মুহাম্মদের (সা.) যে কথায় কাঁপলো আবু জাহেল

ইবনে ইসহাক বলেন, আরাসের এক ব্যক্তি কিছু উঠ নিয়ে মক্কায় এলেন। আবু জাহেল তার উঠগুলো ক্রয় করে। ওই ব্যক্তি পাওনা দাবি করলে আবু জাহেল তালবাহান শুরু করে। Continue reading “মুহাম্মদের (সা.) যে কথায় কাঁপলো আবু জাহেল”

হযরত আবু বকর(রা) নবীজিকে যেভাবে চাদরের মতো ঢেকে রাখতেন

মদীনার মসজিদ। ফজরের সালাত শেষ হয়েছে। সাহাবীগণকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে আজ কে রোযা রেখেছে? কে ক্ষুধার্তকে খাবার খাইয়েছে? কে রোগী Continue reading “হযরত আবু বকর(রা) নবীজিকে যেভাবে চাদরের মতো ঢেকে রাখতেন”

ইমাম আবু হানিফা ও নাস্তিক

একবার খলিফা হারুনুর রশীদের নিকট এক নাস্তিক এসে বললেন যে আপনার সাম্রাজ্যে এমন কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে ডাকুন আমি তাকে তর্ক করে প্রমান করে দেব যে এই পৃথীবির কোন স্রস্টা নেই। এগুলো নিজে নিজে Continue reading “ইমাম আবু হানিফা ও নাস্তিক”

হযরত আবু বক্কর (রাঃ) এর ক্ষুধার কাহিনী

প্রচন্ড রোদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। মসজিদ-ই-নববীর দিকে হাঁটতে শুরু করলেন আবু বকর (রাঃ)। পথেই দেখা হয়ে গেল উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর সাথে। Continue reading “হযরত আবু বক্কর (রাঃ) এর ক্ষুধার কাহিনী”

চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর সময় নবীজির সাথে কি হয়েছিল

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তার পিতা মুসাইয়্যাব (রহঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, যখন আবূ ত্বালিব মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হ’লেন, রাসূল (সাঃ) তার নিকট গেলেন।আবূ জাহলও সেখানে ছিল। নবী (সাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ -কালেমাটি একবার পড়ুন, তাহ’লে আমি আপনার জন্য আল্লাহ্‌ নিকট কথা বলতে পারব।

তখন আবূ জাহল ও আব্দুললাহ ইবনু আবূ উমাইয়া বলল, হে আবূ ত্বালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হ’তে ফিরে যাবে? এরা দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবূ ত্বালিব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তা হ’ল, আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার পর নবী (সাঃ) বললেন, ‘আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়’।এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাযিল হল

‘নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয়, তবুও যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী’ [সূরা তওবা – ১১৩]

আরো নাযিল হল:

‘আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না’ [ সূরা কাছাছ – ৫৬]

[ বুখারী হা/৩৮৮৪ ‘আনছারদের মর্যাদা’অধ্যায়, ‘আবু ত্বালিবের কাহিনী’অনুচেছদ ]

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রা:) হ’তে বর্ণিত যে, তিনি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন তাঁর সামনে তাঁর চাচা আবূ ত্বালিবের আলোচনা করা হ’ল, তখন তিনি বললেন, আশা করি কিয়ামতের দিনে আমার সুফারিশ তার উপকারে আসবে। অর্থাৎ আগুনের হালকা স্তরে তাকে ফেলা হবে। যা তার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছাবে আর এতে তার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে (ঐ, হা/৩৮৮৫)।

শিক্ষা:
১. হেদায়েতের মালিক আল্লাহ্‌ তা‘আলা। তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়েত করেন, যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। এজন্য সবসময় তার কাছে হেদায়েত চাইতে হবে।

২. জাহান্নামের আযাব অত্যন্ত ভয়াবহ।সবচেয়ে হালকা শাস্তি হওয়ার পরেও যদি আবূ ত্বালিবের এই অবস্থা হয়, তাহ’লে অন্যদের কি অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়।

৩. সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানুষকে অনেক সময় হক গ্রহণ থেকে বিমুখ রাখে।

নবীজির প্রতি আবু বকরের রা: ভালোবাসা

হজরত আবু বকর রা: ছিলেন নবীজির সবচেয়ে প্রিয় সাহাবি। যিনি সিদ্দিকে আকবর নামে পরিচিত। তার উপাধি ছিল ‘আতিক’। ইসলামের দাওয়াত পাওয়ার পর যিনি হজরত রাসূল সা:কে নওবুয়ত সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করেননি তিনি হলেন হজরত আবু বকর রা:। হজরত নবী সা: বলেন, আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, সবার মধ্যে কম-বেশি সংশয় দ্বিধা অবশ্যই দেখেছি; কিন্তু আবু বকরের মধ্যে কোনো প্রকার সংশয় দেখিনি, দাওয়াতের সাথে সাথে আবু বকর কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গিয়েছে। হজরত মুহাম্মদ সা:-এর প্রতি আবু বকরের ভালোবাসা অতুলনীয় ছিল। তিনি নবীজির প্রতি এমন ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন, যা পরে আর কোনো সাহাবা আবু বকরের ভালোবাসাকে অতিক্রম করতে পারেননি। মুসলমানের সংখ্যা যখন মাত্র ৩৯ জন, তখন আবু বকর নবীজির কাছে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য অনুমতি চাইলেন। নবীজি আবু বকরের কাকুতি মিনতিতে অনুমতি দিয়েছিলেন। আবু বকর ৩৯ জন মুসলমানকে নিয়ে কাবা শরিফে উপস্থিত হয়ে খুতবা (ভাষণ) দিলেন, যা বায়তুল্লাহ শরিফে মুসলমানদের প্রথম খুতবা। এদিন ছিল মুসলমানের প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের প্রথম দিন। খুতবার শুরুতে কাফেররা আবু বকরকে বেদম প্রহার করে পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। প্রচণ্ড আঘাতের ফলে আবু বকর অজ্ঞান হয়ে পড়লে অন্য সাহাবিরা তাকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। দীর্ঘ সময় পর জ্ঞান ফিরলে আবু বকর সর্ব প্রথম জানতে চাইলেন- রাসূল সা:-এর কী অবস্থা, তিনি কোথায়? আবু বকরের জন্য খানাপিনার ব্যবস্থা করা হলো। তিনি বললেন, আমি রাসূল সা:-এর সাথে সাক্ষাৎ না করা পর্যন্ত কোনো খাবার খাবো না। মক্কায় যখন কাফেরদের অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেল, তখন নবীজি হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন। নবীজি সা: আবু বকরকে ডেকে বললেন, তোমাকে আমার সাথে যেকোনো সময় মদিনায় হিজরত করতে হবে। নবীজি এ কথা বলার পর চার মাস অতিবাহিত হয়ে গেলে হঠাৎ এক দিন রাতে আবু বকরের দরজায় নবীজি উপস্থিত হয়ে কড়া নাড়লেন। প্রথম ডাকের সাথে সাথে আবু বকর সাড়া দিলেন। নবীজি আর্শ্চায হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু বকর! তুমি এখনো ঘুমাওনি? আবু বকর বললেন, হুজুর আপনি যেদিন হিজরতের কথা বলেছেন, সেদিন থেকে আমি আর বিছানায় গা লাগাইনি। আমি রোজ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করি। যদি রাসূল সা: আমার ঘরের দরজায় এসে আমাকে না পেয়ে ফিরে যান।

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় আবু বকর নবীজিরর সাথে সাওর পাহাড়ের গুহায় অবস্থান করেছিলেন। অন্ধকার গুহার মধ্যে সাপ বিচ্ছু থাকতে পারে এই ভেবে আবু বকর প্রথমে গুহায় নেমে গুহা পরিষ্কার করলেন। গায়ের জামা দিয়ে গুহার ভেতরের প্রত্যেকটি গর্তের মুখ বন্ধ করে দেয়ার পর একটি গর্তের মুখ বন্ধ করা বাকি ছিল। গর্তের মুখ বন্ধ করার মতো আবু বকরের কাছে কিছুই ছিল না। অবশেষে আবু বকর নিজের পা দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে রাখেন। একপর্যায়ে একটি সাপ আবু বকরকে ছোবল দিলো। আবু বকরের পুরো শরীর বিষে কালো হয়ে গেল। আবু বকরের ঊরুতে মাথা রেখে নবীজি আরাম করছিলেন। তারপরও নবীজিকে আবু বকর ডাকেননি। এই ভেবে যে, নবীজির আরাম নষ্ট হবে। নবীজির কষ্ট হবে। বিষের যন্ত্রণায় চোখের পানির ফোটা যখন নবীজির শরীর মোবারকের ওপর গিয়ে পড়ল। নবীজি চোখ খুলে জিজ্ঞাস করলেন আবু বকর কাঁদছ কেন? এরপর আবু বকরের মুখ থেকে সব ঘটনা শুনে নবীজি বিস্মিত হয়েছিলেন। অতঃপর নবীজি তাঁর মুখের লালা সাপের ছোবলের স্থানে লাগিয়ে দিলেন। সাথে সাথে আবু বকর সুস্থ হয়ে গেলেন। তাবুকের যুদ্ধের পর নবীজি সবাইকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা দেয়ার আদেশ করলেন, সবাই সামর্থানুযায়ী খেদমত নিয়ে এলো। সবাই সাধ্যানুযায়ী খেদমত এনে রাসূল সা:-এর সামনে উপস্থাপন করল। সবার খেদমত দেখে হজরত ওমর মনে মনে ভাবলেন, আজ নবীজির আদেশ পালনে আমি প্রথম হবো। নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন, হে ওমর! তুমি ঘরে কী রেখে এসেছ? হজরত ওমর বললেন, ঘরে যা ছিল তা থেকে সবকিছুর অর্ধেক নিয়ে এসেছি। এবার নবীজি আবু বকরকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর! তুমি ঘরের মধ্যে কী রেখে এসেছ? আবু বকর বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে। আবু বকরের এই কথা শুনে হজরত ওমর রা: বললেন, আপসোস! আমি আবু বকরের চেয়ে উত্তম হতে পারলাম না। আবু বকরের চরিত্র, সত্যবাদিতা, ত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আবু বকর নবীজির প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলেন।
আল্লাহ পাক কোরআনে বলেন, ‘রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহ্বানের মতো মনে করো না’ (সূরা নূর: ৬৩)। হজরত আবু বকর রা: হজরত রাসূল সা:-এর হুকুমকে কখনো সাধারণ মানুষের হুকুমের মতো মনে করতেন না। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহ পাককে ভালোবাস, তাহলে আমার কথা মেনে চলো (আমাকে ভালোবাস), আল্লাহ পাকও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তিনি তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন’ (সূরা আল ইমরান : ৩১)। আমরা যদি নবীজিকে মানি ভালোবাসি তাহলে হজরত আবু বকরের মতো ভালোবাসতে হবে। রাসূলের সুন্নত ও আদেশ নির্দেশ পালনে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। তা হলেই রাসূল সা:কে ভালোবাসা হবে।
লেখক : প্রবন্ধকার

হযরত ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর প্রখর মেধার প্রমান

হযরত ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মেধা ছিল প্রখর।

ফতোয়ার ব্যাপারে তার সতর্কতা ছিল তুলনাহীন। একবার ইমাম সাহেবের মজলিসে এক ব্যক্তি এসে বললো, এল লোক বলেছে যে, কোন কাফের জাহান্নামে যাবে না’ এ ব্যক্তির ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কী?

ইমাম সাহেব তার ছাত্রদেরকে বললেন, “তোমরা এ লোকটির কথার জবাব দাও।”

ছাত্ররা বললো, লোকটি কাফের। কারণ সে ‘নফছ’ কে অস্বীকার করছে (অর্থাৎ কোরআনের সেসব আয়াতকে অস্বীকার করছে যার অর্থ স্বতঃ প্রকাশমান)

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বললেন, তাবীল কর। (অর্থাৎ কোন ওজর পেশ করে লোকটিকে কুফুরী থেকে বাচাঁও।)

ছাত্ররা বললো, এখানে তাবীল করার সুযোগ নেই। তাবীল করা অসম্ভব।

ইমাম সাহেব বললেন, “তাবীল আছে। আর তাহলো জাহান্নামে যাওয়ার সময় কেউ কাফের থাকবে না, সবাই মুমিন হয়ে পড়বে।

কারণ তখন দোযখ দেখবে তা অস্বীকার করার কোন উপায় থাকবে না। আর তখন দোযখীরা সবাই শরীয় অর্থে কাফের থাকলেও আভিধানিক অর্থে মুমিন হয়ে যাবে। আর সে মুমিন অবস্থায় দোযখে যাবে। কাফের অবস্থায় দোযখে যাবে না। তাই লোকটিকে কাফের হিসেবে ফতোয়া দেয়া যায় না।”

সুতরাং ইমাম সাহেবের মেধা এবং সতর্কতা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে।

কেউ কি তার সীমা খুঁজে পাবে?

(আল-এফাযাতুল য়্যাওমিয়্যাহ, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-১৯৬)

আল্লাহর ইচ্ছার সাথে নিজের ইচ্ছাকে এরূপ শর্তহীন ভাবে মিলিয়ে দিলে আল্লাহর সাহায্য নেমে আসে। এ অপূর্ব ঘটনা গ্রামবাসী স্বচক্ষে দেখলো।

(এরশাদাতে হাকীমুল উম্মত, খন্ড-২, পৃষ্ঠা- ৫৭)

জেনে নিন, এতিম ছেলে এবং আবু জেহেলের কাহিনী

আবু জেহেল ছিল একটি এতিম ছেলের অভিভাবক। ছেলেটি একদিন তার কাছে এলো । তার গায়ে একটুকরা কাপড়ও ছিল না। সে কাকুতি মিনতি করে তার বাপের পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে তাকে কিছু দিতে বললো। কিন্তু জালেম আবু জেহেল তার কথায় কানই দিল না। সে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর শেষে নিরাশ হয়ে ফিরে গেলো । কুরাইশ সরদাররা দুষ্টুমি করে বললো , ” যা মুহাম্মাদের ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) কাছে চলে যা। সেখানে গিয়ে তার কাছে নালিশ কর। সে আবু জেহেলের কাছে সুপারিশ করে তোর সম্পদ তোকে দেবার ব্যব্‌স্থা করবে । ” ছেলেটি জানতো না আবু জেহেলের সাথে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কি সম্পর্ক এবং এ শয়তানরা তাকে কেন এ পরামর্শ দিচ্ছে। সে সোজা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছে গেলো এবং নিজের অবস্থা তাঁর কাছে বর্ণনা করলো।

তার ঘটনা শুনে নবী ( সা) তখনই দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাকে সংগে নিয়ে নিজের নিকৃষ্টতম শত্রু আবু জেহেলের কাছে চলে গেলেন। তাঁকে দেখে আবু জেহেল তাঁকে অভ্যর্থনা জানালো। তারপর যখন তিনি বললেন , এ ছেলেটির হক একে ফিরিয়ে দাও তখন সে সংগে সংগেই তাঁর কথা মেনে নিল এবং তার ধন – সম্পদ এনে তার সামনে রেখে দিল । ঘটনার পরিণতি কি হয় এবং পানি কোন দিকে গড়ায় তা দেখার জন্য কুরাইশ সরদাররা ওঁৎ পেতে বসেছিল। তারা আশা করছিল দু’ জনের মধ্যে বেশ একটা মজার কলহ জমে উঠবে। কিন্তু এ অবস্থা দেখে তারা অবাক হয়ে গেলো। তারা আবু জেহেলের কাছে এসে তাকে ধিক্কার দিতে লাগলো। তাকে বলতে লাগলো , তুমিও নিজের ধর্ম ত্যাগ করেছে।

আবু জেহেল জবাব দিল , আল্লাহর কসম ! আমি নিজের ধর্ম ত্যাগ করিনি। কিন্তু আমি অনুভব করলাম , মুহাম্মাদের ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) ডাইনে ও বাঁয়ে এক একটি অস্ত্র রয়েছে। আমি তার ইচ্ছার সামান্যতম বিরুদ্ধাচরণ করলে সেগুলো সোজা আমার শরীরের মধ্যে ঢুকে যাবে। এ ঘটনাটি থেকে শুধু এতটুকুই জানা যায় না যে ,সে যুগে আরবের সবচেয়ে বেশী উন্নত ও মর্যাদা গোত্রের বড় বড় সরদাররা পর্যন্ত এতিম ও সহায় – সম্বলহীন লোকদের সাথে কেমন ব্যবহার করতো বরং এই সংগে একথাও জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কত উন্নত নৈতিক প্রভাব কতটুকু কার্যকর হয়েছিল।

জেনে নিন, আবু জর আল গিফারী (রঃ) – ইসলাম গ্রহনের পূর্বে যিনি ছিলেন দূর্ধর্ষ ডাকাত

মক্কা যে গিরিপথের মাধ্যমে বাকী পৃথিবীর সাথে যুক্ত ছিল সেটা ছিল ওয়াদান ভ্যালী এবং সেখানেই ছিল গিফার গোত্রের বাস। অত্যন্ত দুর্ধর্ষ এই জাতি মক্কা এবং সিরিয়ার মধ্যে যে সকল বানিজ্য বহর চলাচল করত তাদের জিম্মি করে চাঁদবাজী করত । বানিজ্য কাফেলা তাদের দাবী পূরণে ব্যর্থ হলে তারা মালামাল আর ধনসম্পদ লুন্ঠন করত । জুনদুব ইবন্ জুনাদা নামে এই গোত্রের ভয়ংকর এবং ক্ষিপ্র একজন নেতা ছিল, যাকে মানুষ আবু জর ডাক নামেই বেশী চিনত।

লোকটি সমগ্র আরব অঞ্চলে তার সাহস এবং স্থিরচিত্তের জন্য বিখ্যাত ছিল। লোকজন তাকে সেই মানুষ হিসাবেও জানত যে মানুষ আরবের সকলে যে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে জীবনধারণ করে সে তাকে মিথ্যা বলে মনে করত।

ওয়াদান মরুভূমিতে অবস্থানকালে একদিন তাঁর কাছে খবর পৌঁছাল যে, মুহাম্মাদ নামের একজন ব্যক্তি মক্কায় নিজেকে আল্লাহর নবী বলে পরিচয় দিচ্ছে। একথা শোনার পর তার অন্তরে খেলে গেল এক অদ্ভূত আলোড়ন। মন বলল এই লোকটিই হয়ত সে, যে এ জাতিকে মূর্তিপূজা এবং পাপাচার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবে। এ জনকে ও জনকে জিজ্ঞেস করেও তিনি কোন সদুত্তর পেলেন না। অস্থির মনের ব্যাকুলতা আরো বরং বেড়ে গেল। মন বলল আর তো বিলম্ব করা যায় না। বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে নিশ্চিত খবর তার চাই।

তাঁর ছোট ভাই এর নাম ছিল আনিস। বড় ভাই এর অস্থিরতা তার চোখেও ধরা পড়েছিল। আনিস নিজেও বড় ভাইকে গভীরভাবে ভালোবাসতো। আবু জর একদিন তাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ”তুমি মক্কায় চলে যাও। ওখানে গিয়ে চুপি চুপি সে লোকটিকে খুঁজে বের করবে যে নিজেকে নবী বলে পরিচয় দিচ্ছে। সাবধান থেকো, ওখানকার মানুষ জানতে পারলে তোমাকে এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। লোকটি কি কি বলে তুমি তা মনোযোগ দিয়ে শুনো, বিশেষ করে সে কথাগুলো, যা সে আল্লাহর পক্ষ থেকে পেয়েছে বলে বলছে। দ্রুত যাও আর ফিরে এসে আমাকে সব জানাও।”

আনিস দেরী না করে বেরিয়ে পড়ল। মক্কার বিপদসংকুল পরিস্থিতি। নতুন নবীর দাবীদার মুহাম্মাদের সন্ধান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংশয় আর শংকার মধ্যেই আনিস একদিন খুঁজে বের করলো মুহাম্মাদকে (আল্লাহর করুনা শান্তি তাঁর উপর বর্ষিত হোক)। আনিস তাঁর কথা শুনলেন, তারপর মক্কা থেকে তিনি দ্রুত ওয়াদান এর পথে রওয়ানা হলেন।

ইতিমধ্যেই আবু জর অস্থির হয়ে উঠেছেন। মক্কা-ওয়াদান পথে তার উদ্বিগ্ন দৃষ্টি আনিসের আগমন পথের প্রতীক্ষায় ছিল। একদিন দেখা গেল আনিস ফিরে আসছে। ছুটে গেলেন তিনি আনিসের কাছে। উদ্বিগ্ন আবু জর জিজ্ঞেস করলেন, ”কি দেখলে ওখানে, দেখা হয়েছিলো তাঁর সাথে?” ”হ্যাঁ। একজন মানুষকে ওখানে সত্যিই আমি পেয়েছি যে নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত নবী বলে বলছে। সে কবি নয় এবং সে মানুষকে কেবল সত্য ও সৎকাজের দিকে ডাকছে।” ”মানুষজন তার সম্বন্ধে কি বলছে?” ”তারা তাকে যাদুকর, মিথ্যাবাদী আর কবি হিসাবে বলছে।” ”তুমি আমার কৌতুহল মেটাতে পারলে না। তুমি কি আমার পরিবারের দিকে খেয়াল রাখতে পারবে যদি আমি নিজেই মক্কা যাই আর সেই নবী বলে দাবীদার লোকটির সবকিছু নিজেই দেখে আসি?” ”হ্যাঁ। তবে সাবধান, মক্কার লোকদের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকবেন।”

আর দেরী না করে আবু জর বেরিয়ে পড়লেন। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত যৌবন তার। জীবনে কতবার মানুষের সম্পদ লুট করার জন্য ক্ষিপ্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়েছেন, আর আজ তিনি চলেছেন এক মহাসত্যকে গ্রহণ করে নেবার জন্য। প্রখর সূর্য, গভীর রাতের নিকষ কালো অন্ধকার সবকিছু পেছনে ফেলে অকুতোভয় মানুষটি এগিয়ে চললেন মক্কার দিকে।

মক্কায় পৌঁছেই তীক্ষ্মধী আবু জর বুঝতে পারলেন শুধুমাত্র মুহাম্মাদের সাথে দেখা করার চেষ্টার কারণে তিনি অত্যন্ত অনিরাপদ ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং এজন্য তিনি কঠিন সতর্কতা অবলম্বন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। আবু জর লক্ষ্য করলেন কুরাইশরা মুহুম্মাদের আনুসারীদের নির্মম শাস্তি দিচ্ছে আর কে কে মুহাম্মাদের কাছে আসছে তা দেখার জন্য চতুর গোয়েন্দাবাহিনী নামিয়েছে। আবু জর জানতেন যে এ অবস্থা তাকে মোকাবেলা করতে হতে পারে, তাই তিনিও প্রস্তুত ছিলেন। বুদ্ধিমান আবু জর এজন্য কোন লোকের কাছে মুহাম্মাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা থেকে বিরত রইলেন। পরিস্থিতি উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে তিনি রাতে কাবাঘরের এক কোণে শুয়ে পড়তেন। একদিন আলী ইবন্ আবী তালীব তাকে দেখে ভাবলেন তিনি নিশ্চয়ই একজন আগন্তুক। আলী তাঁকে তার বাড়ীতে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আবু জর মেহমান হিসাবে চললেন আলীর বাড়ীতে। রাত যাপন করে তিনি সকালে আবার কাবার কাছে চলে এলেন, তবে আবু জর বা আলী কেউ কাউকে কোন প্রশ্ন করলেন না।

মুহাম্মাদ নামের নবী বলে দাবীদার লোকটির দেখা পাবেন বলে পরদিন সারাদিন তিনি কাবার কাছে খুঁজে খুঁজে কাটিয়ে দিলেন। কিন্তু দেখা পেলেন না। রাতে আবার চলে এলেন কাবার মসজিদে ঘুমাতে এবং আজও আলী ইবন্ আবী তালিব দেখলেন তাকে। আজ আলী বললেন, “এখনওকি সে সময়টা হয়নি যখন মানুষ বাড়ীর দিকে যায়, চলুন।”

আবু জর আজও আলীর সাথে তার বাড়ীতে গেলেন এবং আজও দুজনের কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।

এমনিভাবে তৃতীয় দিন এল। আজও আলীর মেহমান হয়েই আবু জর এসেছেন আলীর বাড়ীতে। আজ আলী জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি আমাকে বলবেন কেন আপনি মক্কায় এসেছেন?” ”আমি আপনাকে তখনই বলব যখন আপনি আমার সাথে এই প্রতিজ্ঞা করবেন যে, আমি যা চাই তার সঠিক সংবাদ আপনি আমাকে দেবেন আর কাউকে তা জানাবেন না।” আলী রাজী হলেন। আবু জর বললেন, ”আমি মক্কা থেকে অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছি একজন লোকের খোঁজে, যার নাম মুহাম্মাদ, যে নিজেকে নবী বলে পরিচয় দিচ্ছে। আমি শুধু তার সাথে একটু দেখা করে তার কিছু কথা শুনতে চাই।”

আনন্দে আলীর চেহারা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আলী বললেন, ”আল্লাহর শপথ, তিনি সত্যিই নবী।” আলী তাকে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এবং তিনি যে শিক্ষা দিচ্ছেন তার থেকে কিছু আবু জরকে শোনালেন। অবশেষে তিনি বললেন, ”কাল সকালে আমি আপনাকে মুহাম্মাদের (সাঃ) কাছে নিয়ে যাব। আমি যেখানে যাব আপনি দূর থেকে আমাকে অনুসরণ করবেন। আমি যদি আপনার জন্য বিপজ্জনক কোন কিছু দেখি তাহলে আমি মূত্রত্যাগ করার ভাব করে থেমে যাব। যদি আমি চলতে থাকি আপনি আমাকে অনুসরণ করবেন এবং আমি যেখানে প্রবেশ করি আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন।”

সে রাতে আবু জর এর ঘুম হল না। এতদিন ধরে যে মানুষটিকে দেখার জন্য তিনি হন্যে হয়ে ঘুরছেন কাল তাঁরই সাথে দেখা হতে যাচ্ছে। আর তিনি যদি আল্লাহর নবীই হয়ে থুকে তাহলে কী সৌভাগ্যময় দিন তার আসতে যাচ্ছে কাল।

পরদিন কথামত আবু জর চললেন আলীর সাথে রাসুল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে দেখা করার জন্য। আলীর সাথে দূরত্ব বজায় রেখে তিনি আলীর পদচিহ্ন অনুসরণ করতে লাগলেন। কোন বিপদ ছাড়াই একসময় তারা পৌঁছে গেলেন কাঙ্খিত গন্তব্যে। কত কথা আবু জর যেন ভেবে রেখেছিলেন মুহাম্মাদকে জিজ্ঞাসা করার জন্য, তার কথাগুলো একটু যাচাই করে নেবার জন্য, কিন্তু আজ যখন তিনি মুহাম্মাদ নামের এই লোকটির সামনে এলেন, তার আগেই আল্লাহ্ ঈমানের আলো আবু জরের অন্তরে ঢেলে দিয়েছিলেন। প্রথম দেখাতেই রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে তিনি বললেন, ”আপনার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি বর্ষিত হোক হে আল্লাহর রাসুল।” ”আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ্”।

রাসুলুল্লাহ্, তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক, আবু জরের চেয়েও সুন্দর ভাষায় সে সম্বোধনের জবাব দিলেন, ”তোমার উপরও আল্লাহর শান্তি, রহমত ও করুণা বর্ষিত হোক।” ”ওয়ালাইকুম আস্সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্ ওয়া বারাকাতুহু”। আর এভাবেই আবু জর হলেন প্রথম মানুষ যিনি আল্লাহর রাসুলকে সেই কথাগুলো দিয়ে সম্বোধন করলেন যা পরবর্তিতে মুসলিমদের জন্য সম্বোধন রীতি হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) তাকে স্বাগত জানরালেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাকে কুরআন থেকে কিছু বাণী পড়ে শেনালেন। আবু জর মোটেও দেরী করলেন না, সত্যের আলো তার হৃদয়ে আল্লাহ্ প্রজ্জ্বলিত করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ্ ও তার রাসুলকে বিশ্বাস করে সাক্ষ্যের উচ্চারণ তার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো। আর ভাগ্যবান এই লোকটি এভাবেই প্রথম দিককার মুসলিমদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হলেন, যাদের সীমাহীন মর্যাদার কথা স্বয়ং আল্লাহ্ ঘোষনা করেছেন। এরপরের কথা আমরা আবু জরের মুখ থেকেই শুনব।

“এরপর থেকে আমি রাসুল, তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক, এর সাথে মক্কায় থাকতে লাগলাম। তিনি আমাকে ইসলাম এবং কুরআন শিক্ষা দিলেন। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) আমাকে বললেন, ”তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা তুমি এখানে মক্কার কাউকে জানিও না। আমার ভয় হয়, তা জানলে ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে।”

আবু জর তারুণ্যদীপ্ত দুঃসাহসিক মানুষ। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি কাউকে কখনও ভয় পাননি, বরং এ লোকটির সাহস আর পৌরুষ সবাইকে অবাক করেছে। আজ ঈমানের তেজ তার অন্তরে। তিনি কি কাউকে ভয় পেতে পারেন? আবু জর বললেন, ”যার হাতে আমার প্রাণ সেই মহান সত্ত্বার শপথ ইয়া রাসুলাল্লাহ্, আমি ততক্ষন পর্যন্ত মক্কা ত্যাগ করব না যতক্ষন না আমি কাবার প্রঙ্গনে কুরাইশদের মাঝখানে গিয়ে যে সত্য আল্লাহ্ আমাকে দিয়েছেন সে সত্যের ঘোষণা না দেব।”

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) নিশ্চুপ রইলেন। আমি কাবার মসজিদে গেলাম। কুরাইশরা সেখানে বসে ছিল এবং নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। আমি তাদের মাঝখানে গিয়ে পৌঁছালাম এবং আমার গলার সর্বোচ্চ আওয়াজে বললাম, ”কুরাইশগণ, আমি তোমাদের ঘোষণা করছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নাই এং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল।”

আমার কথার সাথে সাথে তাদের মধ্যে বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া হল। তারা লাফ দিয়ে উঠে পড়ল এবং বলতে লাগল, ”একে এখনই ধর, সে নিজের দীন ত্যাগ করেছে।” তারা আমাকে ধরে ফেলল, আমার উপর চড়ে বসল আর আমাকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে মারতে লাগলো। তাদের সেই বীভৎস মার আমাকে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সে সময় আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব, যিনি রাসুলুল্লাহর চাচা, আমাকে চিনতে পারলেন। তিনি আমার উপর আচ্ছাদনের মত ঝুঁকে পড়লেন এবং আমাকে তাদের মার থেকে রক্ষা করলেন। তারপর তাদের বললেন, ”তোমাদের ধ্বংস হোক, এ তোমরা এ কি করছ? তোমরা কি গিফার গোত্রের একজন লোককে মেরে ফেলছ অথচ তোমাদের ব্যবসা ও বাহনগুলো গিফার গোত্রের উপর দিয়েই মক্কা থেকে বের হবে।” আব্বাসের এ কথায় তারা আমাকে ছেড়ে দিল।

এ ঘটনার পর আমি রাসুলুল্লাহ্, তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক, এর কাছে ফিরে গেলাম। যখন তিনি আমার ক্ষতবিক্ষত অবস্থা দেখলেন তখন বললেন, ”আমি কি তোমাকে বলিনি মক্কার লোকদের সামনে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা না দেবার জন্য।” আমি বললাম, ”ইয়া রাসুলাল্লাহ্, এ কাজটি করার জন্য আমি মন থেকে চাইছিলাম এবং তা আমি পূরণ করেছি”। ”তোমার জাতির কাছে ফিরে যাও, আর তুমি যা দেখেছ ও যা শুনেছ তা তাদেরকে জানাও। তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দাও। আল্লাহ্ হয়তো তোমার মাধ্যমেই তাদেরকে কল্যাণের দিকে নিয়ে আসবেন এবং তাদের মাধ্যমে তোমাকে পুরস্কৃত করবেন। আর যখন তুমি শুনবে যে আমি প্রকাশ্যে চলে এসেছি, তখন তুমি আমার কাছে চলে এসো।”

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর এ আদেশের পর আমি আমার জাতির কাছে চলে এলাম। আমার পৌঁছানোর খবর পেয়ে আমার ভাই আমার কাছে ছুটে এল। ”আপনি কি করলেন সেখানে?”, সে আমাকে জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম যে, আমি মুসলিম হয়েছি আর মুহাম্মাদ যে শিক্ষা দিচ্ছেন তা সত্য বলে বিশ্বাস করেছি। ”আমি আপনার ধর্ম আর মতের বিরুদ্ধে নই, আজ থেকে আমিও মুসলিম আর বিশ্বাসী হিসাবে ঘোষনা করলাম।”

দুই ভাই এরপর তাদের মায়ের কাছে গেল এবং মাকে ইসলামের দাওয়াত দিল। মা বললেন, ”তোমাদের দু ভাইয়ের বিশ্বাসের সাথে আমার কোন দ্বিমত নেই। আজ থেকে আমিও ইসলামে প্রবেশ করলাম।”

সেদিন থেকেই এ বিশ্বাসী মুসলিম পরিবারটি গিফার গোত্রের লোকদের অক্লান্তভাবে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলল। ফলশ্র“তিতে গিফার গোত্রের অধিকাংশ লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল।

আবু জর রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) মদিনায় হিজরতের আগ পর্য়ন্ত ওয়াদান মরুভূমিতে তাঁর গোত্রে অবস্থান করতে লাগলেন। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের সময় পর্য়ন্ত এ গোত্রটি ওয়াদান মরুভূমিতে অবস্থান করতে লাগল। অবশেষে রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশে আবু জর এরপর মদিনায় চলে এলেন। আবু জর রাসুল (সাঃ) এর কাছে অনুমতি চাইলেন সর্বক্ষন তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে থাকার জন্য এবং তাঁর ব্যক্তিগত কাজে লাগার জন্য। রাসুল (সাঃ) তাঁকে অনুমতি দিলেন এবং তার সাহচার্য ও কাজকর্মে সবসময় সন্তুষ্ট ছিলেন। রাসুল (সাঃ) প্রয়ই আবু জরকে অন্যদের থেকে অগ্রাধিকার দিতেন এবং যখনই তার সাথে দেখা হত তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাসতেন আর তাঁকে বেশ প্রফুল্ল দেখাত।

সময় বয়ে চলল এবং একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) মৃত্যুবরণ করলেন। আবু জর এরপর আর মদিনা থাকতে পারলেন না। প্রতিটি মুহূর্তে রাসুলের (সাঃ) শূন্যতা তাকে ভীষন আবেগপ্রবন করে তুলত। রাসুলের (সাঃ) যে অভিভাবকত্ব আবু জরকে ছায়ার মত আগলে রেখেছিল তার অভাব তাকে প্রতিটি সেকেন্ডে যেন বিদ্ধ করছিল। আবু জর মদিনা ত্যাগ করলেন এবং আবু বকর এবং উমার এর পুরো খিলাফতকাল তিনি সিরিয়ার মরুভূমিতে নিভৃতে কাটিয়ে দিলেন।

উসমান ইবন্ আফফান (রাঃ) এর খিলাফতকালে আবু জর দামাস্কাসে অবস্থান করছিলেন। দুনিয়ার প্রতি চিরকাল উদাসীন আবু জর লক্ষ্য করলেন মুসলিমরা পরকাল বাদ দিয়ে দুনিয়া এবং বিলাসিতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তিনি এতে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়লেন। উসমান (রাঃ) তাকে মদিনায় ডেকে পাঠালেন। মদিনায় এসেও আবু জর মুসলিম সমাজের বিলাসিতায় মজে যাবার চিত্রই দেখলেন। অবিশ্বাস্য রকম দৃঢ় ও সারাজীবন একই রকম দুনিয়াবিমুখ এ লোকটি মুসলিমদের এ পরিবর্তন সহজভাবে নিতে পারলেন না। এর ফলে শাসক খিলাফতের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব বাড়তে লাগল, এমনকি আবু জরের দৃঢ় দুনিয়া বিমুখতায় মুসলিম সমাজে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখা দিল। এহেন অবস্থায় খলিফা উসমান তাঁকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাঁকে মদিনার কাছে নির্জন আল-রাবাতাহ্ মরুভূমিতে চলে যাবার জন্য অনুরোধ করলেন। আবু জর লোকালয় থেকে অনেক দূরে রাবাতাহ্য় চলে গেলেন এবং সেখানে প্রাণপ্রিয় রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ্ আঁকড়ে ধরে বাস করতে লাগলেন। মরুভূমিতে তাঁর বসবাসকালীন জীবনে একবার এক লোক তাঁর সাথে দেখা করতে এল। অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে সে লক্ষ্য করল আবু জরের বাড়ী প্রায় শূন্য, কোন সম্পদ বলতে সেখানে কিছু নেই। লোকটি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ”আপনার সম্পদ কোথায়?” তিনি উত্তর করলেন, ”পৃথিবীর পরের জীবনে আমার একটি বাড়ী আছে। আমার সব উত্তম সম্পদগুলো আমি সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছি।” লোকটি বুঝল আবু জর কি বুঝাতে চাচ্ছেন। ”কিন্তু যতদিন আপনি এ দুনিয়াতে আছেন, ততদিন আপনার কিছু সম্পদ থাকা উচিৎ”। আবু জর উত্তর করলেন, ”যিনি এ পৃথিবীর মালিক, তিনি তো আমাকে এ সম্পদের কাছে ছেড়ে দেবেন না”।

একবার সিরিয়ার আমীর দূত পাঠিয়ে আবু জরকে তাঁর প্রয়োজন মেটানোর জন্য তিনশো দীনার পাঠিয়ে দিল। আবু জর এই বলে আমীরের দেয়া দীনার ফেরত পাঠালেন যে, ”আমীর কি এ দীনারগুলো দেবার জন্য আমার চেয়ে বেশী চাহিদাসম্পন্ন ভৃত্য আর কাউকে খুঁজে পেলেন না?”

৩২ হিজরী। আবু জরের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়েছে। নির্জন মরুভূমিতে তিনি আর তাঁর স্ত্রী একা। রাবাতাহ্ ছিল এমন একটি যায়গা যেখান দিয়ে সাধারণত একেবারেই লোক চলাচল হত না, তার উপর সে সময়টা এমন ছিল যখন কোন বাণিজ্য কাফেলাও যাতায়াত করত না।। মৃত্যুপথযাত্রী আবু জরের অবস্থা দেখে তাঁর স্ত্রী ব্যাকুল হয়ে পড়লেন কোন সাহায্যের আশায়। স্ত্রীর এ অবস্থা দেখে আবু জর বললেন, ”চিন্তা করো না, আমি রাসুলাল্লাহ, তাঁর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক, কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে এখানকার একজনের মৃত্যু হবে নির্জন মরুভূমিতে। কিন্তু তার মৃত্যুর সময় মুমিনদের একটি দল সেখানে উপস্থিত হবে। আমি নিশ্চিত সে ব্যক্তিটিই আমি, কারণ সেদিন আমরা যারা সেখানে উপস্থিত ছিলাম তাদের সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। কেবল আমিই বাকী। তুমি পথের দিকে খেয়াল রাখ। নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল মিথ্যা বলেন নি।” আবু জর কিছুক্ষনের মধ্যেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। আবু জরের স্ত্রী একবার স্বামীর কাছে আরেকবার উঁচু টিলার উপর উঠে দূরে খেয়াল করতে লাগলেন। এ অসময়ে কে আসবে এই অপ্রচলিত পথে এই চিন্তায় তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। অবশেষে দূরে দেখা গেল ধুলোর ঝড় তুলে একদল লোক এদিকেই আসছে। কাফেলাটি এসে আবু জরকে অসহায় অবস্থায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল এ লোকটি কে? তাঁর স্ত্রী উত্তর করলেন, আবু জর। লোকেরা বলল, রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাহাবী আবু জর? তাঁর স্ত্রী বললেন, ”হ্যাঁ।” লোকেরা অত্যন্ত অস্থির হয়ে বলল, ”আমাদের জান কুরবান হোক”। তারা দ্রুত আবু জরের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করলেন। প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইবন্ মাসউদ (রাঃ) তাঁর জানাজার সালাত পড়ান।

এমনিভাবে আবু জর ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন দুনিয়াবিমুখ হয়ে কেবলমাত্র আল্লাহ্ আর তাঁর রাসুলের আনুগত্যের মাধ্যমে। একদিন যে লোকটি ওয়াদান ভ্যালীর আতঙ্ক আর ত্রাসের নাম ছিল, সে ব্যক্তিটিই একদিন নির্লোভ আর দুনিয়াবিমুখতার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। ঈমানের মাধ্যমে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর অন্তরকে এমনই পরিবর্তন করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে তিনি এতই ভালবাসতেন যে তাঁর মৃত্যুর পর যখনই তিনি রাসুলের (সাঃ) কথা মনে করতেন, তখনই অঝোর ধারায় কাঁদতেন। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যপার এই যে এই দুর্ধর্ষ মানুষটি সম্পর্কেই রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, ”আকাশের নীচে এবং পৃথিবীর উপর আবু জরের চেয়ে বিশ্বাসী ও সত্যবাদী আর কেউ নেই”।