হজরত আলী ও এক ইহুদির গল্প

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী রা. একবার তার অতি প্রিয় বর্ম হারিয়ে ফেললেন। কিছুদিন পর জনৈক ইহুদির হাতে সেটি দেখেই চিনে ফেললেন। লোকটি কুফার বাজারে সেটি বিক্রয় করতে এনেছিল। হজরত Continue reading “হজরত আলী ও এক ইহুদির গল্প”

মায়ের সম্মান নিয়ে হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) এর হৃদয় বিদারক ঘটনা

একদিন হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) নবীজি (সা.) এর নিকট এসে কাঁদছেন। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু হুরায়রা তুমি কেন কাঁদছ? জবাবে আবু হুরায়রা বললেন, আমার মা আমাকে মেরেছেন। রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেন তুমি কি কোন বেয়াদবি করেছ?

আবু হুরায়রা বললেন, না হুজুর কোন বেয়াদবি করিনি। আপনার দরবার হতে বাড়ি যেতেআমার রাত হয়েছিল বিধায় আমার মা আমাকে দেরির কারণ জিজ্ঞেস করায় আমি আপনার কথা বললাম। আর আপনার কথা শুনে মা রাগে আমাকে মারধর করল আর বলল, “হয়ত আমার বাড়ি ছাড়বি আর না হয় মোহাম্মদ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবার ছাড়বি।”

আমি বললাম, “ও আমার মা। তুমি বয়স্ক মানুষ। তোমার গায়ে যত শক্তি আছে তত শক্তি দিয়ে মারতে থাকো। মারতে মারতে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দাও। তবুও আমি আমার রাসুলকে ছাড়তে পারবো না।”

তখন রাসূল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমার মা তোমাকে বের করে দিয়েছেন আর এজন্য আমার কাছে নালিশ করতে

এসেছ? আমার তো এখানে কিছুই করার নেই।” হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বললেন, “হে রাসূল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি আমার মায়ের জন্য এখানে নালিশ করতে আসিনি।”

রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তাহলে কেন এসেছ?” আবু হোরায়রা বললেন, আমি জানি আপনি আল্লাহর নবী। আপনি যদি হাত উঠিয়ে আমার মায়ের জন্য দোয়া করতেন, যাতে আমার মাকে যেন আল্লাহ হেদায়েত করেন।

আর তখনই সাথে সাথে রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত উঠিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আমি দোয়া করি আপনি আবু হোরায়রার আম্মাকে হেদায়েত করে দেন।” রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন আর আবু হোরায়রা বাড়ির দিকে দৌড়ে যাচ্ছেন। পিছন থেকে কয়েকজন লোক আবু হোরায়রার জামা টেনে ধরল এবং বললো, হে আবু হোরায়রা! “তুমি দৌড়াচ্ছ কেন?”

তখন আবু হোরায়রা বললেন, “ওহে সাহাবীগণ তোমরা আমার জামা ছেড়ে দাও। আমাকে দৌড়াতে দাও।”

“আমি দৌড়াইতেছি এই কারণে যে, আমি আগে পৌঁছলাম নাকি আমার নবীজির দোয়া আগে পৌঁছে গেছে।”

হযরত আবু হুরায়রা দরজায় ধাক্কাতে লাগলো। ভেতর থেকে তার মা যখন দরজা খুললো তখন আবু হুরায়রা দেখলেন তার মার সাদা চুল বেয়ে বেয়ে পানি পড়ছে। তখন মা আমাকে বললেন, “হে আবু হুরায়রা! তোমাকে মারার পর আমি বড় অনুতপ্ত হয়েছি, অনুশোচনা করেছি। মনে মনে ভাবলাম আমার ছেলে তো কোন খারাপ জায়গায় যায়নি। কেন তাকে মারলাম? আমি বরং লজ্জায় পড়েছি তোমাকে মেরে। হে আবু হুরায়রা! আমি গোসল করেছি। আমাকে তাড়াতাড়ি রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে নিয়ে চল।”
আর তখনই সাথে সাথে আবু হুরায়রা তার মাকে রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে নিয়ে গেলেন। আর তার মাকে সেখানেই কালিমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেলেন।

“পিতা মাতা জান্নাতের মাঝের দরজা। যদি চাও, দরজাটি নষ্ট করে ফেলতে পারো, নতুবা তা রক্ষা করতে পারো।” সুবাহান আল্লাহ! [তিরমিজি]

মা হাজেরার বর্ণাঢ্য জীবন

মা হাজেরার বর্ণাঢ্য জীবন

আল্লাহর প্রিয় বন্ধু হজরত ইবরাহিম (আ.)। শত পরীক্ষা-নির্যাতন মোকাবিলা করে ঈমানের পথে অটল-অবিচল ছিলেন জীবনভর। সেই শিশু বয়স থেকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এখন বয়স ৮৬ বছর। প্রায় সময়ই তিনি ভাবতেন, আমি তো চলে যাব আমার প্রিয়তম বন্ধু আল্লাহর কাছে। কিন্তু এ জমিনে কে আমার উত্তরাধীকার হবে? কে এই উম্মতের কা-ারি হবে? তিনি দোয়া করলেন, ‘হে প্রভু! আমাকে একটি নেক সন্তান দান করুন।’ (সূরা সাফফাত : ১০০)। অনেক কান্নাকাটির পর আল্লাহ তায়ালা কবুল করলেন ইবরাহিম নবীর দোয়া। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে এক ধীরস্থির বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলের সুসংবা দিলাম।’ (সূরা সাফফাত : ১০১)। এ ছেলে হলেন হজরত ইসমাঈল (আ.)। তবে আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় বাবা-ছেলে কেউই না। আজ আমরা জানব ইবারাহিম (আ.) এর স্ত্রী এবং ইসমাঈল (আ.) এর মা মহীয়সী হজরত হাজেরা (আ.) সম্পর্কে।
মা হাজেরা ছিলেন ইবরাহিম (আ.) এর দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী ছিলেন হজরত সারা (আ.)। এ সারার দাসী ছিলেন হাজেরা। একটু পেছন থেকে বললে বুঝতে সুবিধা হবে।
জুলাইন ও তার স্ত্রীর একমাত্র মেয়ে হাজেরা। জুলাইন চাইত তাদের একটি ছেলে সন্তান হোক। কিন্তু ১০ বছর হলো হাজেরা ছাড়া তাদের কোলে আর কোনো চাঁদ আসেনি। তাই তিনি ঠিক করলেন, তিনা শহরের বিখ্যাত মসজিদে গিয়ে ছেলে সন্তান লাভের দোয়া করবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। ১০ বছরের ছোট্ট হাজেরাকে নিয়ে রওনা হলেন তিনা শহরে। তিনা শহর থেকে ফেরার পথে জুলাইন পরিবার ডাকাতের পাল্লায় পড়ে। ডাকাত দল সবাইকে হত্যা করে হাজেরাকে নিয়ে গোলামদের হাটে বেঁচে দেয়। গোলামের হাট থেকে হাজেরাকে কিনে আনেন ওই দেশের বাদশাহ। বাদশাহ হাজেরার প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকে নিজের মেয়ে করে নেন। কিছুদিন পর বাদশাহর মেয়ে হলে তিনি মেয়ের লালন-পালনের ভার হাজেরার ওপর দেন। এভাবেই হাজেরা হয়ে যায় বাদশাহর মেয়ের দাসী। এ বাদশাহর মেয়েই ইবরাহিম নবীর প্রথম স্ত্রী হজরত সারা (আ.)। আরেক বর্ণনা থেকে জানা যায়, হাজেরা ছিলেন তৎকালীন মিসরের বাদশাহর মেয়ে। মিসরের বাদশাহ হজরত সারা (আ.) এর অলৌকিকতা এবং হজরত ইবরাহিম (আ.) এর মোজেজা দেখে ঈমান আনেন এবং নিজ মেয়ে হাজেরাকে উপহার হিসেবে সারা (আ.) কে প্রদান করেন। দুই বর্ণনার মধ্যে এটিই বেশি প্রসিদ্ধ। (মাআরেফুল কোরআন : ১১৫১)।
হজরত সারা ছিলেন বন্ধ্যা। তাই তিনি হাজেরাকে ইবরাহিম (আ.) এর সঙ্গে বিয়ে দেন, যাতে ইবরাহিম (আ.) তার নবুয়তি উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেন। যথা সময়ে হাজেরা (আ.) গর্ভবতী হন এবং ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান প্রসব করেন। কয়েক বছর পর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো শিশু ইসমাঈল এবং তার মাকে নির্জন কোথাও রেখে আসা হোক। এটা ছিল বড় ধরনের পরীক্ষা। এ পরীক্ষায়ও ইবরাহিম নবী সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। তিনি স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে সফরে বের হন। সঙ্গে ছিল সামান্য খাবার ও পানীয়। চলতে চলতে এক নির্জন জনমানবহীন মরুভূমিতে এসে থামেন। তিনি স্ত্রী-ছেলেকে এখানে রেখে চলে আসতে চাইলে মা হাজেরা বলেন, ‘আল্লাহর নবী! এ জনমানবহীন মরু অঞ্চলে এক অবলা নারী ও তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে রেখে যাচ্ছেন, এটা কি আল্লাহর ইচ্ছায়? ইবরাহিম নবী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন, হ্যাঁ! এটা পরওয়ারদিগারের ইচ্ছায়ই হচ্ছে।
হাজেরা (আ.) এর মলিন মুখে হাসি ফটে ওঠল। তিনি বললেন, ‘যদি আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে তবে তো কোনো ভয় নেই। তিনিই আমাদের দেখভাল করবেন। আপনি নিশ্চিন্তায় বাড়ি ফিরে যান।’
ইবরাহিম (আ.) বাড়ির উদ্দেশে রওনা করলেন। একটু দূর এসে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার পরিবারের ক’জন সদস্যকে তোমার সম্মানীত ঘরের পাশে এক অনুর্বর উপত্যকায় পুনর্বাসিত করলাম, যাতে তারা সালাত কায়েম করতে পারে। অতএব তুমি কিছু মানুষের মনে তাদের প্রতি ভালোবাসা জন্মে দিও। ফলফলাদি ও জীবনোপকরণের সুন্দর ব্যবস্থা করে দিও। আশা করা যায়, ওরা শোকরগুজার করবে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৩৭)।
ইবরাহিম (আ.) চলে এলেন। হাজেরা ও শিশু ইসমাঈল নির্জন মরুভূমিতে দিন কাটাতে লাগলেন। সামান্য খাবারও শেষ হয়ে গেল। ক্ষুধা তৃষ্ণায় মা-ছেলে ছটফট করতে লাগলেন। মা হাজেরা রয়েসয়ে থাকলেন। কিন্তু শিশু ইসমাঈল তো আর পারছে না। অল্প পরেই প্রাণবায়ু বের হয়ে যাবে। শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে, চিরবিদায় নেবে সন্তান। এমন পরিস্থিতিতে কোনো মা-ই বসে থাকতে পারেন না। পারেননি এ মহীয়সীও। একবার সাফা পাহাড়ে ওঠেন তো আবার মারওয়া পাহাড়ে দৌড় দেন। কোথাও যদি পানির চিহ্নটুকুও দেখা যায়। একবার, দুইবার, তিনবার করে মোট সাতবার এভাবে পাহাড় থেকে পাহাড়ে দৌড়ে তিনি হতাশ হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। তাকানো মাত্রই তিনি দেখতে পেলেন, শিশু ইসমাঈলের পায়ের নিচ থেকে সুমিষ্ট পানি উতরে উঠছে। তিনি দৌড়ে এলেন। চারিদেকে বাঁধ দিয়ে পানি আটকালেন। বুঝতে বাকি রইল না, এ আল্লাহর গায়েবি সাহায্য। মা-ছেলে প্রাণভরে পানি পান করলেন। হাজীরা যে সাফা-মারওয়া প্রদক্ষিণ করেন, এটা মূলত মা হাজেরার ওই স্মৃতিকে স্মরণ করেই করে থাকেন। (তাফসিরে মাজহারি : ৬/৪২০)।
পানির অস্তিত্ব মানে, প্রাণের অস্তিত্ব। বিভিন্ন কাফেলার লোকরা এখানে পানি পানের জন্য বিরতি দেয়। কেউ আবার স্থায়ীভাবে বসবাসও শুরু করে। এভাবেই অনাবাদি মরুভূমি আবাদ হয়ে যায়। কয়েক বছর পর আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইসমাঈলকে কোরবানি করার জন্য ইবরাহিম (আ.) কে সঙ্গে করে নিয়ে যান। শয়তান হাজেরাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য বলে, ‘তোমার আদরের সন্তানকে কিন্তু জবাই করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে।’
হাজেরা বলল, ‘কার নির্দেশে?’
‘আল্লাহর নির্দেশে।’
‘যদি আল্লাহর নির্দেশে হয়ে থাকে তবে আমি পূর্ণ সন্তুষ্ট আছি।’
হাজেরার জবাব শুনে শয়তানের থোতামুখ ভোঁতা হয়ে যায়। সে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে হাজেরার কাছ থেকে চলে আসে। এর কয়েক বছর পরই হাজেরা মহান মালিকের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান মোমিনদের কাক্সিক্ষত ঠিকানায়। (কাসাসুল আম্বিয়া : ২২০-২২৪)।
এ মহীয়সীর জীবন থেকে নারীর জন্য তো বটেই, পুরুষের জন্যও রয়েছে অনেক শিক্ষণীয় দিক। নারীরা যেন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং ভক্তি বজায় রাখেন, পাশাপাশি মহান আল্লাহর সব সিদ্ধান্ত হাসিমুখে মেনে নিতে পারেন, বিপদ-মুসিবতে ভেঙে না পড়ে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সামনে পথ চলেনÑ এসবই শিক্ষা দেয় মা হাজেরার বর্ণাঢ্য জীবন।
আজকের নারী সমাজ যদি এ শিক্ষাগুলো তাদের জীবনে ধারণ করতে পারেন তবে পারিবারিক, সামাজিক অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান হবে অতি দ্রুত, খুব সহজে।

মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবানি

হজরত আদম (আ.) তার শরিয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন। অতঃপর তিনি হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা উভয়েই আল্লাহর জন্য নিজ নিজ কোরবানি পেশ করো। যার কোরবানি কবুল হবে, সে-ই আকলিমার পানি  গ্রহণ করবে।’

মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কোরবানি হজরত আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের কোরবানি। এ ঘটনাটি বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী সনদসহ বর্ণিত হয়েছে। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) একে পূর্বাপর ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত উক্তি বলে আখ্যা দিয়েছেন। যখন জান্নাত থেকে হজরত আদম ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে এসেছেন, তখনকার কথা। সন্তান প্রজনন ও বংশবিস্তার আরম্ভ হচ্ছিল তাদের থেকে। প্রতি গর্ভ থেকে একটি ছেলে ও একটি মেয়েÑ এভাবে যমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন একশ্রেণীর ভাইবোন ছাড়া হজরত আদম (আ.) এর আর কোনো সন্তান ছিল না। অথচ ভাইবোন বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। তাই আল্লাহ তায়ালা উপস্থিত প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে হজরত আদম (আ.) এর শরিয়তে বিশেষভাবে নির্দেশ জারি করেন, ‘একই গর্ভ থেকে যে যমজ ছেলে ও মেয়ে জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাইবোন গণ্য হবে। তাই তাদের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী ছেলের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে মেয়ে সহোদরা বোন গণ্য হবে না। তাই তাদের পরস্পর বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে।’ ঘটনাক্রমে হজরত আদম (আ.) এর এক ছেলে কাবিলের সহজাত সহোদরা বোন ‘আকলিমা’ ছিল খুবই সুশ্রী-সুন্দরী। আর তার অপর ছেলে হাবিলের সহজাত বোন ‘গাজা’ ছিল তুলনামূলক কম সুন্দরী। বিয়ের সময় হলে নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত অসুন্দরী মেয়ে কাবিলের ভাগে পড়ল। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু বনে গেল। সে জেদ ধরল, আমার সহজাত বোনকেই আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে।

হজরত আদম (আ.) তার শরিয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন। অতঃপর তিনি হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা উভয়েই আল্লাহর জন্য নিজ নিজ কোরবানি পেশ করো। যার কোরবানি কবুল হবে, সে-ই আকলিমার পানি গ্রহণ করবে।’ হজরত আদম (আ.) এর নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, যে সত্য পথে আছে, তার কোরবানিই কবুল হবে। সেকালে কোরবানি কবুল হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কোরবানিকে জ্বালিয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে যেত। এরশাদ হচ্ছে, ‘ওই কোরবানি, যাকে আগুন গ্রাস করে নেবে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৮৩)। আর যে কোরবানিকে আগুন জ্বালিয়ে দিত না, সেটাকে প্রত্যাখ্যাত গণ্য করা হতো। কোরবানির এ পদ্ধতি প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর যুগ অবধি সব নবীযুগে বলবৎ ছিল। হাবিল ভেড়া, দুম্বা, ইত্যাদি পশুপালন করত। সে একটি মোটাতাজা দুম্বা কোরবানি করল। কাবিল কৃষিকাজ করত। সে কিছু শস্য, গম, ইত্যাদি কোরবানির জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কোরবানিটি জ্বালিয়ে দিল। কাবিলের কোরবানি যেমন ছিল, তেমনই পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যে কাবিলের দুঃখ ও ক্ষোভ বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না। তাই হাবিলকে হত্যা করার ইচ্ছে করল। একপর্যায়ে তাকে হত্যা করেও ফেলল। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৩/১০১)।

হাবিল ও কাবিলের কোরবানির সেই ঘটনা পবিত্র কোরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘আপনি তাদের আদমের দুই ছেলের ঘটনাটি ঠিকভাবে শুনিয়ে দিন। (তা হচ্ছে এই) যখন তারা উভয়ে কোরবানি পেশ করল, তখন তাদের একজনের কোরবানি কবুল করা হলো। অপরজনেরটি কবুল করা হলো না। তখন সে (কাবিল) ভাইকে (হাবিলকে) বলল, অবশ্যই আমি তোমায় হত্যা করব। জবাবে অপর ভাই বলল, আল্লাহ তো মুত্তাকিদের কোরবানিই কবুল করেন। যদি তুমি আমায় হত্যা করতে আমার প্রতি হাত বাড়াও, তবে আমি তোমায় হত্যা করতে তোমার প্রতি হাত বাড়াব না। নিশ্চয়ই আমি বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই, আমার পাপ ও তোমার পাপ তুমি নিজের কাঁধে নিয়ে দোজখিদের অন্তর্ভুক্ত হও। এটাই অত্যাচারীদের শাস্তি। এরপর তার অন্তর তাকে ভাইয়ের হত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। শেষাবধি সে তাকে হত্যা করে ফেলল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত হলো। আল্লাহ তায়ালা এক কাক পাঠালেন। সে মাটি খুঁড়ছিল, যাতে তাকে শিক্ষা দেয়, আপন ভাইয়ের মৃতদেহ সে কীভাবে সমাহিত করবে। সে (কাবিল) বলল, আফসোস! আমি কি এ কাকের সমতুল্যও হতে পারলাম না, আপন ভাইয়ের মৃতদেহ সমাহিত করি! এভাবে সে পরিতাপ করতে লাগল।’ (সূরা মায়িদা : ২৭-৩১)। সেই থেকে প্রত্যেক উম্মতের মাঝে অবিচ্ছিন্নভাবে কোরবানির ধারাবাহিকতা চলতে থাকে।

হজরত আনাস (রাঃ) এর একটি চমৎকার ঘটনা

হজরত আনাস (রাঃ) এর একটি চমৎকার ঘটনা

সুমামাহ ইবনে আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেনঃ “একদা গ্রীষ্মকালীন সময়ে হজরত আনাস (রাঃ) এর নিকট তার বাগানের মালী অনাবৃষ্টওর অভিযোগ করলো।

তিনি পানি আনালেন এবং ওজু করলেন এবং নামাজ পড়লেন। তারপর মালীকে বললেনঃ “তুমি কি কিছু দেখতে পাচ্ছ?”

সে বললোঃ “আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”

তিনি আবার নামাজ পড়লেন। এভাবে তৃতীয় অথবা চতুর্থবারে বললেনঃ “দেখ!”

মালী বললোঃ “আমি পাখির ডানা পরিমাণ মেঘ দেখছি।”

এরপর তিনি নামাজ ও দুয়ায় মশগুল থাকলেন।

অতঃপর তার মালী এসে বললোঃ “আকাশ মেঘে ছেয়ে গেছে ও বৃষ্টি পড়ছে।

তিনি বললেনঃ “বিশর ইবনে শাগাফের ঘোড়াটিতে চড়ে দেখ, কোন পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে।

সে ঘোড়ায় চড়ে এসে দেখে বললোঃ “বৃষ্টি মুসায়েরীন ও কৃজবানের মহলগুলিও অতিক্রম করেনি।” (অর্থাৎ শুধুমাত্র তাদের বাগানেই বৃষ্টি হয়েছে)

(ইবনে সা’দ, হায়াতুস সাহাবা)

সুবহানআল্লাহ! সাহাবীদের মত এভাবে আল্লাহ্ নামাজের মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান করার তওফিক দান করুন। আমিন।

হজরত আলী (রাঃ) এর বর্ম নিয়ে একটি ঘটনা

হজরত আলী (রাঃ) এর বর্ম

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী রা. একবার তার অতি প্রিয় বর্ম হারিয়ে ফেললেন। কিছুদিন পর জনৈক ইহুদির হাতে সেটি দেখেই চিনে ফেললেন। লোকটি কুফার বাজারে সেটি বিক্রয় করতে এনেছিল। হজরত আলী তাকে বললেন, ‘এতো আমার বর্ম। আমার একটি উটের পিঠ থেকে এটি অমুক রাত্রে অমুক জায়গায় পড়ে গিয়েছিল।’ ইহুদি বললো, ‘আমিরুল মুমিনীন! ওটা আমার বর্ম এবং আমার দখলেই রয়েছে।’ হজরত আলী রা. পুনরায় বললেন, ‘এটি আমারই বর্ম। আমি এটা কাউকে দানও করিনি, কারো কাছে বিক্রয়ও করিনি। এটি তোমার হাতে কিভাবে গেল?’

ইহুদি বললো, ‘চলুন, কাজীর দরবারে যাওয়া যাক।’ হজরত আলী রা. বললেন, ‘বেশ, তাই হোক। চলো।’ তারা উভয়ে গেলেন বিচারপতি শুরাইহের দরবারে। বিচারপতি শুরাইহ উভয়ের বক্তব্য জানতে চাইলে উভয়ে বর্মটি নিজের বলে যথারীতি দাবি করেন। বিচারপতি খলিফাকে সম্বোধন করে বললেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে দু’জন সাক্ষী উপস্থিত করতে হবে। হজরত আলী বললেন, ‘আমার ভৃত্য কিম্বার এবং ছেলে হাসান সাক্ষী আছে।’

হজরত আলী (রাঃ) এর বর্ম
হজরত আলী (রাঃ) এর বর্ম

শুরাইহ বললেন, ‘আপনার ভৃত্যের সাক্ষ্য নিতে পারি। কিন্তু ছেলের সাক্ষ্য নিতে পারবো না। কেননা বাপের জন্য ছেলের সাক্ষ্য শরিয়তের আইনে অচল।’ হজরত আলী বললেন, ‘বলেন কি আপনি? একজন বেহেশতবাসীর সাক্ষ্য চলবে না? আপনি কি শোনেননি, রাসুল সা. বলেছেন, হাসান ও হোসাইন বেহেশতের যুবকদের নেতা?’ শুরাইহ বললেন, ‘শুনেছি আমিরুল মুমিনীন! তবু আমি বাপের জন্য ছেলের সাক্ষ্য গ্রহণ করবো না।’

অনন্যোপায় হজরত আলী রা. ইহুদিকে বললেন, ‘ঠিক আছে। বর্মটা তুমিই নিয়ে নাও। আমার কাছে এই দু’জন ছাড়া আর কোনো সাক্ষী নেই।’ ইহুদি তৎক্ষণাৎ বললো, ‘আমিরুল মুমিনীন! আমি স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ওটা আপনারই বর্ম। কি আশ্চর্য! মুসলমানদের খলিফা আমাকে কাজীর দরবারে হাজির করে আর সেই কাজী খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেয়। এমন সত্য ও ন্যায়ের ব্যবস্থা যে ধর্মে রয়েছে আমি সেই ইসলামকে গ্রহণ করেছি। ‘আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু।’

অতঃপর বিচারপতি শুরাইহকে সে ইহদি জানালো যে, ‘খলিফা সিফফীন যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমি তার পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। হঠাৎ তার উটের পিঠ থেকে এই বর্মটি পড়ে গেলে আমি তা তুলে নিই।’ হজরত আলী রা. বলেন, ‘বেশ! তুমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছ, তখন আমি ওটা তোমাকে উপহার দিলাম।’ এই লোকটি পরবর্তীকালে নাহরাওয়ানে হজরত আলীর নেতৃত্বে খারেজিদের সাথে যুদ্ধ করার সময় শহীদ হন।

জেনে নিন | কোরআন হাত থেকে পড়ে গেলে কি করবেন

কোরআন হাত থেকে পড়ে গেলে যা করবেন

পবিত্র কোরআনে কারিম আল্লাহ তায়ালার কালাম। অতএব যে আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের ওপর ইমান রাখে, তার ওপর কোরআনে কারিমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও অপমান থেকে তা রক্ষা করা অবশ্য কর্তব্য। কোনো কোরআনের কপি যদি, পুরনো হয়, ছিড়ে যায় ও তার পৃষ্ঠাগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়, তাহলে এমন জায়গায় রাখা যাবে না, যেখানে ওইসব পাতার অমর্যাদা হয়, ময়লা-আবর্জনায় পতিত হয়, মানুষ বা জীব-জন্তু দ্বারা পিষ্ট হয়।

প্রথমেই বলি হাত থেকে পড়ে গেলে যা করবেন-

আমাদের সমাজে প্রচলন রয়েছে যে, কারো হাত থেকে ভুলে বা অন্য কোনোভাবে কোরআনে কারিম পড়ে গেলে, কোরআনের ওজন পরিমাণ চাল দান করে দিতে হয়। আসলে এর কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। কারো হাত থেকে কোরআন পড়ে গেলে এ জন্য সে অনুতপ্ত হবে, ভবিষ্যতে যেন অার কোরআন না পড়ে সে জন্য সতর্ক থাকবে।

কোরআন হাত থেকে পড়ে গেলে যা করবেন
কোরআন হাত থেকে পড়ে গেলে যা করবেন

এভাবে শুধু পবিত্র কোরআনে কারিম নয়, হাদিস গ্রন্থ থেকে শুরু করে, কায়দা, আমপাড়া এমনকি ইসলামি বই-পুস্তক যেখানে কোরআনের আয়াত লিপিবদ্ধ আছে সেসবেরও একই হুকুম। এদিকে লক্ষ্য রেখেই ইসলামি স্কলাররা বলেন, যত্রতত্র বিশেষ করে পোস্টার হ্যাণ্ডবিলে কোরআনের আয়াত বা হাদিসের উদ্ধৃতি না লেখা। কারণ, এসবের সংরক্ষণ হয় না।

পুরনো কোরআন যদি বাঁধাই করে পাঠ উপযোগী করা সম্ভব হয়, তাহলে পরিত্যক্ত না রেখে ব্যবহার করা শ্রেয়। অনুরূপভাবে প্রকাশক বা কারো অবহেলা ও ভুলের কারণে কোরআনে কারিমে যদি ভুল ছাপা হয়, আর সংশোধন করা সম্ভব হয়, তাহলে সংশোধন করে পাঠ উপযোগী করা জরুরি।

তবে পুরনো বা ভুলছাপার কোরআন যদি একেবারেই পাঠ উপযোগী করা সম্ভব না হয়, তাহলে অসম্মান ও বিকৃতি থেকে সুরক্ষার জন্য কোরআনের ওই কপিগুলো নিরাপদ স্থানে দাফন করা জরুরি। নিরাপদ স্থান বলতে ওই স্থানকে বুঝায়, যেখানে মানুষ চলাচল করে না, ভবিষ্যতে অপমানের সম্মুখিন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

পুরনো ও ব্যবহার অনুপযুক্ত কোরআন সুরক্ষার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে তা পুড়িয়ে দেয়া। হজরত উসমান (রা.) কোরাইশি হরফের কোরআন রেখে অবশিষ্ট কোরআনের কপিগুলো পোড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন মর্মে একটি বর্ণনা ইমাম বোখারি (রহ.) উল্লেখ করেছেন।

তবে পুরনো কোরআনের কপি পোড়ানোর ক্ষেত্রে আলেমরা বলেন, এসব ভালো করে পুড়ে ছাই করা জরুরি, কারণ অনেক সময় পোড়ানোর পরও হরফ অবশিষ্ট থাকে। পুরনো কোরআন দাফন করা অপেক্ষা পোড়ানো উত্তম। কারণ, দাফনের পর কখনো ওপর থেকে মাটি সরে গেলে দাফনকৃত কোরআনের অসম্মান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পোড়ানো ও পোড়ানোর পর ছাইগুলো দাফন করা অধিক শ্রেয়।

অনেকে ব্যবহার অনুপযুক্ত কোরআনের কপি পানিতে ফেলে দেন। এটা ঠিক না। কারণ, পানিতে ভাসমান অবস্তায় এসব কোরআনের কপি যে কোনো ময়লা-আবর্জনা কিংবা নাপাক স্থানে গিয়ে ঠেকতে পারে। তাই এ পদ্ধতি সঠিক নয়। তবে হ্যাঁ, একান্তই যদি পানিতে ভাসিয়ে দিতে হয়, তাহলে প্রবহমান নদীতে ভারী কোনো কিছু বেঁধে তার পর ফেলতে হবে ।

জেনে নিন | ফেরেশতাগনের পরিচয় ও সংখ্যা

ফেরেশতাগনের পরিচয় ও সংখ্যা

ফেরেশতা শব্দটি ফারসি শব্দ। আরবিতে ফেরেশতাকে একবচনে ‘মালাকুন’ ও বহুবচনে ‘মালাইকা’ বলা হয়। এর অভিধানিক অর্থ বার্তাবাহক। ইসলামি পরিভাষায় ফেরেশতার পরিচিতি হলো- এমন নূরানী মাখলূক বা সৃষ্টি- যারা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারেন। তারা কখনো আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধাচারণ করেন না। বরং সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে রত থাকেন। (কাওয়াইদুল ফিহক, মুফতী সাইয়েদ মুহাম্মাদ আমীমুল এহসান রহ., পৃষ্ঠা-৫০৪)

 ফেরেশতাগনের পরিচয় ও সংখ্যা
ফেরেশতাগনের পরিচয় ও সংখ্যা

বস্তুত ফেরেশতা নূর বা জ্যোতি থেকে সৃষ্ট। তারা সাধারণত অদৃশ্য অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। তাদের কোনো আক্ষরিক বা বাস্তবিক আকার-আকৃতি নেই। মানুষের চোখে তাদের দেখা বা সাক্ষাৎ সম্ভব না। তবে ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুমে বিভিন্ন আকার-আকৃতি ধারণ করতে সক্ষম। তারা মানুষের মতো রক্ত-মাংসের সৃষ্টি নন। তাদের কমনা-বাসনা, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, নিদ্রা-তন্দ্রা কিছুই নেই। তারা সবসময়ই আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ও আদেশ পালনে নিয়োজিত থাকেন। মহান আল্লাহ যখন যা হুকুম করেন, তারা তাই পালন করেন। এই পৃথিবীতে আল্লাহর তরফ থেকে রহমত অথবা শাস্তি যা কিছু নাযিল হয়, তা এই ফেরেশতাগণের মাধ্যমে নাযিল করা হয়। আল্লাহ্ তাআলা নবী-রাসূলগণের প্রতি যেসব কিতাব নাযিল করেছেন, তা তাদের মাধ্যমে নাযিল করেছেন। বিচার দিনে তার বান্দার ভাল-মন্দ আমলের সাক্ষ্য দিবেন। ফেরেশতাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে কেবল আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন। এই মর্মে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, আপনার প্রতিপালকের বাহিনী (ফেরেশতা) সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। (সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪ : ৩১)

চারজন বড় বড় ফেরেশতাসহ কিছু ফেরেশতার নাম বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়। যেমন- ১. হজরত জিবরাঈল (আ.)- তিনি নবী-রাসূলগণের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত। তাকে রুহ বা রুহুল আমিন বলা হয়। ২. হজরত মীকাঈল (আ.)- তিনি সকল জীবের জীবিকা বন্টনের দায়িত্বে নিয়োজিত। ৩. হজরত আজরাঈল (আ.)- তিনি সকল জীবের জীবন বা রূহ কবজ করার দায়িত্বে নিয়োজিত। ৪. হজরত ইসরাফিল (আ.)- তিনি কেয়ামতের দিনে শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার হুকুমের সাথে সাথে শিঙ্গায় ফুঁক দিবেন এবং তৎক্ষণাৎ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এরপর কেয়ামত কায়েম হবে। চারজন ফেরেশতা ছাড়াও আরও কিছু কিছু ফেরেশতার বর্ণনা বিভিন্ন আলোচনায় পাওয়া যায়। যেমন- কিরামান কাতিবীন- যারা মানুষের ভালমন্দ আমল লিপিবদ্ধ করেন। মুনকার ও নাকীর- তারা মৃত্যুর পর কবরে প্রশ্ন করবেন। জাহান্নামের রক্ষক ফেরেশতার নাম মালিক এবং জান্নাতের জিম্মাদার ফেরেশতার নাম রিজওয়ান। এমনিভাবে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য আল্লাহ্ তাআলার অগণিত ফেরেশতা বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। মাওলানা সুলায়মান নদভী (র.) ফেরেশতাগণের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, দুনিয়ার সকল ধর্মমতে এ জাতীয় সত্তাসমূহের অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়েছে। (সীরাতুন্নাবী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠ-২৯৩)

আপনি জানেন কি | পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানী কে ছিলেন?

পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানী হজরত ইদরিস [আ.]

হজরত ইদরিস [আ.] ছিলেন একজন বিখ্যাত নবি। তার নামে বহু উপকথা তাফসিরের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। যে কারণে জনসাধারণের মাঝে তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। সেসব উপকথা পরবর্তীতে অধিকাংশই রূপকথায় রূপ নিয়েছে, কিছু অতিরঞ্জিত হয়ে গোনাহের পর্যায়ে চলে গেছে। অথচ নবি ইদরিস [আ.] যে পৃথিবীতে বসবাসের নিমিত্তে অনেক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূচনা করেছিলেন, সে ব্যাপারে আমরা অনেকেই অজ্ঞ। হজরত ইদরিস [আ.] হজরত নুহ [আ.]-এর পূর্বের নবি ছিলেন,না পরের নবি ছিলেন এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেক সাহাবির মতে তিনি নুহ [আ.]-এর পরের নবি ছিলেন। আবার অনেক সাহাবি ও তাফসিরকার তাকে নুহ [আ.]-এর পরবর্তী নবি বলে মত দিয়েছেন। অনেক ইতিহাসবিদ এবং তাফসিরকার তাকে ইসলামের তৃতীয় নবি এবং হজরত আদম [আ.]-এর তৃতীয় প্রজন্ম বলে মত প্রকাশ করেছেন। পৃথিবীর প্রাথমিক পর্যায়ের মানুষ হিসেবে তিনিই ছিলেন ইতিহাসের প্রথম শিক্ষিত ব্যক্তি। কেননা আল্লাহ তাআলা তাকেই প্রথম অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দেন। তাফসিরে কুরতুবি, ইবনে কাসির ও মাআরেফুল কুরআন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে,হজরত ইদরিস [আ.] প্রথম মানব,যাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণনাপদ্ধতি শিক্ষা দেয়া হয়েছিলো। তিনি গ্রহ-উপগ্রহের চলাফেরা বা গতিবিধি লক্ষ্য ও সময় নির্ধারণ করার জন্য বেশ কিছু মান-মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলেও জানা যায়। তিনিই সর্বপ্রথম মানব, যিনি কলমের সাহায্যে লিখনপদ্ধতি ও বস্ত্র সেলাই শিল্পের সূচনা করেন। তার আগে মানুষ সাধারণতঃ পোশাক হিসাবে জীবজন্তুর চামড়া ব্যবহার করতো। ওজন ও পরিমাপের পদ্ধতি তিনিই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। তার আমলেই সর্বপ্রথম নগরসভ্যতা গড়ে ওঠে। তিনি তার ব্যক্তিগত সংস্পর্শে রেখে বেশ কিছুসংখ্যক লোককে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলেন। তারাই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এক একটি শহর নির্মাণ করে। এভাবে তিনি বেঁচে থাকতেই একশো আটাশিটি শহর বা সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিলো বলে জানা যায়। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও চিন্তাশীল ব্যক্তি ছিলেন।

পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানী হজরত ইদরিস [আ.]
পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানী হজরত ইদরিস [আ.]
লোহা দ্বারা অস্ত্র-শস্ত্র তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার ও তার ব্যবহার তার আমল থেকেই শুরু হয়। তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে অস্ত্র নির্মাণ করে কাবিল গোত্রের বিরুদ্ধে জেহাদ করেন। সর্বপ্রথম এসব নির্মাণগত উৎকর্ষ সাধনের কারণে তাকে ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী বলা হয়ে থাকে। ইদরিস [আ.]-কে নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভুল উপকথার মধ্যে একটি হলো- আল্লাহর নবি ইদরিস [আ.] ছিলেন মালাকুল মাউতের (আজরাইল) বন্ধু। ইদরিস [আ.] তার কাছে জান্নাত-জাহান্নাম দেখানোর আবদার জানালেন। তিনি তাকে ঊর্ধ্বাকাশে নিয়ে জাহান্নাম দেখালেন। জাহান্নাম দেখে ইদরিস আ. এতো বেশি ভয় পেলেন যে, বেহুশ হওয়ার উপক্রম হলেন। তখন মালাকুল মাউত আপন ডানা দিয়ে তাকে আগলে নিলেন। তারপর তাকে জান্নাত দেখাতে নিয়ে গেলেন। জান্নাত দেখা শেষ হলে মালাকুল মাউত বললেন,দেখা হয়েছে? এবার চলুন। তিনি বললেন,কোথায় যাবো? বললেন,যেখান থেকে এসেছেন। তখন ইদরিস আ. বললেন,না,জান্নাতে প্রবেশ যখন করেছি,এখান থেকে আর বের হবো না। তখন মালাকুল মাউতকে গায়েব থেকে বলা হলো,তুমি কি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাওনি? জান্নাতে একবার যে প্রবেশ করে সে আর বের হয় না বা তাকে আর বের করা হয় না। এরপর তিনি সেখানেই বসবাস করতে লাগলেন। এ বর্ণনাটি ভিত্তিহীন। এই বর্ণনার সনদে ইবরাহিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে খালেদ আলমিসসিসি রয়েছে। ইমাম জাহাবি রহ. এ বর্ণনাকারী সম্পর্কে বলেন, এ ব্যক্তি একজন চরম মিথ্যাবাদী। হাকিম রহ. বলেছেন,তার বর্ণনাগুলো মওজু ও বানোয়াট। [মিজানুল ইতিদাল,তরজমা নং ১২৪;লিসানুল মিজান,তরজমা নং ১৭৮] ইদরিস [আ.]-এর বর্ণনা পবিত্র কুরআনে দুই স্থানে এসেছে- وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيْسَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَّبِيًّا، وَرَفَعْنَاهُ مَكَاناً عَلِيّاً- আপনি এই কিতাবে ইদরিসের কথা আলোচনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও নবি। আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছিলাম। [সুরা মারিয়াম, আয়াত ৫৬-৫৭] وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ كُلٌّ مِّنَ الصَّابِرِينَ এবং ইসমাইল, ইদরিস ও যুলকিফলের কথা স্মরণ করুন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন সবরকারী। [সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৫]