জেনে নিন, তায়েফে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপর নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনা

নবুওয়াতের দশম বছর ছিল আল্লাহর রাসূলের (সা.) জন্য শোকের বছর। এই বছরে তিনি তার অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক চাচা আবু তালিবকে হারান। অল্প ব্যবধানে হারান তার জীবন সঙ্গিনী সুখে-দুঃখের বিশ্বস্ত সাথী বিবি খাদিজা (রা.)-কে। দু’জন ছিলেন রাসূলের রেসালাতের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দু’ধরনের অবলম্বন এবং সহায়ক শক্তি। হযরত আবু তালিব জাগতিক ও বৈষয়িক দিক দিয়ে কাফের-মুশরিকদের মুকাবিলায় রাসূলের (সা.) জন্যে ছিলেন একটি বিরাট অবলম্বন। বিবি খাদিজা (রা.) বৈষয়কি এবং মানসিক উভয় দিক দিয়েই ছিলেন রাসূলের (সা.) একটি বড় অবলম্বন। এই দু’টো অবলম্বন থেকে বঞ্চিত হবার ফলে মনের উপর বিরাট একটা চাপ সৃষ্টি হওয়া ছিল একান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার। তার উপর কাফের-মুশরিকদের বেপরোয়া আচরণ, অসহায় মনে করে জুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়া ছিল একটা বাড়তি চাপের শামিল। এই পটভূমিতে কুরাইশদের নির্যাতন নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে এবং তাদের ব্যাপারে অনেকটা হতাশ হয়েই আল্লাহর রাসূল (সা.) মক্কা থেকে ৫০ মাইল দূরে তায়েফে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্যে। কারণ এই সময়ে কুরাইশ সর্দারদের নেতৃত্বে মক্কার কাফের-মুশরিকগণ বাধা প্রতিবন্ধকতার মাত্রা যেভাবে তীব্র থেকে তীব্রতর করছিল তাতে তারা দাওয়াত কবুল করবে এ আশা করার সুযোগ তো ছিলই না উপরন্তু এ দাওয়াতের কাজ কোন ক্রমেই চলতে দিবে না এটাই অনুমিত হচ্ছিল অবস্থার প্রেক্ষেতে।

নবী (সা.)-এর তায়েফ সফরের লক্ষ্য ছিল ওখানকার লোকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা সেই সাথে তায়েফের প্রভাবশালী শক্তিশালী গোত্র বনী সাকিফকে অন্তত এতটুকুতে রাজী করাবেন যে তারা সেখানে নবীকে (সা.) আশ্রয় দেবে এবং ইসলামের দাওয়াতের ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। মক্কা থেকে সুদূর তায়েফের এই সফরে রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন জায়েদ ইবনে হারেছা। তিনি এই সফরে বিশ দিন পর্যন্ত তায়েফবাসীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেন এবং আবদে ইয়ালীলের সাথে সাক্ষাতের পর সেখানে দশ দিন অবস্থান করেন।

তায়েফের নেতৃত্ব ছিল আমর বিন ওমাইর বিন আওফের তিন পুত্র আবদে ইয়ালীল, মাসউদ ও হাবিবের হাতে। এদের কোন একজনের ঘরে কুরাইশ বংশের সুফিয়া বিনতে জুমাহী নাম্নী এক মহিলা ছিল। রাসূল (সা.) তায়েফের এই তিনজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে দেখা করে তদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। তাদের উদ্দেশ্যে আরো বলেন, আমি ইসলামের কাজে আপনাদের সহযোগিতা পাওয়ার আশায় এখানে এসেছি। সেই সাথে আমার কওমের যারা আমার বিরোধিতা করছে তাদের মোকাবিলায় আমি আপনাদের সাহায্য-সহযোগিতাও কামনা করি। রাসূলে পাক (সা.)-এর বক্তব্য শুনার পর তাদের একজন বললো, আল্লাহ যদি তোমাকে নবী বানিয়ে থাকেন তাহলে আমি কাবা ঘরের পর্দা ছিঁড়ে ফেলবো। অপর একজন ঠাট্টার স্বরে বললো আল্লাহ বুঝি তোমাকে ছাড়া নবী বানানোর জন্যে আর কোন লোক খুঁজে পাননি। তৃতীয় ব্যক্তি বললো, আমি কিছুতেই তোমার সাথে কথা বলবো না, কারণ যদি তুমি সত্যিই নবী হয়ে থাক তাহলে আমার মতো লোকের পক্ষে তোমার কথার জবাব দেয়া মানায় না কারণ তুমি তো আমার তুলনায় অনেক মহান। আর যদি তুমি আল্লাহর নাম নিয়ে মিথ্যা দাবি করে থাক, তাহলে তুমি এমন যোগ্য নও যে, তোমার সাথে কথা বলা যায়। তাদের তিনজনের কথার ধরন প্রকৃতি দেখে আল্লাহর রাসূল (সা.) নিশ্চিত হলেন যে, এদের থেকে ভাল কিছুই আশা করা যায় না। তাই তিনি উঠে পড়লেন। তবে বিদায়ের পূর্বে তিনি তাদের প্রতি একটি অনুরোধ রাখলেন। তাহলো তোমরা আমার সাথে যে ব্যবহার করছো তাতো করছোই কিন্তু তোমরা অন্তত আমার এখানে আসার কথাটা গোপন রাখ, প্রচার করো না। তাদেরকে এই ব্যাপারে অনুরোধ করার মূল কারণ ছিল কুরাইশগণ এটা জানলে আরো বেপরোয়া এবং সাহসী হয়ে উঠবে। তাদের বিরোধিতা আরও বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু তায়েফের ঐ পাষান্ড নেতৃবৃন্দ সেই অনুরোধটুকুও রাখল না। বরং তাদের সমাজের দুষ্ট ও গুন্ডা প্রকৃতির যুবকদেরকে লেলিয়ে দিল মুহাম্মদ (সা.)-কে উত্ত্যক্ত করার জন্যে। তায়েফের ধুরন্ধর ঐ নেতৃবর্গ এটা ধরে নিয়েছিল যে নবী মুহাম্মদ (সা.) -এর সুদর্শন চেহারা দেখে, তার মুখের সুন্দর কথা শুনে যুবসমাজ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেতে পারে। অতএব সেই পরিস্থিতি যাতে আদৌ সৃষ্টি হতে না পারে এ জন্যেই তারা এই নোংরা কৌশল অবলম্বন করে যাতে নবী মুহাম্মদ (সা.) কথা শোনার সুযোগ কারো জন্যেই না হতে পারে।

তায়েফের নেতৃবৃন্দের নির্দেশ মোতাবেক গুন্ডা ও দুষ্ট প্রকৃতির যুবকেরা রাসূলের (সা.) পিছে লাগল। প্রথমে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকল, ঠাট্টা-মশকারা করতে শুরু করল। তাদের হৈ চৈ শুনে লোক জড়ো হতে লাগল এবং আল্লাহর রাসূলকে (সা.) তাড়া করে একটি বাগান পর্যন্ত নিয়ে ছেড়ে দিল। উক্ত বাগানের মালিক ছিল উতবা বিন রাবিয়া (রা.) ও শায়বা বিন রাবিয়া (রা.)।

রাসূলে পাক (সা.) তার এই তায়েফ সফরকালীন সময়ে বনী সাকিফের দলপতি ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা সাক্ষাতের মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত পেশ করেন। কিন্তু কেউ তার এ আহবানে সাড়া দিল না। মুহাম্মদ (সা.) তাদের যুবকদের বিগড়িয়ে দিতে পারেন, এ আশঙ্কায় তারা বললো, হে মুহাম্মদ (সা.) তুমি আমাদের শহর থেকে বেরিয়ে যাও। পৃথিবীর অন্য কোথাও তোমার বন্ধু থাকলে তার সাথে গিয়ে মিলিত হও। অতঃপর তারা তাদের ভবঘুরে যুবকদেরকে লেলিয়ে দিল মুহাম্মদ (সা.)-এর উপরে। তারা চিৎকার করে এবং গালাগালি করে লোক জড়ো করে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর ঢিল পাথর নিক্ষেপ শুরু করে দিল। পাষন্ড ঐ গুন্ডা প্রকৃতির গোলাম ও যুবকেরা তাক করে রাসূলের (সা.) পায়ের গোড়ালি এবং টাকনুতে পাথর মেরে মেরে আল্লাহর রাসূলের (সা.) শরীরকে অসাড় করে তোলে। তারা রাস্তার দু’ধারে পাথর হাতে দাঁড়িয়ে যায়। রাসূলের (সা.) চলার সাথে সাথে পাথরের পর পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে। রক্ত ক্ষরণের ফলে রাসূল (সা.) ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লে তারা ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আবার পাথর ছুড়তে শুরু করে। রক্ত ঝরতে ঝরতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে জমাট রক্তে রাসূলের পায়ের জুতা আটকে যায় এবং খুলতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। এক পর্যায়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) কিছু সময়ের জন্যে বেহুঁশ হয়েও যান। রাসূলের বিশ্বস্ত সাথী হযরত যায়েদ (রা.) নিজেকে ঢালতুল্য বানিয়ে তাকে হেফাজতের চেষ্টা করেন। পাথরের আঘাতের পর আঘাতে এক পর্যায়ে হযরত যায়েদের (রা.) মাথা ফেটে যায়।

অবশেষে আল্লাহর রাসূল (সা.) তায়েফ থেকে বেরিয়ে পড়লেন এবং ঐ সব দুষ্ট গুন্ডা পাষন্ড প্রকৃতির লোকেরাও ফিরে গেল। আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত নবী মুহাম্মদ (সা.) ওতবা এবং শায়বার আংগুর বাগানের প্রাচীরের গা ঘেঁষে আংগুর লতার ছায়ার নিচে বসে পড়েন এবং তার রবের দিকে মুখ করে এক মর্মস্পর্শী ভাষায় দোয়া করলেন যা সীরাতের বিভিন্ন কিতাবে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে :

‘‘হে আল্লাহ আমি তোমারই দরবারে নিজের অসহায়ত্বের এবং মানুষের দৃষ্টিতে আমার মর্যাদাহীনতার অভিযোগ পেশ করছি। এ তুমি কার কাছে আমাকে সোপর্দ করছো? এমন অপরিচিত বেগানাদের কাছেই কি আমাকে সোপর্দ করছো যারা আমার সাথে এমন কঠোর ও নিষ্ঠুর আচরণ করবে। অথবা এমন কার কাছে যাকে তুমি আমার উপর জয় লাভ করার শক্তি দিয়েছো। যদি তুমি আমার উপর অসন্তুষ্ট না হয়ে থাক, তাহলে আমি কোন বিপদের পরোয়া করি না। কিন্তু যদি তোমার পক্ষ থেকে আমি নিরাপত্তা লাভ করি তাহলে তা হবে আমার জন্যে অধিকতর আনন্দদায়ক। আমি পানাহ চাই তোমার সত্তার সে নূরের কাছে যা অন্ধকারে আলো দান করে এবং দুনিয়ায় ও আখেরাতের সব কিছু সুবিন্যস্ত ও সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করে। তোমার গজব ও শাস্তির যোগ্য হয়ো থেকে তুমি আমাকে রক্ষা কর। আমি যেন তোমার মর্জির উপর রাজি থাকতে পারি আমাকে সে তাওফিক দাও। আর তুমিও আমার উপর সদা রাজি থাক। তুমি ছাড়া আর কোন শক্তি নেই।’’

রহমাতুল্লিল আ’লামীন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর এই মর্মস্পর্শী দোয়া হৃদয় নিংড়ানো আবেগ আপস্নুত কণ্ঠের দোয় আল্লাহর দরবারে মকবুল হয়। জালেম তায়েফবাসীর এহেন অপকর্মের জন্যে রাসূল (সা.) চাইলে দু’দিক থেকে তাদের পাহাড় চাপা দিয়ে ধ্বংস করে দিতেও তারা প্রস্ত্তত বলে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত ফেরেশতা নবী মুহাম্মদকে (সা.) এই মর্মে অবহিত করেন। বোখারী, মোসলেম ও নাসায়ী হাদীস গ্রন্থে হযরত আয়েশার (রা.) বরাত দিয়ে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে;

হযরত আয়েশা (রা.) হুজুর (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ ওহুদের যুদ্ধের চেয়েও কি কোন কঠিন অবস্থার সম্মুখীন আপনি কখনও হয়েছেন? জবাবে রাসূল (সা.) তায়েফের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আমি (তায়েফবাসীর নির্মম অত্যাচারের ফলে) এতটাই পেরেশান হয়ে পড়েছিলাম যে কোন দিকে যাব ঠিক পাচ্ছিলাম না। তাই যে দিকে তাকাতাম সেদিকেই ধাবিত হতাম। এ অবস্থা থেকে আমি রেহাই না পেতেই হঠাৎ দেখলাম যে, আমি ‘কারনোস সায়ালেব’ নামক স্থানে আছি। উপরে তাকিয়ে দেখি একখন্ড মেঘ আমার উপর ছায়া দান করছে। উক্ত মেঘ খন্ডের মদ্যে হযরত জিব্রাইলকে (আঃ) দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে সম্বোধন করে বললেন, আপনার কওম আপনাকে যা কিছু বলেছে, আপনার দাওয়াতের জবাব তারা যেভাবে দিয়েছে, আল্লাহ তায়া তা সবই অবগত আছেন। তিনি আপনার জন্যে পাহাড়সমূহের ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়েছেন, আপনি আপনার ইচ্ছামত যে কোন হুকুম তাদের করতে পারেন। অতঃপর পাহাড়ের ফেরেশতাগণ আমাকে সালাম করে বললেন, হে মুহাম্মদ (সা.) আপনার কওমের বক্তব্য এবং আপনার দাওয়াতের জবাব কিভাবে তারা দিয়েছে আল্লাহ তা শুনেছেন। আমি পাহাড়ের ফেরেশতা, আপনার রব আমাকে আপনার খেদমতে পাঠিয়েছেন যাতে আপনি আমাকে হুকুম করেন। বোখারীতে কথাটি এভাবে এসেছে, হে মুহাম্মদ আপনি যা কিছু চান বলার এখতিয়ার আপনার আছে। আপনি চাইলে তাদের উপর মক্কার দু’দিকের পাহাড় একত্র করে চাপিয়ে দিব। নবী (সা.)-এর জবাবে বলেন না-না। আমি আশা করি আল্লাহ তায়ালা তাদের বংশে এমন লোক পয়দা করবেন যারা লাশরীক এক আল্লাহর দাসত্ব করবে।

একটু আগে আমরা উল্লেখ করেছি হুজুর (সা.) ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় ওতবা বিন রাবিয়া এবং শায়বার আঙ্গুরের বাগানের প্রাচীর সংলগ্ন আঙ্গুর লতার ছায়ার নিচে বসেছিলেন। তখন তায়েফের দুই সর্দার ঐ বাগানে রাসূল (সা.) এ অবস্থায় দেখতে পায় এবং তাদের মনে হুজুরের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ ও সহানুভূতির সৃষ্টি হয়। এখানে একথারও উল্লেখ আছে যে, বনী জুহামের যে মহিলাটি তায়েফের জনৈক সর্দারের বাড়িতে ছিল সেও হুজুরের সাথে দেখা করে। নবী করিম (সা.) তাকে বললেন, তোমার শ্বশুরকুলের লোকেরা আমার সাথে এ কী আচরণ করল? ওতবা বিন রাবিয়া ও শায়বা ইতোমধ্যে তাদের এক ঈসায়ী গোলামের মাধ্যমে রাসূলের (সা.) জন্যে একটি বড় পাত্রে করে কয়েক গোছা আঙ্গুর পাঠালো এবং মুহাম্মদকে (সা.) তা খাওয়ার জন্যে অনুরোধ করতে বলল। ঐ গোলামটির নাম ছিল আদ্দাস। সে রাসূলকে (সা.) উদ্দেশ্য করে বলল, খোদার কসম এদেশে তো এ কালেমা বলার কেউ নেই। হুজুর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথাকার অধিবাসী? সে বলল, আমি ঈসায়ী এবং নিনাওয়ার অধিবাসী। এরপর রাসূল (সা.) তার কাছ থেকে জানতে চাইলেন, তুমি কি মর্দে সালেহ ইউনুস বিন মাত্তার বস্তির লোক। আদ্দাস বলল, আপনি তাকে কিভাবে জানেন? হুজুর (সা.) উত্তরে বললেন, তিনি তো আমার ভাই, তিনিও নবী ছিলেন, আমিও নবী। একথা শুনামাত্র আদ্দাস নবী করিম (সা.)-এর প্রতি ঝুঁকে পড়ল এবং তার হাত, পা, মাথায় চুমু দিতে লাগল এবং কালেমায় শাহাদাত উচ্চারণ করে ঈমানের ঘোষণা দিল।

দূরে থেকে রাবিয়ার (রা.) পুত্রদ্বয় ওতবা ও শায়বা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করে এবং একে অপরকে বলতে থাকে দেখ তোমাদের নিজস্ব গোলামকেও এ লোকটি বিগড়ে দিল। আদ্দাস নবী (সা.)-এর নিকট থেকে ফিরে আসার পর তাকে বলা হল, তোমার কি হল যে তার মাথা ও হাত পায়ে চুমু দিতে লাগলে? সে তার মালিকদের সম্বোধন করে বলল, প্রভু আমার! তার চেয়ে ভাল মানুষ এই পৃথিবীতে আর নেই। তিনি আমাকে এমন এক বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন, যা নবী ব্যতীত আর কেউ জানতে পারে না, জানার কথা নয়। তারা তাদের গোলাম আদ্দাসকে বলল, তোমার দীন থেকে ফিরে যেয়ো না। তার দীন থেকে তোমার দীন উত্তম। তায়েফে আল্লাহর রাসূল (সা.) এসেছিলেন মক্কাবাসির ব্যাপারে হতাশ হয়ে। কিন্তু সেই তায়েফের লোকেরা তার সাথে যে ব্যবহার করল তার কিঞ্চিৎ বর্ণনা একটু আগেই আমরা করেছি যা আল্লাহর রাসূলের (সা.) নিজের জবানীতে, ওহুদের চেয়েও ভয়াবহ। এরপর রাসূলের (সা.) সামনে তার নিজের জন্মস্থান মক্কায় ফিরে আসার কোন বিকল্প ছিল না। কিন্তু কিভাবে ফিরে যাবেন সে বিষয়ে তাকে ভাবতে হয়েছে, অনেকবার। তিনি তায়েফ থেকে ফেরার পথে নাখলা নামক স্থানে কিছু দিন অবস্থান করেন। মক্কায় কি করে, কিভাবে ফিরে যাবেন এ নিয়ে রাসূলের (সা.) মনে ছিল দারুণ পেরেশানী। কারণ তায়েফের ঘটনা মক্কাবাসীর কাছে পৌঁছার পর তাদের সাহস আরো বেড়ে যাওয়ার কথা। এই পেরেশানীসহ আল্লাহর রাসূল (সা.) মক্কায় ফিরে যাওয়ার উপায় উদ্ভাবনের চিন্তাভাবনায় নিমগ্ন। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল (সা.) নামাযরত অবস্থায় কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন। এ সময়ে জ্বীনদের একটি দল এ দিক দিয়ে আসার পথে রাসূলের (সা.) কণ্ঠের এই তেলাওয়াত শুনে আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) প্রতি ঈমান আনে এবং নিজেদের কওমের কাছে গিয়ে এর দাওয়াত দেয়া শুরু করে দেয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর নবীকে এই খবরটি প্রদান করেন অহির মাধ্যমে। যার লক্ষ্য ছিল রাসূলের (সা.) মনে সান্ত্বনা প্রদান করা। মানুষ নবীর এই দাওয়াত প্রত্যাখান করলেও জ্বীনদের একটি অংশ এ দাওয়াত কবুল করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে এটা প্রচার করাও শুরু করে দেয়।

নাখলায় অবস্থানকালে আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন মক্কায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন, তখন তার সফর সঙ্গী হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনি কিভাবে মক্কায় ফিরে যাবেন, তারা তো আপনাকে সেখান থেকে বের করেই দিয়েছে। রাসূল (সা.) যায়েদ বিন হারেসাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি যে অবস্থা দেখছো আল্লাহ এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। তিনিই তো তার দীনের সহায় ও তাঁর নবীকে বিজয়ী করতে সক্ষম। এরপর আল্লাহর রাসূল (সা.) মক্কায় ফিরে যাবার কৌশল নির্ধারণের চিন্তাভাবনা করেন।
হেরায় পৌঁছার পর তিনি আবদুল্লাহ বিন আল ওরায়কেতকে পর পর তিনজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির কাছে পাঠান তারে আশ্রয় এবং সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়ার জন্যে। প্রথমে আবদুল্লাহ বিন পাঠানো হল আখনাস বিন শুরায়েকের নিকট যেন সে রাসূলকে (সা.) আশ্রয় প্রদান করে। আখনাস বিন শরায়েক বলল, সে কুরাইশদের সাথে বন্ধুত্বের চুক্তিতে আবদ্ধ থাকার কারণে আশ্রয় দিতে পারবে না। অতঃপর হুজুর আবদুল্লাহ বিন ওরায়কেতকে সুহাইল বিন আমরের নিকট পাঠান। তার পক্ষ থেকে বলা হল বনি আমার বিন লুসাই বনি কা’বের মোকাবিলায় তো কাউকে আশ্রয় দিতে পারে না। এরপর রাসূল (সা.) বনি আবদে মানাফের একটি শাখা বনি নওফেলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মুতয়েম বিন আদির নিকট আবদুল্লাহ বিন ওরায়কেত পাঠালেন।

আমাদের মনে থাকার কথা কুরাইশের যে পাঁচজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি শিআবে আবি তালিবের বন্দী জীবনের অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে মুতয়েম বিন আদি তাদেরই একজন। আবদুল্লাহ বিন ওরায়কেত তার নিকট গিয়ে বললেন, মুহাম্মদ (সা.) তোমার কাছে জানতে চেয়েছেন, তুমি কি তাকে আশ্রয় দিতে রাজি আছ যাতে তিনি তার রবের পয়গাম পৌঁছাতে পারেন। জবাবে মুতয়েম বিন আদি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বলল, তাকে মক্কায় আসতে বল। অতএব রাসূল (সা.) শহরে গিয়ে বাড়িতেই রাত কাটালেন। সকালে মুতয়েম তার পুত্রদেরকে অস্ত্র সজ্জিত করে হুজুরকে (সা.) হারাম শরীফে নিয়ে যায় এবং হুজুরকে (সা.) তাওয়াফ করার জন্যে অনুরোধ করে। হুজুরের (সা.) তওয়াফের সময় মুতয়েম ও তার পুত্রগণ তার নিরাপত্তার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকে। এ অবস্থা দেখে আবু সুফিয়ান আবদুল্লাহ বিন মুতায়েম (রা.) ও তার সন্তানদেরকে জিজ্ঞাস করল, তোমরা কি আশ্রয়দাতা না তার আনুগত্যকারী? মুতয়েম বলল, না শুধু আশ্রয় দানকারী। অতঃপর আবু সুফিয়ান (রা.) বলল, তোমাদের আশ্রয় ভঙ্গ করা যায় না, তোমরা যাকে আশ্রয় দিয়েছ আমরাও তাকে আশ্রয় দিয়েছি।

মুতয়েম বিন আদির এই বদান্যতা আল্লাহর রাসূল (সা.) মনে রেখেছিলেন। তাই বদর যুদ্ধ শেষে বন্দীদের ব্যাপারে বলেছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে মুতয়েন (রা.) যদি বেঁচে থাকত আর এই লোকদের জন্যে সুপারিশ করতো তাহলে আমি এদেরকে ছেড়ে দিতাম। মুতয়েম বিন আদি (রা.) সম্পর্কে আরো জানা যায়, রাসূল (সা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.) দু’জনের কাছে তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সেই বিশ্বাসেই হযরত নবী করিম (সা.) মক্কায় ফিরে যাবার জন্যে যে তিনজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কথা চিন্তা করেছিলেন, তার মধ্যে মুতয়েম বিন আদিও শামিল ছিল। অন্য দু’জন তাদের চুক্তিবদ্ধতার কারণে রাজি হতে পারেনি। কিন্তু মুতয়েম বিন আদি রাজি হয়ে যান।
এখানে লক্ষ্যণীয় মক্কার পরিস্থিতিকে চরম প্রতিকূল মনে করে রাসূল (সা.) তায়েফ গেলেন। তায়েফের জমিনে পাষাণ দুর্বৃত্তদের চরম দুর্ব্যবহার ও নির্মম জুলুম নির্যাতনের মুখে আবার মক্কায় ফিরে আসার জন্যে যে কৌশলী ভূমিকা অবলম্বন করলেন তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত।

এখানে একদিকে আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা ও ভরসা, যে তিনি তার দীনের বিজয়ের পথ সুগম করবেনই; চরম প্রতিকূলতাকে তিনি অবশ্যই অনুকূল বানাতে সক্ষম। এ আস্থা এ ভরসাই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বাস্তব কর্মকান্ডের মাধ্যমে। সেই সাথে ঈমান না আনলেও কিছু মানুষের মনে সত্যের স্বীকৃতি থাকতে পারে, সত্যের পথিকদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সাহায্য সহযোগিতা করতে পারে। এ সাহায্য সহযোগিতা আদায় করে নেয়ার মত কর্মকৌশল উদ্ভাবনে দায়ীকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত চেষ্টা তদবির করতে হবে। প্রান্তিক চিন্তা বা চরমপন্থার স্থান যেহেতু ইসলামে নেই, এ জন্যেই সর্বশেষ নবীর (সা.) মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সংলাপ, সমঝোতা ও সহযোগিতামূলক কর্মপন্থা গ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তায়েফ থেকে মক্কা ফেরার ক্ষেত্রে গৃহীত এই কর্মকৌশলের মাধ্যমে।
লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, আমীর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, প্রকাশিত নিবন্ধটি তার লেখা রাসূলুল্লাহর মক্কা জীবন গ্রন্থ থেকে সংকলিত। উল্লেখ্য, লেখক স্বৈরাচারি শাসকের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে বন্দী আছেন।

জেনে নিন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কবরের উপর খেজুরের ডাল পুঁতে ছিলেন কেন?

হযরত মুহম্মদ (সাঃ) একদিন দু‘টি কবরের শাস্তি জানতে পেরে একখানা খেজুরের ডাল দুই টুকরা করে দু’টি কবরে গেড়ে দেন। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এরূপ করলেন কেন? তিনি বললেন, হয়ত ডাল দু’টি শুকানো পর্যন্ত তাদের শাস্তি হালকা হয়ে থাকবে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৩৮)। কিন্তু তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ তাদের শাস্তি হালকা হয়েছিল রাসূল (ছাঃ)-এর বিশেষ সুপারিশের জন্য। কাঁচা ডালের জন্য নয়। যা ছহীহ মুসলিমে জাবের (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কাজেই খেজুরের কাঁচা ডাল বা অন্য কোন কাঁচা ডাল গেড়ে কবরের শাস্তি হালকা হবে বলে ধারণা করা একেবারেই ভ্রান্ত।

কেননা যদি বিষয়টি তাই হত তাহলে তিনি ডালটি চিরে ফেলতেন না। কেননা তাতে তো ডালটি দ্রুত শুকিয়ে যাবার কথা। আসল কারণ ছিল ঐ কবর দু’টিকে ঐ ডাল দ্বারা চিহ্নিত করা যে, তিনি তাদের জন্য সুপারিশ করেছেন (আলবানী, মিশকাত ১/১১০ পৃঃ; দ্রঃ ছালাতুর রাসূল ২৪২ পৃঃ)।

ছুমামাহ কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যে কারনে ক্ষমা করলেন

ছুমামাহ কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যে কারনে ক্ষমা করলেন

আবু  হুরায়রা  (রা:)  হ’তে  বর্ণিত  তিনি  বলেন,  একবার  রাসূল  (সাঃ) নাজদের দিকে কিছু অশ্বারোহী (সৈন্য) পাঠালেন। তারা বনী হানীফা গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে ধরে আনল। তার নাম ছুমামাহ বিন উছাল।সে ইয়ামামাবাসীদের সরদার। তারা তাকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখল।

রাসূল (সাঃ) তার কাছে আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তুমি কি মনে করছ’? সে বলল, ‘হে মুহাম্মাদ! আমার ধারণা ভালই। যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তাহ’লে অবশ্যই আপনি একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর  যদি আপনি অনুগ্রহ করেন, তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপরই অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি মাল চান, তাহ’লে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা আদায় করা হবে’। তার কথা শুনে রাসূল (সাঃ) তাকে (সেদিনের মত তার নিজের অবস্থার উপর) ছেড়ে দিলেন।

অতঃপর পরের দিন নবী করীম (সাঃ) তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তোমার কি মনে হচ্ছে’? সে জবাবে বলল, ‘তাই মনে হচ্ছে, যা আমি আপনাকে পূর্বেই বলেছি। যদি আপনি আমার প্রতি মেহেরবানী করেন, তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর মেহেরবানী করবেন। আর যদি আপনি হত্যা করেন, তাহ’লে একজন খুনী লোককে হত্যা করবেন। আর যদি মাল-সম্পদ চান, তাহ’লে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা দেয়া হবে’।

রাসূল (সাঃ) আজও তাকে (নিজের অবস্থার উপর) ছেড়ে দিলেন। এভাবে রাসূল (সাঃ) তৃতীয় দিনে  তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে ছুমামাহ! তোমার কি মনে হচ্ছে’? জওয়াবে সে বলল, ‘আমার তাই মনে হচ্ছে, যা আমি পূর্বেই আপনাকে বলেছি।যদি আপনি আমার   প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করেন, তাহ’লে একজন কৃতজ্ঞ  ব্যক্তির উপরই অনুকম্পা করবেন। আর যদি আপনি  আমাকে হত্যা করেন, তাহ’লে একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি মাল-সম্পদ চান, তাহ’লে যতটা ইচ্ছা চাইতে পারেন, তা দেয়া হবে’।

অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘তোমরা ছুমামাহকে ছেড়ে দাও’! (তাকে ছেড়ে দেওয়া হ’ল)।

অতঃপর সে মসজিদের নিকটবর্তী একটি খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করল। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করে বলে উঠল:

‘আশহাদু আললা ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আনণা মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু’।

‘হে মুহাম্মাদ! আল্লাহ্‌ কসম! পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারা অপেক্ষা আর কারও চেহারা আমার নিকট অধিক ঘৃণ্য ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারা আমার কাছে সবচেয়ে বেশী প্রিয় হয়ে গেছে।আল্লাহ্‌ কসম! (ইতিপূর্বে) আপনার দ্বীন অপেক্ষা অধিক অপ্রিয় দ্বীন আমার কাছে আর কোনটিই ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দ্বীনই আমার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় হয়ে গেছে। আল্লাহ্‌ কসম! (এর আগে) আপনার শহরের চেয়ে অধিক ঘৃণ্য শহর আর কোনটিই আমার কাছে ছিল না।কিন্তু এখন আপনার শহরটিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে গেছে।আপনার অশ্বারোহীরা আমাকে এমন অবস্থায় ধরে এনেছে, যখন আমি ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। এখন আপনি আমাকে কি করতে হুকুম দিচ্ছেন?

রাসূল (সাঃ) তাকে সুসংবাদ শুনালেন এবং ওমরাহ পালনের আদেশ করলেন।এরপর যখন তিনি মক্কায় পৌছলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, তুমি না কি বেদ্বীন হয়ে গেছ? তিনি জওয়াবে বললেন, ‘তা হবে কেন; বরং আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি।আর আল্লাহ্‌ কসম! রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে ইয়ামামা হ’তে আর একটি গমের দানাও আসবে না’

(বুখারী হা/৪৬২, মুসলিম হা/১৭৬৪, আলবানী, মিশকাত হা/৩৯৬৪, ‘জিহাদ’অধ্যায়, ‘যুদ্ধবন্দীদের বিধান’অনুচেছদ) ।

 শিক্ষা:

উত্তম আচরণ ও ক্ষমার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। এজন্যই বলা হয়, ক্ষমাই উত্তম প্রতিশোধ। মহান আল্লাহ্‌ বলেন, ‘মন্দকে ভাল দ্বারা মোকাবেলা কর, ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হবে’ (হা-মীম সাজদাহ ৩৪) ।

জেনে নিন | কেন আল্লাহ তা‘আলা সাতটি জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন (ভিডিও সহ)

জেনে নিন | কেন আল্লাহ তা‘আলা সাতটি জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন (ভিডিও সহ)

আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। উদ্দেশ্য হল মানুষ এক আল্লাহর দাসত্ব করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না, সার্বিক জীবন একমাত্র ওহীর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করবে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদর্শকেই একমাত্র আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করবে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষে মানব জাতির জন্য ইসলামকে একমাত্র দ্বীন হিসেবে মনোনীত করে তার যাবতীয় বিধি-বিধান ওহী মারফত জানিয়ে দিয়েছেন। পথ প্রদর্শক হিসেবে যুগে-যুগে নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আনুগত্যশীল বান্দাদের সম্মানিত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন জান্নাত। আর অমান্যকারীদের লাঞ্চিত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন জাহান্নাম। মৃত্যুর পরেই মানুষের অবস্থান স্থল নির্ধারিত হবে। সৎকর্মশীল হলে জান্নাতে এবং অসৎকর্মশীল হলে জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে। জান্নাতের সূখ যেমন- মানুষের কল্পনার বাইরে। জাহান্নামের শাস্তিও তেমনি মানুষের কল্পনার বাইরে। আসুন জেনে নিই কেন আল্লাহ তায়ালা সাতটি দোজখ সৃষ্টি করেছেন।

ভিডিওঃ-

পবিত্র শবে বরাতের রজনীতে মহানবী (সা.) যেসব আমল করেছেন।

পবিত্র শবে বরাতের রজনীতে মহানবী (সা.) যে সব আমল করেছেন।

আল্লাহ তা’লা যেমন বিশেষ কিছু ঋতুকে ফল-ফসলে সমৃদ্ধ করেছেন ঠিক তেমনি শেষ উম্মতকেও দিয়েছেন অল্পসময়ে বেশি লাভজনক আমল করে নেওয়ার সুযোগ।

এতে করে মানবজীবনে স্বল্প দৈর্ঘতার দুর্বলতা দূর হয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে অনেক অবাক করা বিষয় আমরা লক্ষ করি। আদি যুগে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে সম্পাদন করা অনেক কাজই খুব স্বল্প সময়ে সম্পাদন করা যায়। ঠিক সেভাবে শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর উসিলায় আমরা পেয়েছি পরকালের প্রভূত কল্যাণ লাভের অনন্য সব মৌসুম। এগুলোতে অল্পসময়ে আমল করে অভানীয় পারলৌকিক কল্যাণ লাভ করা সম্ভব। এভাবে মহান আল্লাহ আমাদের ওপর দয়া করেছেন। এই সুযোগগুলোকে অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়া চরম মূর্খতার পরিচায়ক।

পবিত্র শবে বরাতের রজনীতে মহানবী (সা.) যে সব আমল করেছেন।
পবিত্র শবে বরাতের রজনীতে মহানবী (সা.) যে সব আমল করেছেন।

হাদিসের ভাষ্যমতে এমনই একটি মূল্যবান মৌসুম হলো- শাবান মাসের মধ্য রজনী। এই মহিমান্বিত রজনীর ডাকনাম- ‘শবে বরাত।’

শাবান হলো পবিত্র রমজানের পূর্ববর্তী মাস। গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো কাজের আগে প্রস্তুতি গ্রহণ সংশ্লিষ্ট কাজটিকে সুন্দরভাবে পালনে সহায়তা করে। তাই পবিত্র সিয়াম সাধনা পালনের একমাস আগ থেকে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) সওম পালনের অনুশীলন করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘শাবান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে নবীকে (সা.) এত বেশি নফল সওম আদায় করতে দেখিনি।’ সহিহ বোখারি ও মুসলিম

এক রাতে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজ আরম্ভ করলেন এবং এত দীর্ঘ সেজদা করলেন যে, হজরত আয়েশার (রা.) আশঙ্কা হলো, তিনি হয়তো আর দুনিয়াতে নেই। তাই তিনি উঠে নবী করিম (সা.)-এর পায়ের আঙ্গুল নাড়া দিলেন। বুঝলেন, তিনি জীবিত আছেন। এতে তার সান্তনা লাভ হলো। নামাজা শেষ করে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি কি জানো এটি কোন রাত? হজরত আয়েশার উত্তর, আল্লাহ এবং তার রাসূলই (সা.) ভালো জানেন। এবার নবী (সা.) বললেন, এটি শাবানের পনেরোতম রজনী। এ রাতে মহান আল্লাহ নিজ বান্দার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দান করেন এবং ক্ষমা প্রার্থীকে ক্ষমা করেন। রহমতপ্রার্থীকে রহম করেন। আর বিদ্বেষীদের নিজ বিদ্বেষে ছেড়ে রাখেন। -শোয়াবুল ঈমান ও তারগিব-তারহিব 

এক শবে বরাতে হজরত আয়েশা (রা.) হজরত রাসূলুল্লাহকে (সা.) ঘরে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে মদিনার করস্থান ‘বাকিতে’ তাকে পেলেন। নবী (সা.) তাকে দেখে বললেন, শাবানের মধ্যরজনীতে আল্লাহ দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং বনী কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন।’

উল্লেখ্য তদানীন্তনকালে উল্লিখিত গোত্রে বিপুল পরিমাণ বকরি ছিলো। নবী (সা.) নিজ কথায় মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যাধিক্য বুঝাতে চেয়েছেন।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রায় সব মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখতেন। বিশেষ করে শাবান মাসে ১ থেকে ২৭ তারিখে তরিখে তার রোজা রাখার বিশেষ আমল দেখা গিয়েছে। সে হিসেবে শাবানের ১৫ তারিখেও তিনি রোজা রেখেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ ও শোয়াবুল ঈমানে এই সংক্রান্ত হাদিস বিদ্যমান।

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, আমাদের কাছে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) এই হাদিস পৌঁছেছে যে, তিনি ইরশাদ করেছেন, পাঁচটি রাতে দোয়া কবুল হয়। তন্মধ্যে শাবান মাসের ১৫ তারিখ অন্যতম। 

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) আরও বলেন, উল্লিখিত রাত সম্পর্কে আমি যা বলেছি সেগুলোকে আমি মোস্তাহাব মনে করি, ফরজ মনে করি না। -কিতাবুল উম্ম ও সুনানে কুবরা

নিজের পরকালীন কল্যাণ লাভের নিমিত্তে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বরকতময় এই রাতে দীর্ঘ সময় একাকী নফল নামাজ আদায় করেছেন। এই নফল ইবাদত তিনি এতটাই নিঃশব্দ ও গোপনে করেছেন যে, পাশে শুয়ে থাকা প্রিয় মানুষটিও টের পেয়েছেন বেশ বিলম্বে। বিশাল হদিস ভাণ্ডারের গবেষণার আলোকে প্রতীয়মান হয়, জীবনে মাত্র একবার এই রাতে তিনি কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য মাগফেরাত কামনা করেছেন নীরবে-নিভৃতে। পরের দিন সওম পালনের মতো কষ্টসাধ্য আমলও তিনি উম্মতের আদর্শ হিসেবে রেখে গিয়েছেন পারলৌকিক কল্যাণের স্বার্থে।
 
মহিমান্বিত এই রজনীর প্রভুত কল্যাণের কথা যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই, ঠিক তেমনি সুযোগ নেই নবী (সা.)-এর আদর্শ পরিহারের।

তাই আসুন, নিজের কৃতকর্মের প্রতি অনুতপ্ত হয়ে পাপরাশি মোচনের নিমত্তে মহান প্রভুর দরবারে হাত তুলি মহিমান্বিত এই রজনীতে মনের সবটুকু আবেগ উজাড় করে দিয়ে নীরবে নিভৃতে। অন্তর থেকে মুছে ফেলি সব হিংসা-বিদ্বেষ। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমা করবেন। তিনি পরম দয়ালু। আমাদের ধারনার চেয়েও বহুগুণে মহিমাময়, প্রেমময়।

 

জেনে নিন | পবিত্র জুম’আর দিনের ফজীলতসমুহ

জেনে নিন | পবিত্র জুম’আর দিনের ফজীলতসমুহ

আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, “মুমিনগণ,জুমআর দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয়,তখন তোমরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য দ্রুত যাও এবং বেচাকেনা বন্ধ কর।এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝ।”-[আল কুরআন;সূরা আল জুমুআহ;০৯]

●●রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
“মুমিনের জন্য জুম’আর দিন হল সাপ্তাহিক ঈদের দিন।”-[ইবনে মাজাহ;১০৯৮]

●●রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
“মহান আল্লাহ পাকের কাছে জুম’আর দিনটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনের মত শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনটি আল্লাহর কাছে অতি মর্যাদা সম্পন্ন।”-[ইবনে মাজাহ;১০৮৪]

জেনে নিন | পবিত্র জুম’আর দিনের ফজীলতসমুহ
জেনে নিন | পবিত্র জুম’আর দিনের ফজীলতসমুহ

●●রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
“হে মুসলমানগণ, জুম‘আর দিনকে আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের জন্য (সাপ্তাহিক) ঈদের দিন হিসাবে নির্ধারণ করেছেন (جَعَلَهُ اللهُ عِيْدًا)। তোমরা এদিন মিসওয়াক কর, গোসল কর ও সুগন্ধি লাগাও।”-[মুওয়াত্তা, ইবনু মাজাহ, মিশকাত; হাদিস নং-১৩৯৮, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘পরিচ্ছন্নতাঅর্জন ও সকাল সকাল মসজিদে গমন’ অনুচ্ছেদ-৪৪]

●●উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত: এক ইয়াহুদি তাঁকে বলল ,’হে আমিরুল মু’মিনীন ! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে, যা আপনারা পাঠ করে থাকেন, তা যদি আমাদের ইয়াহুদি জাতির উপর অবতীর্ণ হতো, তবে অবশ্যই আমরা সেই দিনকে ঈদ হিসাবে পালন করতাম’, তিনি বললেন, ‘কোন আয়াত’? সে বলল,“আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” – [ সূরা মায়েদা; ৩ ]; উমার (রাঃ) বললেন, “এটি যে দিনে এবং যে স্থানে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমরা জানি; তিনি সেদিন আরাফায় দাঁড়িয়েছিলেন আর সেটা ছিল জুমুআ’র দিন।”-[সহীহ বুখারী;হাদিস নং – ৪৩, ৪৪০৭, ৪৬০৬, ৭২৬৮; সহীহ মুসলিম ৪৩/১ ,হাদিস নং – ৩০১৭]

●●রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
সূর্য উদিত হয় এরুপ দিনগুলোর মধ্যে জুম’আর দিনটিই হল সর্বোত্তম।
(১)এই দিনেই আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল – [ আবু দাউদ – ১০৪৬ ],
(২)এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল এবং
(৩)এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল – [মুসলিম;জুম’আর নামাজ পর্ব],
(৪)এই দিনে তাঁকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছিল,
(৫)এই দিনেই তাঁর তওবা কবুল করা হয়েছিল এবং
(৬)এই দিনেই তাঁর রূহ কবজ করা হয়েছিল – [ আবু দাউদ – ১০৪৬ ],
(৭)এই দিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে – [ আবু দাউদ – ১০৪৭ ],
(৮)এই দিনেই কিয়ামত হবে – [ আবু দাউদ – ১০৪৬ ],
(৯)এই দিনেই সকলেই বেহুঁশ হয়ে যাবে – [ আবু দাউদ – ১০৪৭ ],
(১০)নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগন,আকাশ,পৃথিবী,বাতাস,পর্বত ও সমুদ্র সবই জুম’আর দিনে শংকিত হয়। – [ ইবনে মাজাহ – ১০৮৪; মুয়াত্তা ইমাম মালেক ]।

আর্টিকেলের বাকি অংশটুকু পড়তে বিজ্ঞাপনের শেষে নেক্সট  বাটনে ক্লিক করুন

আবু হুরাইরা (রা:) ও শয়তানের গল্প | যা থেকে আপনি শিক্ষা অর্জন করতে পারবেন

আবু হুরাইরা (রা:) ও শয়তানের গল্প

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে যাকাতের সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব দিলেন। দেখলাম, কোন এক আগন্তুক এসে খাদ্যের মধ্যে হাত দিয়ে কিছু নিতে যাচ্ছে। আমি তাকে ধরে ফেললাম। আর বললাম, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। সে বলল, আমি খূব দরিদ্র মানুষ। আমার পরিবার আছে। আমার অভাব মারাত্নক। আবু হুরাইরা বলেন, আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।

আবু হুরাইরা (রা:) ও শয়তানের গল্প
আবু হুরাইরা (রা:) ও শয়তানের গল্প

সকাল বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলাম, তখন তিনি বললেন, কী আবু হুরাইরা! গত রাতের আসামীর খবর কি? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার প্রচন্ড অভাবের কথা আমার কাছে বলেছে। আমি তার উপর দয়া করে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অবশ্য সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে।দেখবে সে আবার আসবে।

আমি এ কথায় বুঝে নিলাম সে আবার আসবেই। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সে আবার আসবে। আমি অপেক্ষায় থাকলাম। সে পরের রাতে আবার এসে খাবারের মধ্যে হাত দিয়ে খুঁজতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম। আর বললাম, আল্লাহর কসম আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি খুব অসহায়। আমার পরিবার আছে। আমি আর আসবো না। আমি এবারও তার উপর দয়া করে তাকে ছেড়ে দিলাম। সকাল বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলাম, তিনি বললেন, কী আবু হুরাইরা! গত রাতে তোমার আসামী কী করেছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার চরম অভাবের কথা আমার কাছে বলেছে। তার পরিবার আছে। আমি তার উপর দয়া করে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অবশ্য সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে।
দেখো, সে আবার আসবে।

তৃতীয় দিন আমি অপেক্ষায় থাকলাম, সে আবার এসে খাবারের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খুঁজতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম। আর বললাম, আল্লাহর কসম আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। তুমি তিন বারের শেষ বার এসেছ। বলেছ, আসবে না। আবার এসেছ। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে কিছু বাক্য শিক্ষা দেবো যা তোমার খুব উপকারে আসবে। আমি বললাম কী সে বাক্যগুলো? সে বলল, যখন তুমি নিদ্রা যাবে তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে একজন রক্ষক পাহাড়া দেবে আর সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।

সকাল বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলাম, তখন তিনি বললেন, কী আবু হুরাইরা! গত রাতে তোমার আসামী কী করেছে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আমাকে কিছু উপকারী বাক্য শিক্ষা দিয়েছে, তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে সে কী শিক্ষা দিয়েছে? আমি বললাম, সে বলেছে, যখন তুমি নিদ্রা যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে একজন রক্ষক পাহাড়া দেবে আর সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না।
আর সাহাবায়ে কেরাম এ সকল শিক্ষণীয় বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে তোমাকে সত্য বলেছে যদিও সে মিথ্যাবাদী। হে আবু হুরাইরা! গত তিন রাত যার সাথে কথা বলেছো তুমি কি জানো সে কে?

আবু হুরাইরা বলল, না, আমি জানি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে হল শয়তান। (বর্ণনায় : বুখারী)

আর্টিকেলের বাকি অংশটুকু পড়তে বিজ্ঞাপনের শেষে নেক্সট  বাটনে ক্লিক করুন

জেনে নিন | দাজ্জাল মারা যাওয়ার পরে পৃথিবীর অবস্থা কেমন হবে (ভিডিও)

দাজ্জাল মারা যাওয়ার পরে পৃথিবীর অবস্থা কেমন হবে

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে দাজ্জালের আভির্ভাব হবে। সে চল্লিশ-আমি জানি না চল্লিশ দিবস, না মাস, না বছর-অবস্থান করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম কে পাঠাবেন।

তাকে দেখতে উরওয়া ইবনে মাসউদের মত মনে হবে। তিনি দাজ্জাল-কে খোজ করবেন ও হত্যা করবেন।

এরপর মানুষ সাত বছর এমনভাবে কাটাবে যে দুজন মানুষের মধ্যে কোন শত্রুতা থাকবে না। এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উত্তর দিক থেকে হিমেল বায়ু প্রেরণ করবেন। যাদের অন্তরে অনু পরিমাণ ঈমান রয়েছে তারা সকলে এতে মৃত্যু বরণ করবে। ঈমানদার ও ভাল মানুষের কেহ বেঁচে থাকবে না। যদি তোমাদের কেহ পাহাড়ের সুরক্ষিত গুহায় প্রবেশ করে তাকেও এ বাতাস পেয়ে বসবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আরো শুনেছি যে, দুরাচারী মানুষগুলো অবশিষ্ট থাকবে পাখির মত দ্রুত আর বাঘের মত হিংস্র। তারা ভালকে ভাল হিসাবে জানবে না আর মন্দ-কে মন্দ মনে করবে না। শয়তান মানুষের আকৃতিতে তাদের কাছে এসে বলবে তোমরা ভাল কাজে সাড়া কেন দাও না? তারা বলবে তুমি আমাদের কী করতে বলো? সে তাদের মুর্তির উপাসনা করতে আদেশ করবে। তারা সুন্দর জীবনোপকরণ নিয়ে জীবন যাপন করবে। অতঃপর একদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে। (তখন সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে) এরপর একদিন প্রচন্ড বৃষ্টি বর্ষিত হবে। এ বৃষ্টির কারণে মানুষের দেহগুলো উদ্ভিদের মত উত্থিত হবে। এরপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে তখন মানুষেরা দাড়িয়ে যাবে ও এদিক সেদিক তাকাতে থাকবে।

তারপর বলা হবে হে মানব সকল! তোমাদের প্রতিপালকের দিকে আসো। তোমরা দাড়িয়ে যাও, তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, জাহান্নামীদের বের করে আনো। জিজ্ঞাসা করা হবে কত জন থেকে কত জন বের করে আনবো? উত্তর দেয়া হবে, প্রত্যেক হাজার থেকে নয় শত নিরানব্বই জনকে বের করে নাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেটিই এমন দিন যা শিশুদের বৃদ্ধ করে দেবে। আর এ দিনটিতে আল্লাহ তাআলা নিজ পায়ের গোছা উম্মুক্ত করবেন। ( মুসলিম হাদীস নং ২২৫৮)

ভিডিওটি দেখুনঃ- 

দেখে নিন | লোক দেখানো আমলের পরিণতি কি হয়

লোক দেখানো আমলের পরিণতি

আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির বিচার করা হবে, সে হবে একজন (ধর্মযুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী)শহীদ। তাকে আল্লাহ্র নিকট উপস্থিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ্ পাক তাকে (দুনিয়াতে প্রদত্ত) নেয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সেও তা স্মরণ করবে। এরপর আল্লাহ্ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন,দুনিয়াতে তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে
বলবে, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য (কাফেরদের সাথে) লড়াই করেছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ্ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ, বরং তোমাকে যেন বীর-বাহাদুর বলা হয়, সেজন্য তুমি লড়াই করেছ। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী)তোমাকে দুনিয়াতে তা বলাও হয়েছে।অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে উপুড় করে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর সে ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত করা হবে, যে নিজে দ্বীনী ইলম শিক্ষা করেছে এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে। আর পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করেছে(এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছে)। তাকে আল্লাহ্ পাকের দরবারে হাযির করা হবে।

লোক দেখানো আমলের পরিণতি
লোক দেখানো আমলের পরিণতি

অতঃপর তিনি তাকে নেয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সেও তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নেয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি স্বয়ং দ্বীনী ইলম শিক্ষা করেছি এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির নিমিত্তে কুরআন তেলাওয়াত করেছি। তখন আল্লাহ্ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং তুমি এজন্য ইলম্ শিক্ষা করেছ,যেন তোমাকে ‘বিদ্বান’বলা হয় এবং এজন্য কুরআন অধ্যয়ন করেছ, যাতে তোমাকে‘ক্বারি’বলা হয়। আর (তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী )তোমাকে বিদ্বান ও ক্বারীও বলা হয়েছে।অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে। সুতরাং তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর এমন এক ব্যক্তিকে বিচারের জন্য আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে, যাকে আল্লাহ্ তাআলা বিপুল ধন-সম্পদ দান করে বিত্তবান করেছিলেন। তাকে আল্লাহ্ তাআলা প্রথমে প্রদত্ত নেয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সে তখন সমস্ত নেয়ামতের কথা অকপটে স্বীকার করবে।অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এই সমস্ত নেয়ামতের শুকরিয়ায় তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, যে সমস্ত ক্ষেত্রে ধন- সম্পদ ব্যয় করলে তুমি সন্তুষ্ট হবে, তোমার সন্তুষ্টির জন্য সেসব খাতের একটি পথেও ব্যয় করতে ছাড়িনি। আল্লাহ্ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়; বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে দান করেছিলে, যাতে তোমাকে বলা হয় যে, সে একজন ‘দানবীর’।সুতরাং (তোমার অভিপ্রায় অনুসারে দুনিয়াতে) তোমাকে ‘দানবীর’বলা হয়েছে।অতঃপর (ফেরেশতাদেরকে) তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে। নির্দেশ মোতাবেক তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে । [মুসলিম হা/১৯০৫‘নেতৃত্ব’অধ্যায়,অনুচেছদ-৪৩; মিশকাত-আলবানী হা/২০৫, ‘ইলম’অধ্যায় ]

শিক্ষা:
লোক দেখানো আমলের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কাজেই সর্বদা আমাদের নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখতে হবে এবং প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টির জন্যই করতে হবে।