যদি সে মুনাফেকীর হাকিকত বুঝতে পারত, তবে অব্শ্যই অন্তরে তার প্রতিফলন দেখতে পেত। কারণ কোন বান্দার অন্তরে কোন অবস্থাতেই গানের মহব্বত ও কোরআনের মহব্বত একত্রে সন্নিবেশিত হতে পারে না। তাদের একটি অন্যটিকে অবশ্যই দুর করে দিবে। কারণ আমরা দেখতে পাই যে, কোরআন তেলাওয়াত শ্রবণ করা, গান ও কাওয়ালী শ্রবণকারীদের কাছে খুবই শক্ত ঠেকে। আর কারি যে আয়াত তেলাওয়াত করে, তা দ্বারা তারা মো্টেই উপকৃত হয় না। ফলে শরীরে কোন নাড়াচড়া ও অন্তরে কোন উদ্দীপনা আসে না। আর যখনই তারা গান শ্রবণ করে, তখনই তাদের কন্ঠস্বরে ভয়ের এক প্রভাব সৃষ্টি হয়, অন্তরে এক ভাবের সৃষ্টি হয়, রাত্রি জাগরণ করা মধুর হয়। ফলে দেখতে পাই তারা গান বাদ্য শ্রবণ করাকে কোরআনে তেলাওয়াত শ্রবণ অপেক্ষা বেশী প্রধান্য দেয়। বেশীর ভাগ লোকই যারা গান ও বাদ্যের ফিৎনায় লিপ্ত আছে, তারা সালাত আদায়ে খুব অলসতা দেখায়। বিশেষ করে জামাতে সালাত আদায়ের ব্যাপারে।

ইবনে আকীল র. যিনি হাম্বলি মাযহাবের একজন বড় আলেম, তিনি বলেন: যদি কোন গায়িকা (নিজের স্ত্রী ব্যতিত) গান গায় তবে তা শ্রবণ করা হারাম। এ ব্যপারে হাম্বলি মাজহাবে কোন মতবিরোধ নেই।

ইবনে হাযম র. বলেন: মুসলিমদের জন্য কোন অপরিচিতা মহিলার গান শ্রবণ করে আনন্দ লাভ করা হারাম।

গান বাজনা শ্রবণের প্রতিকার

রেডিও টেলিভিশন, ভিডিও কিংবা অন্য কোন স্থানে যে গান হয়, তা শ্রবণ করা হতে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে অশ্লিল গান হতে, যাতে বাদ্যও বাজান হয়।

গান বাজনা থেকে বিপরিত কাজ হল আল্লাহর যিকর করা ও কোরআন তেলাওয়াত করা। বিশেষ করে সূরা বাকারা তেলাওয়াত করা।

রাসূল সা. বলেছেন:

إنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الذِيْ يَقْرَأُ فِيْهِ الْبَقَرَةَ (رواه مسلم)

যে বাড়িতে সূরা বাকারা তেলাওয়াত করা হয় সে বড়ী হতে শয়তান পালায়ন করে (মুসলিম)

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

يا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ ﴿57يونس﴾

হে মানুষ, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাতের কাছে এসেছে উপদেশ এবং অন্তর সমূহে যা থাকে তার শিফা, আর মুমিনদের জন্য হিদায়েত ও রহমত। (সূরা ইউনুস ৫৭ আয়াত)

রাসূলের সা. জীবনী ও শামায়েল (আখলাক)পাঠ করা এবং সাথে সাথে সাহবায়ে কেরামগণের জীবনীও অধ্যায়ন করা।

যে সমস্ত গান শ্রবণ করা জায়েয

ঈদের গান শ্রবণ করা: এ হাদীসটি আয়েশা রা. হতে বর্ণিত:

دَخَلَ رَسُولُ اللهِ صَلي الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَيْهَا وَعِنْدَهَا جَارِيَتَانِ تَضْرِبَانِ بِدَفَّيْنِ (وَفِي رِوَايَةٍ عِنْدِي جَارِيَتَانِ تُغَنِّيَانِ) فَانْتَهَرَهُمَا ابُوْبَكرٍ فَقالَ صَلي الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعْهُنَّ فَانَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيْدًا وَإنَّ عِيْدَنَا هَذا الْيَوْم (رواه البخاري)

একদা রাসূল সা. তাঁর ঘরে প্রবেশ করেন। তখন তার ঘরে দুই বালিকা দফ বাজাচ্ছিল। অন্য রেওয়ায়েতে আছে গান করছিল। আবু বকর রা. তাদের ধমক দেন। তখন রাসূল সা. বললেন: তাদের গাইতে দাও। কারণ প্রত্যেক জাতিরই ঈদের দিন আছে। আর আমাদের ঈদ হল আজকের দিন। (বুখারী)

দফ বাজিয়ে বিয়ে প্রচারের জন্য গান গাওয়া আর তাতে মানুষদের উদ্ধুদ্ধ করা। দলিল: রাসূল সা. বলেছেন:

فَصْلُ ما بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَمِ ضَرْبُ الدَّفِ وَالصَّوْتُ فِي النِّكَاحِ (رواه أحمد)

হারাম ও হলালের মধ্যে পার্থক্য হল দফের বাজনা। এই শব্দে বুঝা যায় যে, সেখানে বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। (আহমাদ)

কাজ করার সময় ইসলামী গান শ্রবণ করা, যাতে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ঐ গানে যদি দুয়া থাকে। এমনকি রাসূল সা. পর্যন্ত ইবনে রাওয়াহা রা. নামক সাহবীর কবিতা আবৃত্তি করতেন। আর সাথীদেরকে খন্দকের যুদ্ধের সময় পরিখা খনন করতে উদ্ধুদ্ধ করতেন এই বলে যে, হে আল্লাহ কোনই জীবন নেই আখেরাতের জীবন ব্যতীত। তাই আনছার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করনি। তখন আনছার ও মুহাজিনগণ উত্তর দিলেন: আমরাই হচ্ছি ঐ ব্যক্তিবর্গ যারা রাসূলের নিকট বাইআত করেছি জিহাদির জন্য যতদিনই আমরা জীবিত থাকিনা কেন।

আর রাসূল সা. সাহাবীদের নিয়ে যখন খন্দক (গর্ত) খনন করছিলেন, তখন ইবনে রাওয়াহা রা. এই কবিতা আবৃত্তি করছিলেন:

আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ না থাকতেন তাহলে আমরা হেদায়েত পেতাম না। আর সিয়ামও পালন করতাম না, আর সালাতও আদায় করতাম না। তাই আমাদের উপর সাকিনা (শান্তি) নাযিল করুন। আর যখন শত্রুদের মুকাবিলা করব তখন আমাদের মজবুত রাখুন। মুশরিকরা আমাদের উপর আক্রমণ করেছে, আর যদি তারা কোন ফিৎনা সৃষ্টি করে, তবে আমরা তা ঠেকাবই। বারে বারে আবাইনা শব্দটি তারা উচ্চ স্বরে উচ্চারণ করছিলেন।

ঐ সমস্ত গান, যাতে আল্লাহর তাওহীদের কথা আছে অথবা রাসূলের সা. মহব্বত ও তার শামায়েল আছে অথবা যাতে জিহাদে উৎসাহিত করা হয় তাতে দৃঢ় থাকতে অথবা চরিত্রকে দৃঢ় করতে উদ্ধুদ্ধ করা হয়। অথবা এমন দাওয়াত দেয়া হয় যাতে মুসলিমদের একে অন্যের প্রতি মহব্বত ও সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। অথবা যাতে ইসলামের মৌলিক নীতি বা সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়। অথবা এই জাতীয় অন্যান্য কথা যা সমাজকে উপকুত করে দ্বীনি আমলের দিকে কিংবা চরিত্র গঠনের জন্য।

ঈদের সময় ও বিয়ের সময় কেবল মাত্র মহিলাদের জন্য তাদের নিজেদের মধ্যে দফ বাজানোর অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। যিকরের সময় এটার ব্যবহার ইসলাম কখনই দেয়নি। রাসূল সা. যিকরের সময় কখনই উহা ব্যবহার করেননি। তাঁর পরে তাঁর সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু  আনহুমগণ কখনই তা করেন নি। বরঞ্চ, ভণ্ড সুফি পীররা তা মুবাহ করেছে নিজেদের জন্য। আর জিকরের দফ বাজানকে তারা সুন্নত বানিয়ে নিয়েছে। বরঞ্চ উহা বিদআত। রাসূল সা. বলেছেন:

ايَّاكُمْ وَمُحْدَثاتِ الْاُمُوْرِ فاِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بدْعَةٍ وكُلُّ بِدْعًةٍ ضَلالَةٍ (رواه  الترمذي)

তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন সংযোজন করা হতে বিরত থেক। কারণ, প্রতিটি নতুন সংযোজনই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী। (তিরমিযী)

লোক দেখানো আমলের ভয়াবহ পরিণতি দেখলে আপনার লোম দাঁড়িয়ে যাবে।

আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির বিচার করা হবে, সে হবে একজন (ধর্মযুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী) শহীদ। তাকে আল্লাহ্‌র নিকট উপস্থিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ্‌ পাক তাকে (দুনিয়াতে প্রদত্ত) নেয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সেও তা স্মরণ করবে। এরপর আল্লাহ্‌ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, দুনিয়াতে তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য (কাফেরদের সাথে) লড়াই করেছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ্‌ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ, বরং তোমাকে যেন বীর-বাহাদুর বলা হয়, সেজন্য তুমি লড়াই করেছ। আর (তোমার অভিপ্রায়  অনুযায়ী)  তোমাকে  দুনিয়াতে তা  বলাও  হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

অতঃপর সে ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত করা হবে, যে নিজে দ্বীনী ইলম শিক্ষা করেছে এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে। আর পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করেছে (এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে)। তাকে আল্লাহ্‌ পাকের দরবারে হাযির করা হবে। অতঃপর তিনি তাকে নেয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সেও তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ্‌ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নেয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি স্বয়ং দ্বীনী ইলম শিক্ষা করেছি এবং অপরকে  শিক্ষা  দিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির নিমিত্তে কুরআন তেলাওয়াত করেছি। তখন আল্লাহ্‌ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং তুমি এজন্য ইলম্ শিক্ষা করেছ, যেন তোমাকে ‘বিদ্বান’বলা হয় এবং এজন্য কুরআন অধ্যয়ন করেছ, যাতে তোমাকে‘ক্বারি’ বলা হয়। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী ) তোমাকে বিদ্বান ও ক্বারীও বলা হয়েছে। অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে। সুতরাং তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

অতঃপর এমন এক ব্যক্তিকে বিচারের জন্য আল্লাহ্‌র দরবারে উপস্থিত করা হবে, যাকে আল্লাহ্ তাআলা বিপুল ধন-সম্পদ দান করে বিত্তবান করেছিলেন। তাকে আল্লাহ্‌  তাআলা প্রথমে প্রদত্ত নেয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সে তখন সমস্ত নেয়ামতের কথা অকপটে স্বীকার করবে। অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নেয়ামতের  শুকরিয়ায় তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, যে সমস্ত ক্ষেত্রে ধন- সম্পদ ব্যয় করলে তুমি সন্তুষ্ট হবে, তোমার সন্তুষ্টির জন্য সেসব খাতের একটি পথেও ব্যয় করতে ছাড়িনি। আল্লাহ্‌  তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়; বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে দান করেছিলে, যাতে তোমাকে বলা হয় যে, সে একজন ‘দানবীর’। সুতরাং (তোমার অভিপ্রায় অনুসারে দুনিয়াতে) তোমাকে ‘দানবীর’বলা হয়েছে। অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে। নির্দেশ মোতাবেক তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে । [মুসলিম হা/১৯০৫  ‘নেতৃত্ব’অধ্যায়,  অনুচেছদ-৪৩;  মিশকাত-আলবানী  হা/২০৫,  ‘ইলম’অধ্যায় ]

শিক্ষা:

লোক দেখানো আমলের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কাজেই সর্বদা আমাদের নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখতে হবে এবং প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহ্‌ পাকের সন্তুষ্টির জন্যই করতে হবে।

হযরত হাতেব ইবনে আবী বালতায়া (রাঃ) ও সারা নান্মী গায়িকার ঘটনা

বদর যুদ্ধের পর মক্কা বিজয়ের পূর্বে মক্কার সারা নান্মী একজন গায়িকা প্রথমে মদীনায় আগমন করে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেন ঃ তুমি কি হিজরত করে মদীনায় এসেছ? সে বললোঃ না। আবার জিজ্ঞাসা করা হল ঃ তবে কি তুমি মুসলমান হয়ে এসেছ? সে এরও নেতিবাচক উত্তর দিল। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন তাহলে কি উদ্দেশ্যে আগমন করেছ? সে বললো ঃ আপনারা মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক ছিলেন। আপনাদের মধ্য থেকে আমি জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন মক্কার বড় বড় সরদাররা বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছে এবং আপনারা এখানে চলে এসেছেন। ফলে আমার জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে গেছে। আমি ঘোর বিপদে পড়ে ও অভাবগ্রস্থ হয়ে আপনাদের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণের উদ্দেশ্যে এখানে আগমন করেছি। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন ঃ তুমি মক্কার পেশাদার গায়িকা। মক্কার সেই যুবকরা কোথায় গেলো, যারা তোমার গানে মুগ্ধ হয়ে টাকা-পয়সার বৃষ্টি বর্ষণ করতো? সে বললো ঃ বদর যুদ্ধের পর তাদের উৎসব পর্ব ও গান-বাজনার জৌলুস খতম হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত কেউ আমাকে আমন্ত্রন জানায়নি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল মুত্তালিব বংশের লোকগণকে তাকে সাহায্য করার জন্যে উৎসাহ দিলেন। তারা তাকে নগদ টাকা-পয়সা, পোশাক-পরিচ্ছেদ ইত্যাদি দিয়ে বিদায় দিল।
এটা তখনকার কথা, যখন মক্কার কাফেররা হোদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে ছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার ইচ্ছায় গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার আন্তরিক আকাঙ্খা ছিল যে, এই গোপন তথ্য পূর্বা‎েহ্ন মক্কাবাসীদের কাছে ফাঁস না হোক। এদিকে সর্ব প্রথম হিজরতকারীদের মধ্যে একজন সাহাবী ছিলেন হাতেব ইবনে আবী বালতায়া (রাঃ)। তিনি ছিলেন ইয়েমেনী বংশোদ্ভূত এবং মক্কায় এসে বসবাস অবলম্বন করেছিলেন। মক্কায় তার স্বগোত্র বলতে কেউ ছিলনা। মক্কায় বসবাস কালেই মুসলমান হয়ে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানগণ তখনও মক্কায় ছিল। রাসূলুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও অনেক সাহাবীগণ হিজরতের পর মক্কায় বসবাসকারী মুসলমানদের উপর কাফেররা নির্যাতন চালাত এবং তাদেরকে উত্যক্ত করতো। যে সব মুহাজিরের আত্বীয়-স্বজন মক্কায় ছিল, তাঁদের সন্তান-সন্ততিরা কোন রূপে নিরাপদে ছিল। হাতেব ইবনে আবী বালতায়াতা চিন্তা করলেন যে, তাঁর সন্তান-সন্ততিকে শত্রুর নির্যাতন থেকে বাঁচিয়ে রাখার কেউ নেই। অতএব মক্কাবাসীদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ প্রদর্শন করলে তারা হয়তো তার সন্তানদের উপর জুলুম করবেনা। তাই গায়িকার মক্কা গমনকে তিনি একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহন করলেন।
হাতেব স্বস্থানে নিশ্চিত বিশ্বাসী ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আল্লাহ্ তায়ালা বিজয় দান করবেন। এই তথ্য ফাঁস করে দিলে তার কিংবা ইসলামের কোন ক্ষতি হবেনা। তিনি ভাবলেন, আমি যদি পত্র লিখে মক্কার কাফেরদেরকে জানিয়ে দেই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার ইচ্ছা রাখেন, তবে আমার ছেলে-মেয়েদের হেফাজত হয়ে যাবে। সুতরাং হাতেব এই ভুলটি করে ফেললেন এবং মক্কাবাসীদের নামে একটি পত্র লিখে গায়িকা সারার হাতে সোপর্দ করলেন।
এদিকে রাসূলুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা ওহীর মাধ্যমে ব্যাপারটি জানিয়ে দিলেন। তিনি আরও জানতে পারলেন যে, মহিলাটি এসময়ে রওযায়ে খাক নামক স্থান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
বোখারী ও মুসলিম গ্রন্থে হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে, আবু মুরসাদকে ও যুবায়ের ইবনে আওয়ামকে আদেশ দিলেন, অশ্বে আরোহণ করে সেই মহিলার পশ্চাদ্ধাবন কর। তোমরা তাকে রওযায়ে খাকে পাবে। তার সাথে মক্কাবাসীদের নামে হাতেব ইবনে বালতায়ার পত্র আছে। তাকে পাকড়াও করে পত্রটি ফিরিয়ে নিয়ে আস। হযরত আলী (রাঃ) বলেন ঃ আমরা নির্দেশমত দ্রুতগতিতে তার পশ্চাদ্ধাবন করলাম। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেস্থানের কথা বলেছিলেন, ঠিক সে স্থানেই আমরা তাকে উটে সওয়ার হয়ে যেতে দেখলাম এবং তাকে পাকড়াও করলাম। আমরা বললাম পত্রটি বের কর। সে বলল ঃ আমার কাছে কারও কোন পত্র নেই। আমরা তার উটকে বসিয়ে দিলাম। এর পর তালাশ করে কোন চিঠি পেলাম না। আমরা মনে মনে বললাম ঃ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সংবাদ ভ্রান্ত হতে পারেনা। নিশ্চয়ই সে পত্রটি কোথাও গোপন করেছে। এবার আমরা তাকে বললাম ঃ হয় পত্র বের কর, না হয় আমরা তোমাকে বিবস্ত্র করে দিব।
অগত্যা সে নিরুপায় হয়ে পায়জামার ভিতর থেকে পত্র বের করে দিল। আমরা পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর কাছে চলে এলাম। হযরত ওমর (রাঃ) ঘটনা শুনা মাত্রই ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর কাছে আরজ করলেন ঃ এই ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও সকল মুসলমানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সে আমাদের গোপন তথ্য কাফেরদের কাছে লিখে পাঠিয়েছে। অতএব, অনুমতি দিন আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেব।
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) হাতেবকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলেন ঃ তোমাকে এই কান্ড করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করলো? হাতেব আরজ করলেন ঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ্ আমার ঈমানে এখনও কোন তফাৎ হয়নি। ব্যাপার এই যে, আমি ভাবলাম, আমি যদি মক্কাবাসীদের প্রতি একটু অনুগ্রহ প্রদর্শন করি তবে তারা আমার বাচ্চাদের কোন ক্ষতি করবে না। আমি ব্যতিত অন্য কোন মুহাজির এরূপ নেই, যার স্বগোত্রের লোক মক্কায় বিদ্যমান নেই। তাদের স্বগোত্রীয়রা তাদের পরিবার-পরিজনের হেফাজত করে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতেবের জবানবন্দি শুনে বললেন ঃ সে সত্য বলেছে। অতএব, তার ব্যাপারে তোমরা ভাল ছাড়া মন্দ বলো না। হজরত ওমর (রাঃ) ঈমানের জোশে নিজ বাক্যের পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন ঃ সে কি বদর যোদ্ধাদের একজন নয়? আল্লাহ তায়ালা বদর যোদ্ধাদের কে ক্ষমা করার ও তাদের জন্যে জান্নাতের ঘোষনা দিয়েছেন। একথা শুনে হযরত ওমর (রাঃ) অশ্রুবিগলিত কন্ঠে আরয করলেন ঃ আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলই আসল সত্য জানেন। -(ইবনে কাছীর)
কোন কোন রেওয়ায়েতে হাতেবের এ উক্তিও বর্ণিত আছে যে ঃ আমি এ কাজ ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্যে করিনি। কেননা, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-ই বিজয়ী হবেন। মক্কাবাসীরা জেনে গেলেও তাতে কোন ক্ষতি হবে না।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা মুমতাতিনার শুরু ভাগের আয়াত সমূহ অবতীর্ণ হয়। এসব আয়াত উপরোক্ত ঘটনার জন্যে হুশিয়ার করা হয়। এবং কাফেরদের সাথে মুসলমানদের বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক রাখা হারাম সাব্যস্ত করা হয়।

সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী এবং বন্যার পানি

এক জোয়ান অব আর্ক। ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের মধ্যকার হান্ড্রেড ইয়ার্স’ ওয়ারের শেষের দিকে এসে ফ্রান্সের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারিনী এক তরুণী। বিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই অস্বাভাবিক যুদ্ধপারদর্শিতা ও নেতৃত্বগুণ দেখিয়ে ফ্রান্সের ন্যাশনাল হিরোইনে পরিণত হন তিনি। তবে এই সম্মান আসে তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পর। খ্রিষ্টান ধর্মে হারাম জাদুবিদ্যার চর্চা করার অভিযোগে ধর্মীয় আদালত তাঁকে পুড়িয়ে হত্যা করার রায় দিলে সেভাবেই তা কার্যকর করা হয়। বিচারে একটি প্রধান ভূমিকা রাখেন বিশপ পিয়েরে কওচন (উচ্চারণ কয়েকরকম আছে)। তিন দশক না যেতেই এই রায়কে বাতিল ঘোষণা করে মৃত জোয়ানকে নির্দোষ ঘোষণা করে ফ্রান্স। জোয়ান এখন শুধু ফ্রান্সের ন্যাশনাল হিরোইনই নন, খ্রিষ্টান ধর্মের স্বীকৃত একজন সেইন্টও বটে। পিয়েরে কওচনই বরং এখন একজন ধীকৃত চরিত্র।

জোয়ানকে নিয়ে অনেক সাহিত্যিকই ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্য লিখেছেন। তাঁদের মাঝে একজন নাট্যাচার্য জর্জ বার্নার্ড শ। জোয়ানকে নিয়ে একজন আইরিশ নাস্তিক নাটক লেখার ঘোষণা দেওয়ার পর ফ্রান্স এবং খ্রিষ্টান বিশ্ব উভয়ই একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায়। কিন্তু নাটকটি প্রকাশিত হলে সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। সব ঠিকঠাকই আছে। শুধু একটা সমস্যা হয়েছে। কওচনকে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য না, বরং চার্চের যথাযথ অধিকারের চর্চা করতে গিয়ে হিসেবে সামান্য গড়বড় করে ফেলেছেন এই আরকি। নাটকের শুরুতে থাকা একটা ভূমিকায় লেখক নিজেই তা স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন। এ-ও বলে দেন যে, যেকোনো কর্তৃপক্ষের অধিকার আছে তার প্রয়োজনমতো আইন প্রণয়ন করার এবং কেউ তা লঙ্ঘন করলে প্রয়োজনে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার।

সাহিত্য সমালোচকদের কাছে বিষয়টা একটা রহস্য হয়ে দাঁড়ায় যে এইক্ষেত্রে লেখক তাঁর পাঠক-দর্শকদেরকে কার পক্ষে থাকতে বলছেন। একজন কম্যুনিস্ট ঠোঁটকাটা নাস্তিক কেন কওচনকে ভালো মানুষ হিসেবে দেখাবে! পরে একটা হিন্ট পাওয়া গেলো তাঁর এমন আচরণের। শ ছিলেন লেনিনের বলশেভিক সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থক। কুলি-মজদুরদের লাল সেলাম দিতে দিতে ক্ষমতায় আসা লেনিন তখন রীতিমতো একনায়কতন্ত্র চালাচ্ছেন। ক্যাথলিক চার্চ যেমন হেরেটিকদেরকে ইনকুইজিশানের মধ্য দিয়ে বিচার করতো (যেভাবে জোয়ানের বিচার হয়েছে), লেনিনও তাঁর দেশে বিরোধী মতের লোকদের ঠিক একই রকম বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিতেন, প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ড দিতেন। কওচনের প্রতি শ-এর সিম্প্যাথি আসলে লেনিনের কাজকর্মের প্রতি তাঁর সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।

দুইরচয়িতা (author), কথক (narrator) আর চরিত্রের (character) মাঝে পার্থক্য বুঝতে না পারলে অনেক ভুলভাল ম্যাসেজ পাওয়া যায়। ইশপের গল্পের মতো সহজসরল কাহিনীতে আমরা সহজেই লেখক (রচয়িতা) এর বক্তব্য বুঝতে পারি। আরেকটু জটিল ফিকশানে নায়কের বক্তব্যই রচয়িতার বক্তব্য। তা না হলেও আমরা অন্তত এটুকু বুঝতে পারি একটা ফিকশানে good guys কারা আর bad guys কারা।

যুদ্ধবিদ্ধ্বস্ত ইউরোপে বিভিন্ন মডার্নিস্ট ধ্যানধারণা চালু হওয়ার পর সাহিত্য জগতেও এসবের প্রভাব পড়ে। জগতের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যহীনতা সংক্রান্ত দর্শন আর বিশ্বযুদ্ধগুলোর চাপে পিষ্ট হয়ে ভালো-খারাপের ধারণাগুলোকে নতুন করে ভাবতে শুরু করা হয়। পৌরাণিক কাহিনী আর সাহিত্যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রোটাগনিস্ট –অ্যান্টাগনিস্ট (সহজ ভাষায় নায়ক-ভিলেইন) এর পার্থক্যটা ঝাপসা হতে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যে। এমন এমন ফিকশান রচিত হয় যেখানে নিশ্চিত করে বলা যায় না কে নায়ক, আর কে ভিলেইন (উত্তরাধুনিক যুগে তো কে নায়ক, আর কে নায়িকা সে পার্থক্য করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে), আর কোনটা আসলে লেখকের নিজের বক্তব্য। বাইবেলের কাহিনীকে একটু সাহিত্যরস দিয়ে শয়তানকে ট্র্যাজিক হিরো বানানোর কাজ এরও অনেক আগে জন মিল্টন করে গেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে এরকম একটা উদাহরণ ব্যাটম্যান-জোকারের জুটি। জোকারকে বলা হয় এমন একজন ভিলেইন যে তার হিরোর চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। কারণ তার মুখ আর হাত দিয়ে পরিচালক অনেক গভীর দার্শনিক কথাবার্তা ও কাজকর্ম তুলে এনেছেন যা ব্যাটম্যান দিয়ে তুলে আনা যায়নি।

কোনো সাহিত্যিক যদি প্রথাবিরোধী কোনো ধারণার প্রবর্তন করতে চান কিন্তু সমাজ-রাষ্ট্র বেশি অত্যাচারী হয়ে থাকে, তাহলে এ ধরনের টেকনিক অবলম্বন করে তাঁরা নিজেদের মতামতগুলো সমাজে পুশ করেন। যদি জেরা করা হয়, তাহলে এমার্জেন্সি এক্সিট তো আছেই “আরে এটা তো আমার বক্তব্য না, অমুক চরিত্রের বক্তব্য।” ইসলামের ব্যাপারে অনেক ভ্রান্ত ধারণা প্রচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ (আজাদ না) এই কাজ খুব দক্ষতার সাথে করেছেন। এর বাইরেও আরো অনেকে থাকতে পারেন আমার অজানা।

ফিকশানের হাত ধরে আসা এই স্ট্র্যাটেজি অনেক নন-ফিকশানেও (প্রবন্ধ, নিউজ ইত্যাদি) অনুসরণ করা হয়। মহা-অত্যাচারী একটা ক্যাপিটালিস্ট সমাজে কেউ হয়তো সোশ্যালিস্ট আন্দোলন শুরু করতে চান, পেশায় হয়তো তিনি সাংবাদিক। এমনি এমনি রিপোর্ট করার ছলে কোনো একটা বিপ্লবী আইডিয়াকে তিনি কথাপ্রসঙ্গে বলতে পারেন। নিজের পক্ষ-বিপক্ষ কিছুই হয়তো বললেন না। কিন্তু সচেতন শ্রোতা বা পাঠকের চিন্তার জগতে একটা ধাক্কা লেগে গেলো- “আরে! এভাবেও ভাবা যায়!”

তিনকিশোর আলো পত্রিকায় ছাপা হওয়া একটা কার্টুন নিয়ে কিছুদিন আগে বেশ তোলপাড় হয়ে গেলো। গরুর রূপ ধরে এক মহাজাগতিক ভিলেইন বলছে “যারা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী গরুকে খায়, তারা এমন অমন।” পুরো কার্টুনটা পড়লে দেখা যায় (এবং কর্তৃপক্ষ নিজেরাও বিবৃতি দিয়েছে যে), সেটা আসলে অপশক্তির (antagonist) সংলাপ। কুরবানির ঈদ আসার ঠিক আগে দিয়ে এই কার্টুনের প্রকাশও কাকতাল মাত্র। তাই এটা নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই।

কিন্তু এরকম পদ্ধতিতে ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানোটা কিশোর আলো’র প্যারেন্ট পত্রিকা এবং এ ধরনের মিডিয়া ওভারঅল যে আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের পক্ষ থেকে আগেও পাওয়া গেছে। একটা ছোট্ট ম্যাসেজকে আপনি হেসে উড়িয়ে দিলেন তো আপনার চিন্তার জগতের একটা গেইটের পাস তাদেরকে দিয়ে দিলেন। সেটা খুলে ভেতরে ঢুকে তারা পরের গেইটে এঞ্জিনিয়ারিং শুরু করবে। তাই একটা পত্রিকার একটা ক্রোড়পত্রের একটা সংখ্যার একটা কার্টুনের একটা বক্স নিয়ে মুসলিমদের এত তোলপাড় আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়নি।

চারবাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান বন্যায় প্লাবিত। কোনো জায়গা থেকে দাবি এসেছে এবার গরু কাটাকাটির পেছনে এত শক্তি-অর্থ “অপচয়” না করে বন্যার্তদেরকে কিছু সাহায্য করতে। উত্তেজিত না হয়ে এই দাবিগুলোকে আমরা একটু নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখার চেষ্টা করি।

এই দাবিগুলো যারা তোলে তারা প্রথম যে ভুলটা করে তা হলো ইসলামী শরিয়তের সোর্সগুলোকে সাহিত্যকর্মের লেভেলে নামিয়ে এনে চিন্তা করা। সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হলো এর উপর লেখকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রতিটা পাঠক (বা দর্শক-শ্রোতা) সাহিত্যিকের কাজটাকে নিজ নিজ জ্ঞান-বিচারবুদ্ধি-অভিজ্ঞতা থেকে নিজের মতো করে একটা ইন্টারপ্রেটেশান বের করে। সত্যি বলতে পৌত্তলিক ধর্মের ধর্মগ্রন্থগুলো নিজেদেরকে এই স্বাধীনতার প্রতি সঁপেও দিয়েছে।সেখানে ইসলামের সোর্সগুলোর টেক্সট সংরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি এর বাস্তব প্রয়োগপদ্ধতির সংরক্ষণও এমন সুঠাম অ্যাকাডেমিক পন্থায় হয়েছে যে তা এক ঐতিহাসিক সত্য। যে কেউ নিজের পছন্দমতো একটা ব্যাখ্যা নিয়ে আসলে এই সংরক্ষিত বডির বিপরীতে নতুন ব্যাখ্যাটার অ্যাবসার্ডিটি এত নগ্ন হয়ে ধরা পড়ে যে, তা আলাদা করে কাউকে বলে দিতে হয় না। “নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য মনকে স্থির করা। কোয়ান্টাম মেথডে ধ্যান করলেই যেহেতু মন স্থির হয়ে যায়, তাই নামাজ না পড়লেও চলবে” – এরকম ব্যাখ্যা দিয়ে কাউকে আপনি পার পেতে দেখবেন না। একই কথা খাটে পশু জবাই না করে বন্যার্তদের টাকা দিয়ে ত্যাগের দায়ভার মেটানোর ন্যারেটিভের ক্ষেত্রেও।

নিরপেক্ষতা আপেক্ষিক। ফুটবল গ্যালারির নিরপেক্ষ দর্শকটা হয়তো ক্রিকেট গ্যালারিতে কোনো দলের রক্তারক্তি সমর্থক। যেকোনো ব্যক্তি, যেকোনো সংগঠন, যতই অরাজনৈতিক দাবিদার হোক, যতই ত্রাণ বিলানোর মতো নিরীহদর্শন কাজকর্ম করুক, সে বা তারা কোনো না কোনো একটা আদর্শের অবশ্যই প্রতিনিধিত্ব করে, জেনে বা না জেনে।

এই গরীব-দুঃখীদেরকে সাহায্য করার আপাত নিরীহ দাবিটা সবসময় একটা না একটা কনটেক্সটে, কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের লোকদের পক্ষ থেকে আসে। এটা যেকোনো দেশ, যেকোনো যুগ, যেকোনো পাত্র-পাত্রীর ক্ষেত্রে সত্য। বিরোধী ব্লককে দু’চোখে দেখতে না পারলে, কিন্তু তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার মতো যথেষ্ট শক্তিও না থাকলে এই গরীব-দুঃখী কার্ডটা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই কার্ডের সমস্যাটা হচ্ছে এটা সবার পকেটেই আছে। দূর্গাপূজায় বানানো প্রতিমা, দলের নেতার মৃত্যুবার্ষিকী আয়োজন বাবদ খরচ, সফররত টীমের নিরাপত্তাজনিত ব্যয়, ঘরে একটা টিভি থাকার পরও মা-বাবার সুবিধার জন্য কিনে দেওয়া দ্বিতীয়টা, থিসিস পেপার জমা হওয়ার আনন্দে খাওয়া ওই চিকেন গ্রীল, প্রতিবাদে ওড়ানো বেলুন আর পোড়ানো মোম, এই লেখাটা লেখা ও পড়ার জন্য ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইস – প্রতিটা টেবিলেই এই গরীব-দুঃখী কার্ডটা ফেলা যায়। এবং ফেলা হয়ও। কারা ফেলে? যে যেটার বিরোধী, সে সেখানে ফেলে।

নিজের পছন্দের এইসকল কাজ বাদ দিয়ে কেউ ত্রাণ বিলি করে না। প্রয়োজনে ত্রাণ দেয়, পাশাপাশি এসব কাজও চালু রাখে। এমনও না যে ইসলামী আদর্শের ধারক হওয়ার দাবিদার কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন এই বন্যায় কোনো ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম করছে না। কুরবানিকে কুরবানির জায়গায় রেখেই তারা এ কাজ করছে। সত্যি বলতে সামর্থ্যবান মুসলিমরা এ বছর কুরবানি না দিলে বন্যার্ত লোকেরা তাদের গবাদি পশু নিয়ে বিপদেই পড়ে যাবে। তাই বাস্তবতার দাবি ছিলো মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল সামর্থ্যবান মানুষ গিয়ে বন্যার্তদের এই পশুগুলো কিনে নিয়ে আসবে!

পাঁচযেসব কাজ বাদ দিতে বলা হচ্ছে, তার প্রত্যেকটাই কারো না কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মূর্তিপূজা, ভাস্কর্যপূজা, সেলেব্রিটিপূজা – এ সবই কারো না কারো ধর্মের অংশ। কোনো কিছুতেই খরচ হওয়া টাকা বাষ্পীভূত হয়ে আকাশে উড়ে যায় না। যে প্রতিমা বানাতে জানে, তার কর্মসংস্থান হচ্ছে, বেলুন ব্যবসায়ীর লাভ হচ্ছে, ডিশলাইন ব্যবসায়ীর মুনাফা হচ্ছে। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। মোমবাতিওয়ালা চায় না আপনি শোকে মোমবাতি না জ্বালিয়ে সেই টাকা বন্যার পানিতে ফেলে দিবেন।

তাহলে সমাধান কী?

ইন্সট্যান্ট সমাধান নেই। শুধু চিন্তার খোরাক জোগানোর জন্য কিছু কথা বলা যেতে পারে। ইসলামে কিছু কাজ শির্ক, কিছু কুফর, কিছু বিদ’আত, কিছু হারাম। কিছু কাজ আবার অপছন্দনীয়, কিছু হালাল হলেও অপ্রয়োজনীয়, কিছু জিনিস আবার হালাল এবং প্রয়োজনীয় হওয়ার পরও না থাকলেও জীবন কেটে যায়।

যা কিছু দেখি বা না দেখি, তার স্রষ্টা যেই জায়গায় খরচ করতে নিষেধ বা নিরুৎসাহিত করেছেন, সে জায়গায় খরচ করলে বারাকাহ আসবে না। আল্লাহ আমাদেরকে যে রিযক দিয়েছেন, সেখান থেকে তারঁই নির্দেশিত পথে পথগুলোতে আমরা খরচ করে দেখতে পারি একটা উত্তম সমাধান আসে কি না। আর যেসব জায়গায় তিনি খরচ না করতে বা কম করতে বলেছেন, সেসব জায়গায়ও সে অনুযায়ী কাজ করে দেখতে পারি কোনো লাভ হয় কি না। ধনী আরো ধনী হওয়ার, গরীব আরো গরীব হওয়ার, বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ আটজন ব্যক্তির মালিকানায় থাকার মতো অসহ্য এই বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হয় কি না।

এ কেমন ভাত খাওয়ানো হচ্ছে জাবির ক্যান্টিনে?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আল বেরুনী হলের ক্যান্টিনে একদিন আগে রান্না করা পঁচা-বাসি ভাত সকালে ধুয়ে শিক্ষার্থীদের খাওয়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার এমন বাসি ভাত ধৌত করার সময় হাতেনাতে এক কর্মচারীকে আটক করে শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আল বেরুনী হলের মার্কেটিং বিভাগের ৪৩তম আবর্তনের শিক্ষার্থী রাজিবুল হক ক্যান্টিনের একজন কর্মচারীকে গামলায় করে সাদা কিছু ধুতে দেখেন। কৌতূহল নিয়ে তিনি কাছে গিয়ে দেখেন এগুলো বাসি ভাত।

রাজিবুল তখনই বিষয়টি হলের ৪১তম আবর্তনের শিক্ষার্থী মওদুদ সুজনকে জানান। মওদুদ সুজন ঘটনার সত্যতা দেখে হলের কর্মচারী ও শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আবু সাদাত সায়েমকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। এ সময় হাতেনাতে ক্যান্টিনের কর্মচারী লিটনকে ভাত ধৌত করা অবস্থায় দেখেন। ভাত ধৌত করার কারণ জানতে চাইলে কর্মচারীটি কোন উত্তর দিতে পারেনি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভাতগুলি দুপুরে নতুন রান্না করা টাটকা ভাতের সঙ্গে মেশানোর জন্য ধোয়া হচ্ছিলো।

এদিকে এ অভিযোগের বিষয়ে ক্যান্টিন পরিচালক শরীফের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তার ছোট ভাই আরিফ জানায়, শরীফ পারিবারিক কাজে বাড়িতে গেছে। বাসি ভাত ধৌত করার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে সে অভিযোগ স্বীকার করে বলে, আগের রাতের অনেক বেশি ভাত রান্না করা হয়েছিল। সেগুলো সব বিক্রি হয় নাই। সেই ভাতগুলো লিটন ধুচ্ছিল। ‘কতদিন ধরে এভাবে টাটকা ভাতের সঙ্গে বাসি ভাত মেশানো হচ্ছে?’ জানতে চাইলে জবাবে আরিফ সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি।

এ ব্যাপারে আল বেরুনী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মওদুদ সুজন বলেন, ‘হাতেনাতে বাসি-পঁচা ভাত ধুয়ে দুপুরের খাবারের সঙ্গে মেশানোর এই কর্ম আমরা ধরেছি এবং প্রাধ্যক্ষকে জানিয়েছি। তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা চাই ক্যান্টিন পরিচালনায় শিক্ষার্থীদের সেবার মানসিকতা আছে এমন কেউ ক্যান্টিনের দায়িত্ব গ্রহণ করুক।

আল বেরুনী হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আমজাদ হোসেন বলেন, কেন বাসি ভাত ক্যান্টিনে ধোয়া হচ্ছিল সেটি জানাতে ‘কারণ দর্শানো’র নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কারণ দর্শানোর পরে ক্যান্টিন পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে এ ঘটনা হলে জানাজানি হলে শিক্ষার্থীরা ক্যান্টিনের ব্যাপারে নানা অভিযোগ দিতে থাকে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, খাবারের নিম্নমান, হল প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে নিজে উচ্চমূল্য নির্ধারণ, কম সংখ্যক কর্মচারী দিয়ে ক্যান্টিন পরিচালনা ইত্যাদি। একাধিক শিক্ষার্থী জানান, এই বাসি ভাত গরম ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে তাদের দীর্ঘদিন খাওয়ানো হতো।

এ বিষয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী রাজু বলেন, নিজের স্বার্থের জন্য কিভাবে এতগুলো ছাত্রের ক্ষতি করতে পারে একজন! ক্যান্টিন পরিচালনাকারীকে অবিলম্বে পরিবর্তন করার জোর দাবি জানাচ্ছি। ইয়াসির আরাফাত স্মরণ নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ক্যান্টিনে দাম বেশি, মান খারাপ। রান্নায় কোন স্বাদ নাই, মশলার ব্যবহার নাই। মান নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই অভিযোগ করা সত্ত্বেও তারা নির্বিকার!