দুহাত কাটার পরেও হাতের অবশিষ্টাংশ দিয়ে ইসলামের পতাকা দরছিলেন যে সাহাবী

হযরত মুসআব ধনীর দুলাল ছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহন করার পর তাঁর উপর চরম নির্যাতন চালানো হয়। দীর্ঘদিন বন্দী করে রাখা হয়। একদিন বন্দী জীবনের শৃংখল ভেংগে আবিসিনায় চলে যান। সেখান থেকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন একটি পোশাক পরিধান করে মদীনায় আসেন। হযরত মুসআবের এই দুরবস্থা দেখে আল্লাহর রাসুল (সা) এর চোখ অশ্র“ সিক্ত হয়। কেননা মুসআব খুবই আরাম আয়েশের জীবন যাপন করতো। শুধুমাত্র ইসলাম গ্রহন করার কারণে তার এই দুরবস্থা।

মুসআব মদীনায় আসার পর ওহুদ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। উক্ত যুদ্ধে মুসআবের হাতে ছিল ইসলামের পতাকা। যুদ্ধের ময়দানে শত্র“র প্রচন্ড আঘাতে মুসআবের ডান হাত কেটে যায়। এরপর তিনি বাম হাত দিয়ে ইসলামের পতাকা উড্ডীন রাখেন। একটু পরে বাম হাতও কাটা যায়। দুহাত কাটা যাওয়ার পর দুই হাতের অবশিষ্টাংশ দিয়ে ইসলামের পতাকা বুকে ধরে রাখলেন। যতক্ষণ প্রাণ ছিলো ইসলামের পতাকা মাটিতে পড়তে দেন নাই। অবশেষে শত্রু “ পক্ষের তীরের আঘাতে তিনি শহীদ হন।

দূর্ধর্ষ ডাকাত থেকে রাসূল (সা:) এর বিশ্বাসী সাহাবী হয়ে উঠার গল্প

মক্কা যে গিরিপথের মাধ্যমে বাকী পৃথিবীর সাথে যুক্ত ছিল সেটা ছিল ওয়াদান ভ্যালী এবং সেখানেই ছিল গিফার গোত্রের বাস। অত্যন্ত দুর্ধর্ষ এই জাতি মক্কা এবং সিরিয়ার মধ্যে যে সকল বানিজ্য বহর চলাচল করত তাদের জিম্মি Continue reading “দূর্ধর্ষ ডাকাত থেকে রাসূল (সা:) এর বিশ্বাসী সাহাবী হয়ে উঠার গল্প”

একজন সাহাবী অন্য একজন সাহাবীর স্ত্রীর হাত স্পর্শ করলো

খাঁটিভাবে তাওবা করতে পারলে আল্লাহ তার বান্দাকে ক্ষমা করবেনই। হোক সে বড় পাপী । পবিত্র কালামে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন –‘‘তারা যখন কোন অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের Continue reading “একজন সাহাবী অন্য একজন সাহাবীর স্ত্রীর হাত স্পর্শ করলো”

হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-এর একজন সাহাবী

তার চারপাশে বহু লোকজন। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্নজন এসেছেন। তার কাছে থেকে সবাই কিছু এলেম শিখতে চান। কুরআনের আয়াতের মর্ম শুনতে চান। রাসূল (সাঃ)-এর হাদীস শুনতে চান।
তিনি হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ)। রাসূল (সাঃ)- Continue reading “হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-এর একজন সাহাবী”

একজন সাহাবী ও তার শেষ কাহিনী

হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম, জান্নাতে প্রবেশ করেছি। সেখানে কোন পাঠকের পড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। Continue reading “একজন সাহাবী ও তার শেষ কাহিনী”

একজন ডাকাত কিভাবে রাসূলের সাহাবী হয়েছিলেন

মক্কা যে গিরিপথের মাধ্যমে বাকী পৃথিবীর সাথে যুক্ত ছিল সেটা ছিল ওয়াদান ভ্যালী এবং সেখানেই ছিল গিফার গোত্রের বাস। অত্যন্ত দুর্ধর্ষ এই জাতি মক্কা এবং সিরিয়ার মধ্যে যে সকল বানিজ্য বহর চলাচল করত তাদের জিম্মি করে চাঁদবাজী করত । বানিজ্য কাফেলা তাদের দাবী পূরণে ব্যর্থ হলে তারা মালামাল আর ধনসম্পদ লুন্ঠন করত । জুনদুব ইবন্ জুনাদা নামে এই গোত্রের ভয়ংকর এবং ক্ষিপ্র একজন নেতা ছিল, যাকে মানুষ আবু জর ডাক নামেই বেশী চিনত।
লোকটি সমগ্র আরব অঞ্চলে তার সাহস এবং স্থিরচিত্তের জন্য বিখ্যাত ছিল। লোকজন তাকে সেই মানুষ হিসাবেও জানত যে মানুষ আরবের সকলে যে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে জীবনধারণ করে সে তাকে মিথ্যা বলে মনে করত।
ওয়াদান মরুভূমিতে অবস্থানকালে একদিন তাঁর কাছে খবর পৌঁছাল যে, মুহাম্মাদ নামের একজন ব্যক্তি মক্কায় নিজেকে আল্লাহর নবী বলে পরিচয় দিচ্ছে। একথা শোনার পর তার অন্তরে খেলে গেল এক অদ্ভূত আলোড়ন। মন বলল এই লোকটিই হয়ত সে, যে এ জাতিকে মূর্তিপূজা এবং পাপাচার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবে। এ জনকে ও জনকে জিজ্ঞেস করেও তিনি কোন সদুত্তর পেলেন না। অস্থির মনের ব্যাকুলতা আরো বরং বেড়ে গেল। মন বলল আর তো বিলম্ব করা যায় না। বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে নিশ্চিত খবর তার চাই।
তাঁর ছোট ভাই এর নাম ছিল আনিস। বড় ভাই এর অস্থিরতা তার চোখেও ধরা পড়েছিল। আনিস নিজেও বড় ভাইকে গভীরভাবে ভালোবাসতো। আবু জর একদিন তাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ”তুমি মক্কায় চলে যাও। ওখানে গিয়ে চুপি চুপি সে লোকটিকে খুঁজে বের করবে যে নিজেকে নবী বলে পরিচয় দিচ্ছে। সাবধান থেকো, ওখানকার মানুষ জানতে পারলে তোমাকে এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। লোকটি কি কি বলে তুমি তা মনোযোগ দিয়ে শুনো, বিশেষ করে সে কথাগুলো, যা সে আল্লাহর পক্ষ থেকে পেয়েছে বলে বলছে। দ্রুত যাও আর ফিরে এসে আমাকে সব জানাও।”
আনিস দেরী না করে বেরিয়ে পড়ল। মক্কার বিপদসংকুল পরিস্থিতি। নতুন নবীর দাবীদার মুহাম্মাদের সন্ধান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংশয় আর শংকার মধ্যেই আনিস একদিন খুঁজে বের করলো মুহাম্মাদকে (আল্লাহর করুনা শান্তি তাঁর উপর বর্ষিত হোক)। আনিস তাঁর কথা শুনলেন, তারপর মক্কা থেকে তিনি দ্রুত ওয়াদান এর পথে রওয়ানা হলেন।
ইতিমধ্যেই আবু জর অস্থির হয়ে উঠেছেন। মক্কা-ওয়াদান পথে তার উদ্বিগ্ন দৃষ্টি আনিসের আগমন পথের প্রতীক্ষায় ছিল। একদিন দেখা গেল আনিস ফিরে আসছে। ছুটে গেলেন তিনি আনিসের কাছে। উদ্বিগ্ন আবু জর জিজ্ঞেস করলেন, ”কি দেখলে ওখানে, দেখা হয়েছিলো তাঁর সাথে?” ”হ্যাঁ। একজন মানুষকে ওখানে সত্যিই আমি পেয়েছি যে নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত নবী বলে বলছে। সে কবি নয় এবং সে মানুষকে কেবল সত্য ও সৎকাজের দিকে ডাকছে।” ”মানুষজন তার সম্বন্ধে কি বলছে?” ”তারা তাকে যাদুকর, মিথ্যাবাদী আর কবি হিসাবে বলছে।” ”তুমি আমার কৌতুহল মেটাতে পারলে না। তুমি কি আমার পরিবারের দিকে খেয়াল রাখতে পারবে যদি আমি নিজেই মক্কা যাই আর সেই নবী বলে দাবীদার লোকটির সবকিছু নিজেই দেখে আসি?” ”হ্যাঁ। তবে সাবধান, মক্কার লোকদের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকবেন।”

আর দেরী না করে আবু জর বেরিয়ে পড়লেন। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত যৌবন তার। জীবনে কতবার মানুষের সম্পদ লুট করার জন্য ক্ষিপ্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়েছেন, আর আজ তিনি চলেছেন এক মহাসত্যকে গ্রহণ করে নেবার জন্য। প্রখর সূর্য, গভীর রাতের নিকষ কালো অন্ধকার সবকিছু পেছনে ফেলে অকুতোভয় মানুষটি এগিয়ে চললেন মক্কার দিকে।
মক্কায় পৌঁছেই তীক্ষ্মধী আবু জর বুঝতে পারলেন শুধুমাত্র মুহাম্মাদের সাথে দেখা করার চেষ্টার কারণে তিনি অত্যন্ত অনিরাপদ ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন এবং এজন্য তিনি কঠিন সতর্কতা অবলম্বন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। আবু জর লক্ষ্য করলেন কুরাইশরা মুহুম্মাদের আনুসারীদের নির্মম শাস্তি দিচ্ছে আর কে কে মুহাম্মাদের কাছে আসছে তা দেখার জন্য চতুর গোয়েন্দাবাহিনী নামিয়েছে। আবু জর জানতেন যে এ অবস্থা তাকে মোকাবেলা করতে হতে পারে, তাই তিনিও প্রস্তুত ছিলেন। বুদ্ধিমান আবু জর এজন্য কোন লোকের কাছে মুহাম্মাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা থেকে বিরত রইলেন। পরিস্থিতি উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে তিনি রাতে কাবাঘরের এক কোণে শুয়ে পড়তেন। একদিন আলী ইবন্ আবী তালীব তাকে দেখে ভাবলেন তিনি নিশ্চয়ই একজন আগন্তুক। আলী তাঁকে তার বাড়ীতে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আবু জর মেহমান হিসাবে চললেন আলীর বাড়ীতে। রাত যাপন করে তিনি সকালে আবার কাবার কাছে চলে এলেন, তবে আবু জর বা আলী কেউ কাউকে কোন প্রশ্ন করলেন না।
মুহাম্মাদ নামের নবী বলে দাবীদার লোকটির দেখা পাবেন বলে পরদিন সারাদিন তিনি কাবার কাছে খুঁজে খুঁজে কাটিয়ে দিলেন। কিন্তু দেখা পেলেন না। রাতে আবার চলে এলেন কাবার মসজিদে ঘুমাতে এবং আজও আলী ইবন্ আবী তালিব দেখলেন তাকে। আজ আলী বললেন, “এখনওকি সে সময়টা হয়নি যখন মানুষ বাড়ীর দিকে যায়, চলুন।”

আবু জর আজও আলীর সাথে তার বাড়ীতে গেলেন এবং আজও দুজনের কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
এমনিভাবে তৃতীয় দিন এল। আজও আলীর মেহমান হয়েই আবু জর এসেছেন আলীর বাড়ীতে। আজ আলী জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি আমাকে বলবেন কেন আপনি মক্কায় এসেছেন?” ”আমি আপনাকে তখনই বলব যখন আপনি আমার সাথে এই প্রতিজ্ঞা করবেন যে, আমি যা চাই তার সঠিক সংবাদ আপনি আমাকে দেবেন আর কাউকে তা জানাবেন না।” আলী রাজী হলেন। আবু জর বললেন, ”আমি মক্কা থেকে অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছি একজন লোকের খোঁজে, যার নাম মুহাম্মাদ, যে নিজেকে নবী বলে পরিচয় দিচ্ছে। আমি শুধু তার সাথে একটু দেখা করে তার কিছু কথা শুনতে চাই।”
আনন্দে আলীর চেহারা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আলী বললেন, ”আল্লাহর শপথ, তিনি সত্যিই নবী।” আলী তাকে রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এবং তিনি যে শিক্ষা দিচ্ছেন তার থেকে কিছু আবু জরকে শোনালেন। অবশেষে তিনি বললেন, ”কাল সকালে আমি আপনাকে মুহাম্মাদের (সাঃ) কাছে নিয়ে যাব। আমি যেখানে যাব আপনি দূর থেকে আমাকে অনুসরণ করবেন। আমি যদি আপনার জন্য বিপজ্জনক কোন কিছু দেখি তাহলে আমি মূত্রত্যাগ করার ভাব করে থেমে যাব। যদি আমি চলতে থাকি আপনি আমাকে অনুসরণ করবেন এবং আমি যেখানে প্রবেশ করি আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন।”
সে রাতে আবু জর এর ঘুম হল না। এতদিন ধরে যে মানুষটিকে দেখার জন্য তিনি হন্যে হয়ে ঘুরছেন কাল তাঁরই সাথে দেখা হতে যাচ্ছে। আর তিনি যদি আল্লাহর নবীই হয়ে থুকে তাহলে কী সৌভাগ্যময় দিন তার আসতে যাচ্ছে কাল।
পরদিন কথামত আবু জর চললেন আলীর সাথে রাসুল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে দেখা করার জন্য। আলীর সাথে দূরত্ব বজায় রেখে তিনি আলীর পদচিহ্ন অনুসরণ করতে লাগলেন। কোন বিপদ ছাড়াই একসময় তারা পৌঁছে গেলেন কাঙ্খিত গন্তব্যে। কত কথা আবু জর যেন ভেবে রেখেছিলেন মুহাম্মাদকে জিজ্ঞাসা করার জন্য, তার কথাগুলো একটু যাচাই করে নেবার জন্য, কিন্তু আজ যখন তিনি মুহাম্মাদ নামের এই লোকটির সামনে এলেন, তার আগেই আল্লাহ্ ঈমানের আলো আবু জরের অন্তরে ঢেলে দিয়েছিলেন। প্রথম দেখাতেই রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে তিনি বললেন, ”আপনার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি বর্ষিত হোক হে আল্লাহর রাসুল।” ”আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ্”।
রাসুলুল্লাহ্, তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক, আবু জরের চেয়েও সুন্দর ভাষায় সে সম্বোধনের জবাব দিলেন, ”তোমার উপরও আল্লাহর শান্তি, রহমত ও করুণা বর্ষিত হোক।” ”ওয়ালাইকুম আস্সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্ ওয়া বারাকাতুহু”। আর এভাবেই আবু জর হলেন প্রথম মানুষ যিনি আল্লাহর রাসুলকে সেই কথাগুলো দিয়ে সম্বোধন করলেন যা পরবর্তিতে মুসলিমদের জন্য সম্বোধন রীতি হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) তাকে স্বাগত জানরালেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাকে কুরআন থেকে কিছু বাণী পড়ে শেনালেন। আবু জর মোটেও দেরী করলেন না, সত্যের আলো তার হৃদয়ে আল্লাহ্ প্রজ্জ্বলিত করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ্ ও তার রাসুলকে বিশ্বাস করে সাক্ষ্যের উচ্চারণ তার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো। আর ভাগ্যবান এই লোকটি এভাবেই প্রথম দিককার মুসলিমদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হলেন, যাদের সীমাহীন মর্যাদার কথা স্বয়ং আল্লাহ্ ঘোষনা করেছেন। এরপরের কথা আমরা আবু জরের মুখ থেকেই শুনব।

“এরপর থেকে আমি রাসুল, তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক, এর সাথে মক্কায় থাকতে লাগলাম। তিনি আমাকে ইসলাম এবং কুরআন শিক্ষা দিলেন। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) আমাকে বললেন, ”তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা তুমি এখানে মক্কার কাউকে জানিও না। আমার ভয় হয়, তা জানলে ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে।”
আবু জর তারুণ্যদীপ্ত দুঃসাহসিক মানুষ। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি কাউকে কখনও ভয় পাননি, বরং এ লোকটির সাহস আর পৌরুষ সবাইকে অবাক করেছে। আজ ঈমানের তেজ তার অন্তরে। তিনি কি কাউকে ভয় পেতে পারেন? আবু জর বললেন, ”যার হাতে আমার প্রাণ সেই মহান সত্ত্বার শপথ ইয়া রাসুলাল্লাহ্, আমি ততক্ষন পর্যন্ত মক্কা ত্যাগ করব না যতক্ষন না আমি কাবার প্রঙ্গনে কুরাইশদের মাঝখানে গিয়ে যে সত্য আল্লাহ্ আমাকে দিয়েছেন সে সত্যের ঘোষণা না দেব।”
রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) নিশ্চুপ রইলেন। আমি কাবার মসজিদে গেলাম। কুরাইশরা সেখানে বসে ছিল এবং নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। আমি তাদের মাঝখানে গিয়ে পৌঁছালাম এবং আমার গলার সর্বোচ্চ আওয়াজে বললাম, ”কুরাইশগণ, আমি তোমাদের ঘোষণা করছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নাই এং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল।”
আমার কথার সাথে সাথে তাদের মধ্যে বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া হল। তারা লাফ দিয়ে উঠে পড়ল এবং বলতে লাগল, ”একে এখনই ধর, সে নিজের দীন ত্যাগ করেছে।” তারা আমাকে ধরে ফেলল, আমার উপর চড়ে বসল আর আমাকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে মারতে লাগলো। তাদের সেই বীভৎস মার আমাকে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সে সময় আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব, যিনি রাসুলুল্লাহর চাচা, আমাকে চিনতে পারলেন। তিনি আমার উপর আচ্ছাদনের মত ঝুঁকে পড়লেন এবং আমাকে তাদের মার থেকে রক্ষা করলেন। তারপর তাদের বললেন, ”তোমাদের ধ্বংস হোক, এ তোমরা এ কি করছ? তোমরা কি গিফার গোত্রের একজন লোককে মেরে ফেলছ অথচ তোমাদের ব্যবসা ও বাহনগুলো গিফার গোত্রের উপর দিয়েই মক্কা থেকে বের হবে।” আব্বাসের এ কথায় তারা আমাকে ছেড়ে দিল।
এ ঘটনার পর আমি রাসুলুল্লাহ্, তাঁর উপর আল্লাহর শান্তি ও করুণা বর্ষিত হোক, এর কাছে ফিরে গেলাম। যখন তিনি আমার ক্ষতবিক্ষত অবস্থা দেখলেন তখন বললেন, ”আমি কি তোমাকে বলিনি মক্কার লোকদের সামনে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা না দেবার জন্য।” আমি বললাম, ”ইয়া রাসুলাল্লাহ্, এ কাজটি করার জন্য আমি মন থেকে চাইছিলাম এবং তা আমি পূরণ করেছি”। ”তোমার জাতির কাছে ফিরে যাও, আর তুমি যা দেখেছ ও যা শুনেছ তা তাদেরকে জানাও। তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দাও। আল্লাহ্ হয়তো তোমার মাধ্যমেই তাদেরকে কল্যাণের দিকে নিয়ে আসবেন এবং তাদের মাধ্যমে তোমাকে পুরস্কৃত করবেন। আর যখন তুমি শুনবে যে আমি প্রকাশ্যে চলে এসেছি, তখন তুমি আমার কাছে চলে এসো।”
রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর এ আদেশের পর আমি আমার জাতির কাছে চলে এলাম। আমার পৌঁছানোর খবর পেয়ে আমার ভাই আমার কাছে ছুটে এল। ”আপনি কি করলেন সেখানে?”, সে আমাকে জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম যে, আমি মুসলিম হয়েছি আর মুহাম্মাদ যে শিক্ষা দিচ্ছেন তা সত্য বলে বিশ্বাস করেছি। ”আমি আপনার ধর্ম আর মতের বিরুদ্ধে নই, আজ থেকে আমিও মুসলিম আর বিশ্বাসী হিসাবে ঘোষনা করলাম।”
দুই ভাই এরপর তাদের মায়ের কাছে গেল এবং মাকে ইসলামের দাওয়াত দিল। মা বললেন, ”তোমাদের দু ভাইয়ের বিশ্বাসের সাথে আমার কোন দ্বিমত নেই। আজ থেকে আমিও ইসলামে প্রবেশ করলাম।”
সেদিন থেকেই এ বিশ্বাসী মুসলিম পরিবারটি গিফার গোত্রের লোকদের অক্লান্তভাবে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলল। ফলশ্র“তিতে গিফার গোত্রের অধিকাংশ লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল।
আবু জর রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) মদিনায় হিজরতের আগ পর্য়ন্ত ওয়াদান মরুভূমিতে তাঁর গোত্রে অবস্থান করতে লাগলেন। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের সময় পর্য়ন্ত এ গোত্রটি ওয়াদান মরুভূমিতে অবস্থান করতে লাগল। অবশেষে রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশে আবু জর এরপর মদিনায় চলে এলেন। আবু জর রাসুল (সাঃ) এর কাছে অনুমতি চাইলেন সর্বক্ষন তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে থাকার জন্য এবং তাঁর ব্যক্তিগত কাজে লাগার জন্য। রাসুল (সাঃ) তাঁকে অনুমতি দিলেন এবং তার সাহচার্য ও কাজকর্মে সবসময় সন্তুষ্ট ছিলেন। রাসুল (সাঃ) প্রয়ই আবু জরকে অন্যদের থেকে অগ্রাধিকার দিতেন এবং যখনই তার সাথে দেখা হত তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাসতেন আর তাঁকে বেশ প্রফুল্ল দেখাত।
সময় বয়ে চলল এবং একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) মৃত্যুবরণ করলেন। আবু জর এরপর আর মদিনা থাকতে পারলেন না। প্রতিটি মুহূর্তে রাসুলের (সাঃ) শূন্যতা তাকে ভীষন আবেগপ্রবন করে তুলত। রাসুলের (সাঃ) যে অভিভাবকত্ব আবু জরকে ছায়ার মত আগলে রেখেছিল তার অভাব তাকে প্রতিটি সেকেন্ডে যেন বিদ্ধ করছিল। আবু জর মদিনা ত্যাগ করলেন এবং আবু বকর এবং উমার এর পুরো খিলাফতকাল তিনি সিরিয়ার মরুভূমিতে নিভৃতে কাটিয়ে দিলেন।
উসমান ইবন্ আফফান (রাঃ) এর খিলাফতকালে আবু জর দামাস্কাসে অবস্থান করছিলেন। দুনিয়ার প্রতি চিরকাল উদাসীন আবু জর লক্ষ্য করলেন মুসলিমরা পরকাল বাদ দিয়ে দুনিয়া এবং বিলাসিতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তিনি এতে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পড়লেন। উসমান (রাঃ) তাকে মদিনায় ডেকে পাঠালেন। মদিনায় এসেও আবু জর মুসলিম সমাজের বিলাসিতায় মজে যাবার চিত্রই দেখলেন। অবিশ্বাস্য রকম দৃঢ় ও সারাজীবন একই রকম দুনিয়াবিমুখ এ লোকটি মুসলিমদের এ পরিবর্তন সহজভাবে নিতে পারলেন না। এর ফলে শাসক খিলাফতের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব বাড়তে লাগল, এমনকি আবু জরের দৃঢ় দুনিয়া বিমুখতায় মুসলিম সমাজে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখা দিল। এহেন অবস্থায় খলিফা উসমান তাঁকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাঁকে মদিনার কাছে নির্জন আল-রাবাতাহ্ মরুভূমিতে চলে যাবার জন্য অনুরোধ করলেন। আবু জর লোকালয় থেকে অনেক দূরে রাবাতাহ্য় চলে গেলেন এবং সেখানে প্রাণপ্রিয় রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ্ আঁকড়ে ধরে বাস করতে লাগলেন। মরুভূমিতে তাঁর বসবাসকালীন জীবনে একবার এক লোক তাঁর সাথে দেখা করতে এল। অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে সে লক্ষ্য করল আবু জরের বাড়ী প্রায় শূন্য, কোন সম্পদ বলতে সেখানে কিছু নেই। লোকটি তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ”আপনার সম্পদ কোথায়?” তিনি উত্তর করলেন, ”পৃথিবীর পরের জীবনে আমার একটি বাড়ী আছে। আমার সব উত্তম সম্পদগুলো আমি সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছি।” লোকটি বুঝল আবু জর কি বুঝাতে চাচ্ছেন। ”কিন্তু যতদিন আপনি এ দুনিয়াতে আছেন, ততদিন আপনার কিছু সম্পদ থাকা উচিৎ”। আবু জর উত্তর করলেন, ”যিনি এ পৃথিবীর মালিক, তিনি তো আমাকে এ সম্পদের কাছে ছেড়ে দেবেন না”।
একবার সিরিয়ার আমীর দূত পাঠিয়ে আবু জরকে তাঁর প্রয়োজন মেটানোর জন্য তিনশো দীনার পাঠিয়ে দিল। আবু জর এই বলে আমীরের দেয়া দীনার ফেরত পাঠালেন যে, ”আমীর কি এ দীনারগুলো দেবার জন্য আমার চেয়ে বেশী চাহিদাসম্পন্ন ভৃত্য আর কাউকে খুঁজে পেলেন না?”
৩২ হিজরী। আবু জরের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়েছে। নির্জন মরুভূমিতে তিনি আর তাঁর স্ত্রী একা। রাবাতাহ্ ছিল এমন একটি যায়গা যেখান দিয়ে সাধারণত একেবারেই লোক চলাচল হত না, তার উপর সে সময়টা এমন ছিল যখন কোন বাণিজ্য কাফেলাও যাতায়াত করত না।। মৃত্যুপথযাত্রী আবু জরের অবস্থা দেখে তাঁর স্ত্রী ব্যাকুল হয়ে পড়লেন কোন সাহায্যের আশায়। স্ত্রীর এ অবস্থা দেখে আবু জর বললেন, ”চিন্তা করো না, আমি রাসুলাল্লাহ, তাঁর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক, কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে এখানকার একজনের মৃত্যু হবে নির্জন মরুভূমিতে। কিন্তু তার মৃত্যুর সময় মুমিনদের একটি দল সেখানে উপস্থিত হবে। আমি নিশ্চিত সে ব্যক্তিটিই আমি, কারণ সেদিন আমরা যারা সেখানে উপস্থিত ছিলাম তাদের সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। কেবল আমিই বাকী। তুমি পথের দিকে খেয়াল রাখ। নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল মিথ্যা বলেন নি।” আবু জর কিছুক্ষনের মধ্যেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। আবু জরের স্ত্রী একবার স্বামীর কাছে আরেকবার উঁচু টিলার উপর উঠে দূরে খেয়াল করতে লাগলেন। এ অসময়ে কে আসবে এই অপ্রচলিত পথে এই চিন্তায় তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। অবশেষে দূরে দেখা গেল ধুলোর ঝড় তুলে একদল লোক এদিকেই আসছে। কাফেলাটি এসে আবু জরকে অসহায় অবস্থায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল এ লোকটি কে? তাঁর স্ত্রী উত্তর করলেন, আবু জর। লোকেরা বলল, রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাহাবী আবু জর? তাঁর স্ত্রী বললেন, ”হ্যাঁ।” লোকেরা অত্যন্ত অস্থির হয়ে বলল, ”আমাদের জান কুরবান হোক”। তারা দ্রুত আবু জরের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করলেন। প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইবন্ মাসউদ (রাঃ) তাঁর জানাজার সালাত পড়ান।
এমনিভাবে আবু জর ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন দুনিয়াবিমুখ হয়ে কেবলমাত্র আল্লাহ্ আর তাঁর রাসুলের আনুগত্যের মাধ্যমে। একদিন যে লোকটি ওয়াদান ভ্যালীর আতঙ্ক আর ত্রাসের নাম ছিল, সে ব্যক্তিটিই একদিন নির্লোভ আর দুনিয়াবিমুখতার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। ঈমানের মাধ্যমে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর অন্তরকে এমনই পরিবর্তন করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) কে তিনি এতই ভালবাসতেন যে তাঁর মৃত্যুর পর যখনই তিনি রাসুলের (সাঃ) কথা মনে করতেন, তখনই অঝোর ধারায় কাঁদতেন। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যপার এই যে এই দুর্ধর্ষ মানুষটি সম্পর্কেই রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, ”আকাশের নীচে এবং পৃথিবীর উপর আবু জরের চেয়ে বিশ্বাসী ও সত্যবাদী আর কেউ নেই”।

কুচকুচে কালো সাহাবী হযরত জাহেয রা.

কুচকুচে কালো সাহাবী হযরত জাহেয রা.। গ্রাম থেকে শাক-সবজি সংগ্রহ করে শহরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। খুব ভালোবাসতেন রাসূল সা. তাঁকে। বলতেন “জাহেয আমাদের গ্রাম আমরা জাহেযের শহর“।
একদিন তিনি উদোম শরীরে বাজারে শাক-সবজি বিক্রি করছিলেন। রাসূল সা. পিছন থেকে এসে তাঁর বোগলের নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ঘাড়কে এমন ভাবে ধরলেন যেনো সে নড়তে না পারে। ধরার সাথে সাথে তিনি স্বজোরে বলতে লাগলেন, এই ! কে ধরেছো আমাকে? ছাড়ো ! ছাড়ো বলছি ! এদিকে রাসূল সা. ও ধরে রেখে বলতে লাগলেন, এই গোলামকে কে ক্রয় করবে……? সুলভ মূল্যে বেঁচে দিবো। রাসূল সা.-এর আওয়াজ শুনে জাহেয রা. চুপ হয়ে গেলেন। রাসূলের গায়ে ছিলো চাঁদর জড়ানো। হাত উঁচু করে জাহেযকে ধরায় রাসূল সা. এর সিনা মোবারক অনাবৃত হয়ে পড়েছিলো। সুযোগ বুঝে জাহেয রা. নিজের নগ্ন পিঠকে রাসূলের সিনার সাথে মিলিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর রাসূল সা. তাঁকে ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, জাহেয ! তুমি চুপ হয়ে গেলে যে? আবার আমার সিনার সাথে তোমার পিঠ ঠেকিয়ে দিলে! জাহেয রা. বললেন, ওগো প্রিয় রাসূল সা. আমিতো নিঃস্ব । নিতান্তই হতদরিদ্র। কোনো পুঁজি নেই।
হাশরের মাঠে যদি আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, জাহেয! আমার কাছে কি এনেছো তুমি ? জবাবে বলবো, প্রভূ ! উপস্থাপন করার মতো কিছুই নেই। তবে, আমার পিঠখানা পরীক্ষা করে দেখুন, তাতে তোমার হাবীবের পরশ আছে। একথা শুনে
রাসূল সা. তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

আহ্ ! তিনিতো অন্তত রাসূল সা. এর পরশ পেয়েছেন। আমাদের তো তাও নেই। কোন সম্বল নেই। কোন পুঁজি নেই। রিক্ত হাত। শুন্য থলে। আমরা কী পেশ করবো তাঁর কাছে। আমরা তো এমন হতভাগ্য যে, আমাদের চোখ তাঁর হাবীবকে
দেখেনি। এমন দূর্ভাগা আমাদের নাক তাঁর ঘ্রাণ নিতে পারেনি। এমন বঞ্চিত তাঁর সাথে এক পথে চলতে পারিনি। আমরাতো এমন রিক্ত যে , আমাদের হাত তাঁকে ছুঁতে পারেনি। তবে আমাদের কী হবে? কী আছে আমাদের?
হ্যাঁ আছে। আমাদের অন্তরে মদীনা অলার প্রেম আছে। হৃদস্পন্দনে তাঁর অনুরাগ আছে। প্রতি রক্তকনিকায় তাঁর ভালোবাসা আছে। মহব্বত আছে। এই প্রেম আর অনুরাগকেই আমরা প্রভুর সামনে পেশ করবো সেদিন। প্রভু অন্তর্যামি। তিনি দেখেন।
বুঝেন। উপলব্ধি করেন।
হে প্রভু ! তাঁর ভালোবাসাকে পুঁজি করেই জীবন কাটানোর তৌফিক দিন। তাঁর পদাঙ্ক অনুস্মরণ করে আমরণ চলার তৌফিক দিন। মদীনা অলার প্রেমানলে জ্বলে জ্বলে নিজকে নিঃশ্বেষ করার তৌফিক দিন। আমীন।।

জেনে নিন, অন্ধ সাহাবী হযরত ইবনে উম্মে মাকতূম ( রা) – এর কাহিনী

একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে মক্কা মুয়ায্‌যমার কয়েক জন বড় বড় সরদার বসেছিলেন। তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে উদ্যোগী করার জন্য তিনি তাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করছিলেন।

এমন সময় ইবনে উম্মে মাকতূম (রা) নামক একজন অন্ধ তাঁর খেদমতে হাজির হলেন এবং তাঁর কাছে ইসলাম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করতে চাইলেন। তার এই প্রশ্নে সরদারদের সাথ আলাপে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরক্ত হলেন।

তিনি তার কথায় কান দিলেন না। এই ঘটনায় আল্লাহর পক্ষ থেকে সূরা আবাসা নাযিল হয়। হযরত ইবনে উম্মে মাকতূম ( রা) একেবারেই প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন।

জেনে নিন | ইসলামে কেন দাবা খেলা হারাম

ইসলামে কেন দাবা খেলা হারাম
খেলাধূলা শরীর চর্চার জন্য অবশ্য ভাল কাজে দেয়। অবশ্য বর্তমান ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা টেনিসের এই যুগে অনেকেই পুরনো খেলা দাবার নামই ভুলে গেছে। বর্তমান সময়ে ফুটবল, ক্রিকেট, কিংবা টেনিসের সাথে অনেকটাই জনপ্রিয় খেলা দাবা। তবে এই খেলাটিকে নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন, ইসলামে দাবা খেলা কেন হারাম? যদিও অন্যান্য খেলার মতই এটি একটি বুদ্ধির খেলা। এই খেলা খেললে বুদ্ধির চর্চা করা হয়। তারপরও এই খেলাটি কেন ইসলামে নিষিদ্ধ।

যেকোনো কাজ যা মানুষকে আল্লাহকে স্মরণ করা থেকে বিরত রাখে তাই হারাম। আবু হানিফা (র) , ইমাম মালিক (র) সহ আরও অনেক ইমাম এক্ষেত্রে একটা কুরআনের আয়াত প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন, “হে মুমিনগণ! নিশ্চয় মদ,জুয়া,মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারির তীর এসব গর্হিত বিষয় শয়তানি কাজ ছাড়া এর কিছুই নয় কাজেই এইসব বিষয় থেকে দূরে থাক,যাতে তোমাদের কল্যাণ হয়।শয়তান তো এটাই চায় যে মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতা এবং আল্লাহর স্মরণ এবং সালাত হতে তোমাদেরকে বিরত রাখে,সুতরাং এখনও কি তোমরা ফিরে আসবে?”(মায়েদাহ ৫:৯০-৯১) আমরা সবাই হয়ত জানি যে ইসলাম সকল প্রকার মূর্তি হারাম করেছে। দাবার প্রায় সব গুটিই কোনো না কোনো মূর্তির আদলে তৈরি। আর এজন্য উপরের হাদিসটি এটাই প্রমান করে যে দাবা খেলা হারাম।

ইসলামে দাবা খেলা হারাম
ইসলামে দাবা খেলা হারাম
আল কুরতুবী (র) বলেছেন যে, এই আয়াত এটাই নির্দেশ করে যে পাশা বা দাবা খেলা হারাম সেখানে জুয়ার কোন অস্তিত্ব থাকুক আর নাই বা থাকুক কারণ আল্লাহ্ সুবহানাত’লা মদকে হারাম করেছেন এবং এর পেছনে কারণ ও বলে দিয়েছেন, আর কারণটা হচ্ছে শয়তান মানুষের মাঝে নেশা ও বাজির মাধ্যমে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরি এবং মানুষকে আল্লাহকে স্মরণ এবং নামাজ থেকে বিরত রাখে । তাই এমন কোন খেলা যা তুচ্ছ জিনিসকে বড় করে তুলে এবং যারা ইহা খেলে তাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরিত করে সাথে সাথে আল্লাহ্র স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখে তাও মদ খাওয়ার মতই হারাম।
সুলাইমান ইবনে বুরাইদাহ তার পিতা বুরাইদাহ (রাঃ) হইতে বর্ণনা করেছেন।রাসুল (সাঃ) বলেছেন,“যে ব্যাক্তি পাশা খেলল সে যেন শূয়রের গোশত ও রক্তে হাত রাঙাল”।(মুসলিমঃ২২৬০)

আবু মুসা আল আশারি (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) বলেন,“যে পাশা খেলল সে যেন আল্লাহ্ এবং আমাকে অমান্য করল”।(আবু-দাউদঃ৪১২৯,নাসিরুদ্দিন আলবানীর মতে সহীহ)
একদিন দু’জন আনছার সাহাবী তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা করছিলেন। হঠাৎ একজন বসে পড়লেন। তখন অপরজন বিস্মিত হয়ে বললেন, কি ব্যাপার। কষ্ট হয়ে গেল নাকি? জবাবে তিনি বললেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, প্রত্যেক বস্তু যা আল্লাহর স্মরণকে ভুলিয়ে দেয়, সেটাই অনর্থক (لَهْو) … (নাসাঈ, ছহীহাহ হা/৩১৫)। এতে বুঝা যায় যে, বৈধ খেলাও যদি আল্লাহর স্মরণকে ভুলিয়ে দেয়, তবে সেটাও জায়েয হবে না। ইমাম বুখারী (রহঃ) অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন, ‘প্রত্যেক খেলা-ধুলা (لَهْو) বাতিল, যদি তা আল্লাহর আনুগত্য থেকে উদাসীন করে দেয়’ (ফাৎহুলবারী ‘অনুমতি গ্রহণ’ অধ্যায় ৭৯, অনুচ্ছেদ ৫২; ১১/৯৪ পৃঃ)।