জেনে নিন, কুরআন তিলাওয়াত বা অন্যান্য ইবাদাতের সাওয়াব কি মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে?

প্রথম ফতোয়া

প্রশ্ন : সূরা ইখলাস পাঠ করে কেউ যদি মৃত ব্যক্তিকে ঈসালে সাওয়াব করে, তাহলে মৃত ব্যক্তি কি উপকৃত হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কি করতেন, কবরবাসীর জন্য তিনি কি তিলাওয়াত করতেন, না শুধু দোয়া করতেন?

উত্তর :
প্রথমত : কেউ যদি কুরআন তিলাওয়াত করে মৃত ব্যক্তিকে ঈসালে সাওয়াব করে, আলেমদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী এ সাওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় না, কারণ এটা মৃত ব্যক্তির আমল নয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
﴿وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى﴾
{আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।} {সূরা নাজম: ৩৯}
এ তিলাওয়াত জীবিত ব্যক্তির চেষ্টা বা আমল, এর সাওয়াব সে নিজেই পাবে, অন্য কাউকে সে ঈসালে সাওয়াব করার অধিকার রাখে না। এ সংক্রান্ত সৌদি আরবের “ইলমি গবেষণা ও ফতোয়ার স্থায়ী ওলামা পরিষদ” এর একটি বিস্তারিত ফতোয়া রয়েছে, নিচে তা উল্লেখ করা হলো :

প্রশ্ন : কবর জিয়ারতের সময় সূরা ফাতেহা পাঠ করা, অথবা কুরআনের কোন অংশ পাঠ করা কি বৈধ, আর এর দ্বারা সে কি উপকৃত হবে ?

উত্তর :
বিশুদ্ধ হাদিস থেকে প্রমাণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করতেন এবং কিছু বাক্য দ্বারা তিনি কবরবাসীদের জন্য দু‘আ করতেন, যা তিনি সাহাবাদের শিখিয়েছেন, তারাও তার থেকে শিখে নিয়েছে। যেমন :
‏السلام عليكم اهل الديار من المؤمنين والمسلمين، وانا ان شاء الله بكم لاحقون، نسال الله لنا ولكم العافية‏
হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলমানগণ, তোমাদের উপর সালাম, ইনশাআল্লাহ অতিসত্বর আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো, আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।” [ইবনে মাজাহ : ১৫৩৬]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করার সময় কুরআন বা তার কোন আয়াত তিলাওয়াত করেছেন এমন প্রমাণিত নয়, অথচ তিনি খুব কবর যিয়ারত করতেন। যদি তা বৈধ হত বা মৃতরা তার দ্বারা উপকৃত হত, তাহলে অবশ্যই তিনি তা করতেন এবং সাহাবাদের নির্দেশ দিতেন। বরং নবুওয়তের দায়িত্ব আদায়, উম্মতের প্রতি দয়া ও সাওয়াবের বিবেচনায় এটা তার কর্তব্য ছিল। কারণ, তার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَحِيمٌ﴾
{নিশ্চয় তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তা তার জন্য কষ্টদায়ক যা তোমাদেরকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।} [সূরা তওবা: ১২৮]
অতএব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে দয়া, উম্মতের কল্যাণ কামনা ও অনুগ্রহ থাকা সত্বেও যেহেতু তিনি তা করেন নি, তাই প্রমাণ করে যে এটা না-জায়েয। সাহাবায়ে কেরাম তাই বুঝেছেন এবং এর উপরই তারা আমল করেছেন, Ñআল্লাহ তাদের সকলের উপর সন্তুষ্ট হোনÑ তারা কবর যিয়ারতের সময় মৃতদের জন্য দু‘আ করতেন ও নিজেরা নসিহত হাসিল করতেন। তারা মৃতদের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করেন নি। তাই প্রমাণিত হল যে, কবর যিয়ারতের সময় কুরআন তিলাওয়াত করা পরবর্তীতে আবিষ্কৃত বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
‏من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد‏‏
“আমাদের এ দ্বীনে যে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যাক্ত।” [বুখারি: ২৫১২, মুসলিম: ৩২৪৮]

দ্বিতীয় ফতোয়া (প্রথম ফতোয়ার অবশিষ্টাংশ)

প্রশ্ন : আমরা কতক মুসলিম দেশে দেখি, কুরআন তিলাওয়াতের জন্য লোক ভাড়া করা হয়, কুরআন তিলাওয়াত করে বিনিময় গ্রহণ করা কি বৈধ ? বিনিময় দাতা কি এ জন্য গোনাহগার হবে ?

উত্তর :
কুরআন তিলাওয়াত একটি খালেস ইবাদাত। মুসলিমগণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও সাওয়াবের আশায় তা সম্পাদন করবে, এসব ইবাদাতের মূল নীতিও তাই, এ জন্য কারো থেকে বিনিময় গ্রহণ বা কারো কৃতজ্ঞতা আদায় করা যাবে না। সালাফ তথা আমাদের আদর্শ মনীষীদের থেকে প্রমাণিত নয় যে, তারা মৃত ব্যক্তি, অলিমা অথবা অন্য কোন অনুষ্ঠানে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য কাউকে ভাড়া করেছেন, অথবা তারা এর নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা এর অনুমতি প্রদান করেছেন, অথবা তারা কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে বিনিময় গ্রহণ করেছেন, বরং তারা আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশায় তিলাওয়াত করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে, সে যেন আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে। তিনি মানুষের নিকট প্রার্থনা থেকে সতর্ক করেছেন। সাহাবি ইমরান বিন হাসিন থেকে ইমাম তিরমিযি তার সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করেন :
عن عمران بن حصين أنه مر على قاص يقرأ ثم سأل؛ فاسترجع ثم قال‏:‏ سمعت رسول الله ـ صلى الله عليه وسلم ـ يقول‏:‏ “من قرأ القرآن فليسأل الله به، فإنه سيجيء أقوام يقرؤون القرآن يسألون به الناس”
ইমরান ইবন হুস়াইন এক গল্পকারের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যে তিলাওয়াত করে করে মানুষের নিকট প্রার্থনা করত। তিনি এ দৃশ্য থেকে ইন্নালিল্লাহ পড়লেন। অতঃপর বললেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শোনেছি :
“যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে, সে যেন তার ওসিলা দিয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, কারণ অতিসত্বর এমন এক দল আভির্ভূত হবে, যারা কুরআন তিলাওয়াত করবে আর তার ওসিলা দিয়ে মানুষের নিকট প্রার্থনা করবে।”

[আহমদ : ৪/৪৩২Ñ৪৩৩, ৪৩৬Ñ৪৩৭, ৪৩৯, ৪৪৫, তিরমিযি : ৫/১৭৯, হাদিস নং : (২৯১৭), ইবনে আবি শায়বাহ : ১০/৪৮০, তাবরানি : ১৮/১৬৬Ñ১৬৭, হাদিস নং : (৩৭০Ñ৩৭৪), বাগাভী : ৪/৪৪১, হাদিস নং : (১১৮৩)]

তবে যেসব অবস্থায় তিলাওয়াতকারী ব্যতীত অপরের নিকটও কুরআনের উপকারিতা পৌঁছয়, সেসব অবস্থায় বিনিময় গ্রহণ করা বৈধ, যেমন কুরআন শিক্ষা দেয়া অথবা কুরআনের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা ইত্যাদি। বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত, সাহাবি আবু সাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এক পাল বকরী গ্রহণ করেছিলেন সূরা ফাতিহা দ্বারা এক ব্যক্তিকে ঝাড়-ফূঁক করে, যাকে বিষাক্ত কীট দংশন করে ছিল। সাহাবি সাহল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মেয়েকে জনৈক ব্যক্তির নিকট এ শর্তে বিয়ে দেন যে, সে তার নিকট রক্ষিত কুরআন মেয়েকে শিক্ষা দেবে।

[আহমদ : (৫/৩৩৬), বুখারি : হাদিস নং : (২৩১০), (৫০২৯), (৫০৩০), (৫০৮৭), (৫১২১), (৫১২৬), (৫১৩২), (৫১৩৫), (৫১৪১), (৫৮৭১), (৭৪১৭)] অতএব, শুধু তিলাওয়াতের বিনিময় গ্রহণ করা অথবা তিলাওয়াতের জন্য কোন দল ভাড়া করা আদর্শ মনীষীদের রীতি ও সুন্নতের খিলাফ।

দ্বিতীয়ত : উপদেশ গ্রহণ ও আখেরাত স্মরণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করতেন। তিনি নিজ পরিবারের মুসলিমদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করতেন, তাদের জন্য ‘আফিয়াত তথা নিরাপত্তা প্রার্থনা করতেন। তিনি সাহাবাদের শিক্ষা দিতেন, যেন তারা কবর যিয়ারতের সময় বলে :
‏السلام عليكم اهل الديار من المؤمنين والمسلمين، وانا ان شاء الله بكم لاحقون، نسال الله لنا ولكم العافية‏
“হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ, তোমাদের উপর সালাম, ইনশাআল্লাহ আমরা অতিসত্বর তোমাদের সাথে মিলিত হবো, আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তার প্রার্থনা করছি।”

[ইবনে মাজাহ: ১৫৩৬] আমাদের জানা মতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করে মৃত ব্যক্তিদের ঈসালে সাওয়াব করেন নি। অথচ তিনি অধিক কবর যিয়ারত করতেন। তিনি ছিলেন মুমিনদের উপর দয়ালু ও মেহেরবান। আর আল্লাহই ভালো জানেন।

সূত্র :
اللجنة الدائمة للبحوث العلمية والافتاء
[আল-লাজনাতুদ দায়েমাহ্‌ লিল বুহুসিল ইলমিয়াহ ওয়াল ইফতা]
“ইলমি গবেষণা ও ফতোয়ার স্থায়ী পরিষদ”
সদস্য
ভাইস-চেয়ারম্যান
চেয়ারম্যান
আব্দুল্লাহ ইবন গুদাইয়ান
আব্দুর রাজ্জাক আফিফী
আব্দুল আযিয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায

তৃতীয় ফতোয়া
প্রশ্ন : কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতের সাওয়াব কি মৃতদের নিকট পৌঁছয়? মৃত ব্যক্তির সন্তান বা যার পক্ষ থেকেই হোক?
উত্তর :
আমরা যতদূর জানি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করে নিকট আত্মীয় বা অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াব করেন নি। তিলাওয়াতের সাওয়াব যদি মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছত বা এর দ্বারা সে কোনভাবে উপকৃত হত, তাহলে অবশ্যই তিনি তা করতেন, উম্মতকে বাতলে দিতেন, যেন তাদের মৃতরা উপকৃত হয়। তিনি ছিলেন মুমিনদের উপর দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। তার পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদিন ও সকল সাহাবায়ে কেরাম তার যথাযথ অনুসরণ করেছেন, Ñআল্লাহ তাদের সকলের উপর সন্তুষ্ট হোনÑ আমাদের জানা মতে তারা কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে ঈসালে সাওয়াব করেন নি। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবাদের আদর্শ অনুসরণ করাই আমাদের জন্য কল্যাণ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
‏اياكم ومحدثات الامور فان كل محدثة بدعة، وكل بدعة ضلالة‏
“খবরদার! তোমরা নতুন আবিষ্কৃত বস্তু থেকে সতর্ক থেকো, কারণ প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বস্তু বিদ‘আত, আর প্রত্যেক বিদ‘আত গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা।” [আবু দাউদ: ৩৯৯৩] তিনি অন্যত্র বলেন :
‏من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد‏
“যে আমাদের এ দ্বীনে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত।”

[বুখারি: ২৫১২, মুসলিম: ৩২৪৮]
তাই আমরা বলি, মৃতদের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা বা করানো জায়েয নয়, এর সাওয়াব তাদের নিকট পৌঁছে না, বরং এটা বিদ‘আত। এ ছাড়া যেসব ইবাদাতের সাওয়াব মৃতদের নিকট পৌঁছে মর্মে বিশুদ্ধ দলিল রয়েছে তা অবশ্য গ্রহণীয়। যেমন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা ও হজ করা মর্মে বিশুদ্ধ দলিল রয়েছে। আর যে সব বিষয়ে কোন দলিল নেই তা বৈধ নয়। তাই প্রমাণিত হল, কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতদের ঈসালে সাওয়াব করা বৈধ নয়, তাদের নিকট এর সাওয়াব পৌঁছায় না, বরং এটা বিদ‘আত। এটাই আলেমদের বিশুদ্ধ অভিমত। আর আল্লাহই ভালো জানেন।

সূত্র :
اللجنة الدائمة للبحوث العلمية والافتاء
[আল-লাজনাতুদ দায়েমাহ্‌ লিল বুহুসিল ইলমিয়াহ ওয়াল ইফতা]
“ইলমি গবেষণা ও ফতোয়ার স্থায়ী পরিষদ”
সদস্য
ভাইস-চেয়ারম্যান
চেয়ারম্যান
আব্দুল্লাহ ইবন গুদাইয়ান
আব্দুর রাজ্জাক আফিফী
আব্দুল আযিয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায

দেখে নিন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কিভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন

কুরআন তিলাওয়াত :

নবী (সাঃ) প্রতিদিন কুরআন থেকে নির্ধারিত একটি পরিমাণ তিলাওয়াত করতেন। কখনই তিনি এর ব্যতিক্রম করেন নি। তিনি তারতীলের সাথে কুরআন পাঠ করতেন। প্রত্যেকটি অক্ষর তার নিজস্ব মাখরাজ (উচ্চারণের স্থান) থেকে সুস্পষ্ট করে উচ্চারণ করতেন এবং প্রতিটি আয়াত পাঠ শেষে ওয়াক্ফ করতেন (বিরতি গ্রহণ করতেন)। তিলাওয়াতের সময় হরফে মদ্ আসলে লম্বা করে পড়তেন। উদাহরণ স্বরূপ তিনি الرحمن الرحيم পাঠ করার সময় মদ-&এর সাথে পড়তেন। তিলাওয়াতের শুরুতে তিনিأَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ পাঠ করতেন। কখনও তিনি এই দু’আটি পাঠ করতেন-

أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْثِهِ

দেখে নিন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কিভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন
                               কুরআন 

‘‘আমি বিতারিত শয়তান, তার ধোঁকা, ফুঁক ও তার যাদু থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি’’।[1] তিনি অন্যের কাছ থেকে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদকে রসূল (সাঃ) কুরআন তিলাওয়াত করার আদেশ দিতেন। তিনি তাঁর সামনে কুরআন পড়তেন। নবী  (সাঃ) তা শুনতেন। এ সময় তাঁর অন্তরের অবস্থা ও একাগ্রতা এমন হত যে, তাঁর উভয় চোখ থেকে অশ্রম্ন প্রবাহিত হত।[2] তিনি দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। ওযূ ছাড়াও তিনি কুরআন পাঠ করতেন। তবে স্ত্রী সহবাস জনিত কারণে অপবিত্র হলে পবিত্রতা অর্জন না করে কুরআন পড়তেন না। তিনি আওয়াজ উঁচু করে সুন্দর সুর দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুগাফ্ফাল লম্বা আওয়াজে তাঁর সামনে কুরআন তিলাওয়াত করার ধরণটি আ-আ-আ (তিনবার) বলার মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী এরূপই বর্ণনা করেছেন।[3] আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুগাফ্ফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত ধরণটি যদি রসূল (সাঃ) এর বাণী-

زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ

‘‘তোমাদের আওয়াজের মাধ্যমে কুরআনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি কর। অর্থাৎ তোমরা সুন্দর আওয়াজের মাধ্যমে কুরআন পড়’’।[4] এবং তাঁর বাণীঃ

مَا أَذِنَ اللهُ لِشَىْءٍ مَا أَذِنَ لِنَبِىٍّ حَسَنِ الصَّوْتِ يتغنى بِالْقُرْآنِ

‘‘আল্লাহ্ তা‘আলা সুন্দর কন্ঠের অধিকারী নবীর কাছ থেকে সুন্দর স্বরে কুরআন তিলাওয়াত যেমনভাবে শুনেন অন্য কোন বস্ত্তকে সে রকমভাবে শ্রবণ করেন না’’[5] এই দুইটি হাদীসকে একত্রিত করলে বুঝা যায় যে, তিনি ইচ্ছা করেই কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজকে উঁচু ও সুন্দর করতেন। নিছক উট চালানোর জন্য স্বীয় আওয়াজ উঁচু করেন নি। বরং কুরআন তিলাওয়াতে তাঁর অনুসরণ করার জন্যই তা করেছেন। অন্যথায় আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুগাফাফাল (রাঃ) কুরআন তিলাওয়াতে তাঁর আওয়াজ উঁচু ও সুন্দর করার ধরণ বর্ণনা করে দেখাতেন না। কুরআন তিলাওয়াতে আওয়াজ উঁচু ও সুন্দর করা দু’ভাবে হতে পারে।

 

মক্কায় এক যুবকের সততা। জানলে আপনিও অবাক হবেন

 যুবকের সততা:

মক্কায় এক যুবক বাস করত। পরহেযগার,
খোদাভীরু, তবে খুবই গরীব। একদিন যুবকটি
জীবিকার উদ্দেশ্যে, মক্কার গলি দিয়ে
হাঁটতে ছিলো। হঠাত সে লক্ষ্য করল-
মনিমুক্তা খচিত গলার একটা হার পরে আছে।
আশে পাশে আর কেউ নেই তাই হারটা উঠিয়ে
নিলো।যুবক হারের মালিকের খোঁজে
হেরেমে এলো।
এমন সময় একটা ঘোষণা তার কানে
এলো-“আমি একটা হার হারিয়েছি। কোন
দয়ালু ভাই পেয়ে থাকলে, আল্লাহর ওয়াস্তে
হারটি ফিরিয়ে দেবেন।”
যুবকটা এগিয়ে গিয়ে বললেন-“আপনার হারটা
দেখতে কেমন, বর্ণনা দিন তো?
বর্ণনা মিলে গেলে,যুবক হারটা মালিকের
কাছে হস্তান্তর করলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল,
লোকটা হার খানা ফিরে পেয়ে একটা টু-
শব্দও করলো না। সোজা গটগট করে হেঁটে
চলে গেলো। যুবককে সামান্য ধন্যবাদ টুকুও
দিল না। যুবক আল্লাহর কাছে দোয়া করল:-
ইয়া আল্লাহ! আমি যদি এই সামান্য কাজটুকু
আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্যই করে থাকি,
আপনি আমার জন্য এর চেয়েও ভালো
প্রতিদান জমা করে রাখুন। আমীন।”

মক্কায় এক যুবকের সততা। জানলে আপনিও অবাক হবেন
                                                       মনিমুক্তা

কিছুদিন পর যুবক রুজি-রোজগারের উদ্দেশ্যে
জাহাজে চড়ে বসল। তাকদীরের এমনই লিখন,
যুবকের জাহাজ পড়লো ঝড়ের কবলে। পুরো
জাহাজ ভেঙে চুর-মাচুর হয় গেলো। হাতের
কাছে যে যা পেলো ওটা ধরেই ভেসে রইলো।
যুবকও একটা কাঠের টুকরা ধরে ভাসতে
ভাসতে একটা দ্বীপে গিয়ে ঠেকল। সেই
দ্বীপে সে একটা মসজিদ খুঁজে পেলো।
যুবকের মন খুশি হয়ে উঠলো। মসজিদে গিয়ে
শোকরানা ও অয়াক্তিয়া নামায আদায় করল।
যুবকের আশ্রয়ের দরকার ছিল কিন্তু তারতো
যাওয়ার আপাতত কোনও জায়গা ছিল না,
ভবঘুরে। মনে মনে মসজিদে থাকার সিদ্ধান্ত
নিলো। সে মসজিদে একটা কুরআন শরীফ
দেখতে পেল। বসে বসে কালামে পাক
তিলাওয়াত করতে শুরু করল। অচেনা যুবককে
পবিত্র কুরআন শরিফ পড়তে দেখে
আশেপাশের সবাই আশ্বাচরযান্বিত হয়ে
চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো।
অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো:-আপনি কুরআন পড়তে
পারেন ?
-জ্বী, পারি।
তারা বললো:-আমাদের কাছে এই কুরআন
কারীম অনেক দিন ধরে পড়ে আছে। আমরা
কুরআন পড়তে পারি না।আমরা এটাকে পরম
যতন রেখে দিয়েছি। এক নাবিকের কাছ
থেকেই আমরা এ কুরআনটা কিনে ছিলাম।
আমাদের এই দ্বীপে আগে একজন ছিলেন,
তিনি এই কুরআন পড়তে পারতেন। ঠিক করা
ছিলো, তিনিই সবাইকে কুরআন শিক্ষা
দিতেন। একবার তিনি হজ্জে গেলেন। আর
ফিরে আসেন নি।এখন আপনি আমাদেরকে,
আমাদের সন্তানদেরকে মেহেরবানী করে
পবিত্র কুরআন শিক্ষা দিন।”
যুবক দ্বীপবাসীদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতে
সম্মতিজ্ঞাপন করল। দ্বীপের বাচ্চাদেরকে
কুরআন কারীম শিক্ষা দিতে লাগল।
তাদেরকে অন্যান্য বিদ্যাও শেখাতে থাকল।
কিছুদিন পর এলাকার মুরুব্বিরা
বললেন-“আমাদের এলাকায় একজন ইয়াতীম
মেয়ে আছে, সর্বগুণে গুণান্বিতা। আপনি কি
তাকে বিয়ে করতে রাজি হবেন ?
-“আমার কোনও আপত্তি নেই”- যুবক লাজুক
মুখে সম্মতি জানাল।
বিয়ে হয়ে গেলো। বাসর রাতে স্ত্রীর সাথে
যুবকের সাক্ষাত হল। যুবক নববধুকে দেখে
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। সে লক্ষ্য করল
তার বিবির গলায় মক্কায় কুড়িয়ে পাওয়া
সেই হারটি ঝুলছে। যুবক বিস্ময়ের সাথে
বিবির কাছে জানতে চাইল-‘এই হার তোমার
কাছে কিভাবে এলো ?
নববধূ লাজুক মুখে উত্তর দিলো-‘আমার আব্বু
সেবার হজে গেলেন। হজ্বের সফরে আমার
জন্য একটি হার কিনলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে
হারটা হারিয়ে গেলো। কিন্তু এক মহত
ব্যক্তির বদান্যতায় হারটা ফিরে পেলেন।
আব্বু সব সময় তার জন্য আল্লাহর দরবারে দু’ আ
করতেন আর বলতেন“ ইয়া আল্লাহ! মক্কার এই
মহত ব্যক্তির মতো আমার মেয়ের জন্য এমন
একজন স্বামী মিলিয়ে দিন”।
যুবকের দু চোখ বেয়ে দরদর করে পানি ঝরতে
লাগল।
ইয়া আল্লাহ্!!! আপনি সবচেয়ে বড়
হিকমতওয়ালা!
আপনার মহিমা বোঝা বান্দার সাধ্য কী!!!!

অর্থ বুঝে | কোরআন তিলাওয়াত | করার গুরুত্ব

বিসমিল্লাহ বলে মদ খেলে মদ কখনো হালাল হয়না, কিন্তু আমরা অনেক সময়ই নিজের মনগড়া যুক্তি খাড়া করে এমন সব কথা বলি, যা বিসমিল্লাহ বলে মদ খাওয়ার সমতুল্য, অথচ আমরা বুঝতে পারি না । এই জন্যই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ ।

অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করার গুরুত্ব
অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করার গুরুত্ব

এই জ্ঞান হলো আল্লাহকে, তাঁর প্রেরিত রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ) কে এবং দ্বীন ইসলামকে সঠিক ভাবে জানা বোঝা এবং মানার জ্ঞান । আর এই জ্ঞান ভান্ডারের একমাত্র উৎস হলো কোরআন আর হাদীস হলো কোরআনের ব্যাখ্যা স্বরূপ । তাই একজন মুসলিমের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো কোরআন হাদীসের জ্ঞান অর্জন করা । আপনারা যারা আরবী ভাষা বোঝেন না, তারা কেন আরবীতে কোরআন পাঠ করেন? কোরআন কি না বুঝে শুধু তিলাওয়াত করার উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছিল?

আপনারা কোরআন তিলাওয়াত করেন ঠিকই । কিন্তু সূরা ইব্রাহীমের চার নম্বর আয়াতের ইঙ্গিত বুঝতে পারেন না । ঐ আয়াতে বলা হয়েছে, “আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারে” । এই আয়াত থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, স্বজাতির ভাষা অর্থাৎ মাতৃভাষাতেই কোরআন পড়তে হবে, এবং এই পড়ার মাধ্যমে কোরআনের আদেশ নিষেধ, হালাল হারাম, হুকুম আহকাম সহ জীবন যাপনের যাবতীয় দিক নির্দেশনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে ।

আবার এটাও ঠিক, কোনো রচনার ভাষান্তর, ভাবান্তর, অনুবাদ অথবা ভাবানুবাদ করতে গেলে শতভাগ বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সম্ভব হয়না । কিন্তু 99% বিশুদ্ধ হলেও সেটা কম কিসে? বাজারে কোরআন অনেক রকম অনুবাদ কিনতে পাওয়া যায় । তার মধ্যে বায়ান ফাউন্ডেশন, ইসলামী ফাউন্ডেশন, মুজিবুর রহমান, আল কোরআন একাডেমী লন্ডন, সৌদি আরবের অনুদিত কোরআনুল কারীম এবং তাওহীদ প্রকাশনীর তাইসিরুল কুরআন এবং তাফহীমুল কোরআন অনুবাদগুলো মোটামুটি বিশুদ্ধ । এতগুলোর মধ্যে আমার পছন্দ পকেট সাইজ তাইসিরুল কোরআন।

তবে যদি আরবী ভাষা শিক্ষা করতে পারেন, আরবীতে পড়ে অর্থ বুঝতে পারেন, সেই প্রচেষ্টা সবচেয়ে উত্তম । আর সেটা সম্ভব না হলে বাংলায় কুরআন পড়ুন । যারা এন্ড্রয়েড ব্যবহার করেন, তারা প্লেস্টোর থেকে কোরআনে অনুবাদের এপস ইনস্টল করতে পারেন ।